মা’য়ের বুকের দুধ খেতে থাকা শিশুসহ গণহত্যার শিকার হন গোয়ালন্দ মোড়ের ঠাকুর পরিবারের ছয় সদস্য

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

9C03470

পাক হানাদার বাহিনীর দোষর রাজাকার, আলবদর আর অবাঙ্গালী বিহারীদের নৃশংস গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন রাজবাড়ীর মুক্তিকামি মানুষ। ওই নৃশংসতা থেকে রক্ষা মেলেনি কোলের শিশুও। মা’য়ের বুকের দুধ খেতে থাকা শিশুকে ওই অবস্থাতেই হত্যা করে তারা। রক্ষা পায়নি বাড়ীতে থাকা অন্যান্য সদস্যরা। একে একে ৬ জনকে ধরে এনে বাড়ীর উঠানে থাকা বড়ই গাছেন নিচে ইচ্চমত কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের এমন নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন রাজবাড়ী জেলা সদরের শহীদওহাবপুর ইউনিয়নের গোয়ালন্দ মোড় আহলাদীপুর গ্রামের ‘ঠাকুর” বাড়ীর সদস্যরা।

ওই এলাকার একাধিক মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলে জানাযায়, ওই গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী কালিপদ আচার্য ওরফে কালিপদ ঠাকুর ছিলেন পল্লী চিকিৎসক। চিকিৎসা সেবা দেয়ার পাশাপাশি এলাকার হাজারো মানুষের ভালবাসার পাত্রও ছিলেন তিনি। তাই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেননি তিনি। ঠাকুর বাড়ীতে ডেকে আনেন এলাকার মুক্তিপাগল যুবকদের। বাড়ীর পাশে থাকা কাঁঠাল বাগানের মধ্যে তৈরী করেন তিনি গেরিলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। এলাকার ১৫/১৬ জন যুবক তীর, ধনুক ও লাঠি চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি এলাকার মানুষদের কাছ থেকে খাবার সংগ্রহণ এবং তা গোয়ালন্দের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌছে দেবার কাজ শুরু করেন। তবে খবরটি আর চাপা থাকেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই পাক হানাদার বাহিনীর দোষর রাজাকার, আলবদর আর অবাঙ্গালী বিহারীরা তা জানতে পারেন। তারা ঠাকুর পরিবারকে চিরতরে শায়েস্তা করতে উঠে পরে লাগে।
১৯৭১ সালের ১১ মে ভোরে ঘুম থেকে উঠে কালিপদ ঠাকুর কাঁঠান বাগানে যান এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের সাথে কথা বলেন। কয়েক ঘন্টা পর সেখান থেকে বাড়ী ফিরে আসেন। ঘড়িতে তখন বাজে সকাল ১১ টা। সে সময় হঠাৎ করেই স্থানীয় পিচ কমিটির চেয়ারম্যান ওবায়দুল্লাহ মিয়ার নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর দোষর অবাঙ্গালী বিহারীদের ৫০/৬০ জনের একটি দল ধারালো অস্ত্র ও লাঠিশোঠা নিয়ে ওই বাড়ীতে প্রবেশ করেন। এ সময় বাড়ীর সদস্যরা যে যার মত এদিক সেদিক দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করেন। তবে ঘরের মধ্যে ছিলেন কালিপদ ঠাকুর। সেখানেই তার দুই বছর বয়সী শিশু ছেলে প্রদ্যুৎ কুমারকে বুকের দুধ পান করাচ্ছিলেন স্ত্রী উষা রানী আচার্য। ঘাতকরা তাকেসহ স্ত্রী ও শিশু ছেলেকে ধরে নিয়ে আসেন বাড়ীর উঠানে থাকা বড়ই গাছের নিচে। তাদের ৩ জনকেই পেট, মাথা, পিঠ নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সেই সাথে কালিপদ ঠাকুরের বৃদ্ধ মা সরলা বালা আচার্য, বাড়ীতে আশ্রয় নেয়া অপর পল্লী চিকিৎসক বোন জামাই অনিল কুমার চৌধুরী এবং অনিল চৌধুরীর স্কুল শিক্ষক ছেলে অবনী চৌধুরীকে একই স্থানে ধরে এনে কুপিয়ে হত্যা করে। মানুষের দেহের খন্ড বিখন্ড অংশসহ রক্তে পুরো উঠান রঞ্জিত হয়ে ওঠে। গণহত্যা আর লুটপাট চালিয়ে প্রায় এক ঘন্টা পর ঘাতরা ওই বাড়ী থেকে চলে যায়।
ওই বাড়ীর ছোট ছেলে ও জেলা সদরের শহীদওহাবপুর ইউনিয়নের বর্তমান উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রবীর কুমার আচার্য বলেন, তারা ৫ ভাই ১ বোন ছিলেন। তিনি তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়তেন। ঘাতকদের হঠাৎ হামলার বিষয়টি বুঝতে পেরেই তিনি সমবয়সী ফুপাতো বোন পিনু চৌধুরীকে নিয়ে বাড়ী থেকে কিছু দুরে থাকা কলা বাগানের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন। ওই হত্যাযজ্ঞের প্রায় দেড় ঘন্টা পর তিনি বাড়ীতে ফিরে আসেন। দেখেন তখনো মা’য়ের বুকের দুধ খাওয়া অবস্থা নিথর দেহ পরে আছে শিশু প্রদ্যুৎতের। ঘাতকরা প্রদ্যুতের পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করে ফেলে এবং মা, বাবা, দাদি, ফুপা ও ফুপাতো ভাইয়ের শরীরের কোন অংশই যেন আস্তা রাখেনি। যে যে ভাবে পেরেছে কুপিয়েছে তাদের।
তিনি আরো বলেন, সে সময় তার পাশে এসে দাঁড়ান এলাকার মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ওহাব, ছাত্তার খান, সোহরাব পেয়াদা, নুর মোহাম্মদ ভূইয়া। তারা কৌশলে তাদেরকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক পার করে দেন। সেই সাথে নিহতদের লাশ গুলো কুকুর ও শেয়ালের হাত থেকে রক্ষা করতে তা বাড়ীর পাশের একটি গর্তে এক সাথে পুতে রাখেন। সে সময় বাড়ী থেকে কিছু দুরে থাকা নিমতলা বিলের মধ্যে আসতেই বড় ভাই নিশিত কুমার আচার্য, বোন প্রিতি কনা আচার্য, ছোট ভাই প্রদিপ কুমার আচার্য ও ফুপাতো ভাই অশিত চৌধুরীর সাথে দেখা হয়। তারা বাবা মা’র অবস্থা শোনার পর সেখান থেকে কয়েক কিলো মিটার দুরে থাকা জেলা সদরের মূলঘর ইউনিয়নের এড়েন্দা গ্রামের জনৈক এক আতœীয়ের বাড়ীতে যান। সেখানে দুই দিন অবস্থানের পর ফদিপুরের গাজনা এলাকা হয়ে টানা সাত দিন পায়ে হেটে ভারত চলে যান। যুদ্ধ শেষে তার বড় ভাই ভারতেই থেকে যান। তারা বাড়ীতে ফিরে এসে দেখেন ভিটা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ঠ নেই। সবই লুটপাট হয়ে গেছে। করেন তারা বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রাম। এ নৃশংস ঘটনার পাননি তারা কোন প্রতিদান। তবে কয়েক বছর আগে তাদের বাড়ীর সামনের সড়কটি নামকরণ করা হয় ‘কালিপদ ঠাকুর স্বরণী’।
সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল জলিল বলেন, ওই শহীদ পরিবারটিকে এখনো সরকারী ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তাছাড়া যে সব হত্যাকারীরা এখনো বেঁচে আছে তাদের খুজে বের করে বিচারের সম্মুখিন করার দাবীও তিনি করেন।

(Visited 59 times, 1 visits today)