কবি ওবায়েদ আকাশের একগুচ্ছ কবিতা

ওবায়েদ আকাশের একগুচ্ছ কবিতা, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

22=Obayed Profile Pic (21)

আমি ও হোমার

অবিশ্বাস্য হলেও তুমি বাঘের খাঁচার ভেতর
হাত ঢুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে- এবং বিস্মিত হয়েছিলে যে
বাঘের ছানারাও মানবশিশুর চেয়ে
এতটুকু কম আবেদনময়ী নয়

তারা তোমার হাত নোখ লোমে
কোমল নরম ত্বক ঘষে দিয়েছিল
কুট কুট করে কামড়ে দিয়ে খুনসুটি করে প্রমাণ করেছিল-
এ যদি শুধুই মানবকুলের দক্ষতা হতো
ততক্ষণে প্রতিটি হাত রক্তাক্ত হয়ে যেত

আজ দূর থেকে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে
যারপরনাই বিস্মিত হয়ে, মাথা ঝাঁকা দিয়ে
কিছু একটা ঝাপসা দেখছি বলে- চোখ দুটো মুছতে গিয়ে
মণি দুটো ঝুরঝুর করে মাটিতে পড়ে গেল

মুহূর্তে মনে পড়ে গেল- অন্ধ কবি হোমার
ঠিক এ-রকম করে দেখতে দেখতেই একদিন তার রচনার জ্যোতি
পৃথিবীময় অন্ধকার মুছে আলোকিত করে গেছে

ভাবছি, আমার পরবর্তী রচনাবলি, যদি
তার তাবত রচনার পাশে বসিয়ে দেয়া যেত
তাহলে কি তা জ্বলেপুড়ে ছাড়খার হয়ে যাবে?
নাকি নতুন কোনো আলোয় ভরিয়ে তুলবে পৃথিবী?

একদিন আমি ও হোমার
মুখোমুখি বসে নিমগ্ন মনে পরস্পরকে ইনিয়েবিনিয়ে দেখি

আর ভাবি মনে মনে- বিগত কোনো জন্মে প্রিয় কবি হোমার
তুমিও কি বাঘের খাঁচায় হাত ঢুকিয়েছিলে?

পররাষ্ট্রের হলদে ময়লা দাঁত

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অস্থিরতা নিয়ে
শুয়ে আছে পররাষ্ট্রের ফপর-দালালি

সিঁড়ির নিচের মরচে-ধরা বৈদ্যুতিক সুইচটা কিছু অন করা আছে
বাকিটা কেউ চেপে দিলেই কুৎসিত কিছু নোংরা-ময়লা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
হলদে হওয়া দাঁত প্রকাশ্যে চক্ষুষ্মাণ হবে

আঁস্তাকুড়ের বর্জ্য খেয়ে, শৌচাগারের দুর্গন্ধ গিলে
দেহটা দিন দিন স্থূল থেকে স্থূলতর হচ্ছে-

আমাদের সবুজ কাঁচা প্রকৃতি থেকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন নিয়ে
কেমন মাতাল-মাতাল ভাব ধরে
অমন প্রিয়ার মুখের দিকে চেয়ে থাকি-
হস্তরেখা গুনতে গুনতে
যিনি একসময় আমাদের কামজ করে তোলেন

আমরা তখন ভবিষ্যৎ সোনালি ক্ষমতার রোদে জ্বলেপুড়ে
রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে ভুলে যাই- বিয়াল্লিশ বছরের পবিত্র রক্তস্নাত মাটিতে
দাঁড়িয়ে কেউ একজন মহাকাব্যিক উপন্যাস রচনার কথা ভাবছেন

গৃহবন্দী

মধ্যরাতে কে যেন এসে আমাদের বাড়ির ঘরগুলো
হাত-পা মুড়ে বেঁধে রেখে গেছে এবং
বারান্দাগুলো লুকিয়ে রেখেছে অদৃশ্য ছায়ায়

ভোর হতে না হতেই লোকজন আসছে, চেনাজানা আত্মীয়-পরিজন
তারা চোরের মতো বাড়িটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেউ ফিরে যায়
কেউবা বিস্মিত হয়ে অদৃশ্য ছায়ায় দাঁড়িয়ে পড়লে
পায়ের নিচ থেকে কঁকিয়ে ওঠে লুকানো বারান্দাগুলো

যখন ঘরের দিকে এগিয়ে এসে শক্ত করে বাঁধা
রশিগুলো খুলতে যাচ্ছে, ভেতর থেকে হৈ হৈ করে হাসছে
গৃহবন্দী পরিবারের বাপ-মা, শিশু-যুবা- তাবত মানুষ

তারা ফিঙের মতো ঘর থেকে লাফিয়ে বেরুচ্ছে আনন্দে এবং
ঘরগুলোর যত্রতত্র যেসব ক্ষতে রক্ত ঝরছে
জলে ধুয়ে লাগিয়ে দিচ্ছে কবরেজের দেয়া আরোগ্য-মলম
ব্যক্তিগত ব্যবহৃত ঘরে টেনে তুলে জুড়ে নিচ্ছে শায়িত অলিন্দমালা

আমি শুধু একমাত্র জন ইঁদুরের গর্তে পা আটকে যাওয়ায়
শত চেষ্টাতেও ঘর থেকে বেরুতে পারছি না

বাড়ির মানুষ যে যার কাজে ব্যস্ত হয়েছে, খাচ্ছেদাচ্ছে
ঘুমাচ্ছে-জাগছে- শুধু একই ঘরে থেকে
আমার গগনবিদারি চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছে না

এ-সংসারের রক্তমাংসের একজন মানুষ আছে কি নেই
কতকাল হলো কারও কিছু মনেই পড়ছে না

বৃষ্টি, বকুল ও আমাদের কথা

তখনও তাকে কিছুই বলিনি, অথচ সে আমার গানের খাতা টেনে নিয়ে
গাইতে শুরু করেছে-
কখনও ইশারা করিনি, অথচ নিতান্ত বৃষ্টিতে
সে আমার ছাতার নিচে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে

আমার সারা শরীর তন্ন তন্ন করে খুঁজে
হলুদ পাঞ্জাবির পকেটে পাওয়া একটা শুকনো চ্যাপ্টা
বকুলফুল তার হাতে দিয়ে বলি:
এতদঞ্চলে বকুলের চারা রোপণে নিষেধাজ্ঞা হেতু
একবার সমুদ্রপারের পুজোঘর থেকে ফুলটি হাতিয়ে নিয়েছিলাম

আলোচ্য ফুলটি তখন ধূসর থেকে সাদা হতে শুরু করল
গন্ধ ছড়াল- আমাদের সঙ্গে
চমৎকার কথপোকথনে গুমোট সময়টা আনন্দে ভরিয়ে তুলল

তখন আমার সান্নিধ্য ছেড়ে অদূরে বটগাছের
শেকড় ধরে ঝুলতে থাকলে
আমার হাতের একমাত্র ছাতা ছুড়ে মারলে শূন্য আকাশে-

ততক্ষণে আমাদের প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে কথপোকথন শুরু হয়ে গেছে
বৃষ্টি নাচল, আমরা দেখলাম
বৃষ্টি হাসল, আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম
বৃষ্টি যখন প্রচ- জ্বরে তপ্তশরীরে হাত-পা ঘামিয়ে
বমি করতে শুরু করল, আমরা দিগি¦দিক পাগলের মতো
ছোটাছুটি করে কাছে-দূরের পাখিদের সাহায্য চাইলাম

তারা বৃষ্টির শরীর থেকে তপ্ত জ্বরকণাগুলো খুঁটে খুঁটে খেল
এবং চারদিকে পালক মেলে দিয়ে সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলে
মিলিয়ে গেল অনন্ত আকাশে-

আমরা আবার বৃষ্টিকে প্রতিরোধ করে
একই ছাতার নিচে মিলিত হলাম

সমুদ্র ও এক-পা-ওয়ালা মেয়েটি

এমন জনাকীর্ণ আলোকায়নে এক-পা-ওয়ালা অপরূপ মেয়েটির নাচ
দেখতে এসে দেখি, প্রায় প্রত্যেকে তাদের
একটি করে পা ছুড়ে দিচ্ছে মেয়েটির দিকে-
ফলে মেয়েটির নাচের মুদ্রা তখন দর্শক সমুদ্রে সাঁতার কাটছে
চালচিত্রে মূর্তিমান হয়ে ঝুলে রয়েছে- নিথর ক্লান্ত দেহ

দেখতে দেখতে ভাংচুর থেকে রক্তারক্তি শুরু হয়ে গেল
যারা বেরুনোর তোড়জোড় করছে, এক-পা নিয়ে কিছুতেই বেরুতে পারছে না

যখন চালচিত্রে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো
মূর্তিমান মেয়েটির নাচ ভিজে-গলে প্রত্যেকের পায়ের নিচে
গড়িয়ে পড়ে রক্তজলে নিজেই সমুদ্র হয়ে
যা কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল

তবু আজও অবকাশ যাপনের কথা ভাবলেই
সমুদ্রভ্রমণে ঝিনুক কুড়ানোর স্মৃতি কুরে কুরে খায়; এবং
এক-পা-ওয়ালা মানুষের সৈকতে হাঁটার বেদনাই অন্য রকম মনে হয়

ওবায়েদ আকাশের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ওবায়েদ আকাশের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন, বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে। একাডেমিক পড়াশোনা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা। বর্তমানে দেশের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘দৈনিক সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :
পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ (বর্তমান সময়, ২০০১), নাশতার টেবিলে প্রজাপতিগণ (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৩), দুরারোগ্য বাড়ি (মঙ্গলসন্ধ্যা, ২০০৪), কুয়াশা উড়ালো যারা (বিশাকা, ২০০৫), পাতাল নির্মাণের প্রণালী (আগামী, ২০০৬), তারপরে, তারকার হাসি (আগামী, ২০০৭), শীতের প্রকার (বৃক্ষ, ২০০৮), বিড়ালনৃত্য, প্রেতের মস্করা (শুদ্ধস্বর, ২০০৯), যা কিছু সবুজ, সঙ্কেতময় (ইত্যাদি, ২০১০), প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় (ইত্যাদি, ২০১১), রঙ করা দুঃখের তাঁবু (ইত্যাদি, ২০১২), বিবিধ জন্মের মাছরাঙা (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, ইত্যাদি, ২০১৩), তৃতীয় লিঙ্গ (দীর্ঘ কবিতার সংকলন, শুদ্ধস্বর, ২০১৩), উদ্ধারকৃত মুখম-ল (বাংলা একাডেমি কর্র্তৃক প্রকাশিত নির্বাচিত কাব্য সংকলন, ২০১৩), হাসপাতাল থেকে ফিরে (কলকাতা, উদার আকাশ, ২০১৪), ৯৯ নতুন কবিতা (ইত্যাদি, ২০১৪)।
অনুবাদ :
‘ফরাসি কবিতার একাল / কথারা কোনোই প্রতিশ্র“তি বহন করে না’ (ফরাসি কবিতার অনুবাদ, জনান্তিক, ২০০৯)
‘জাপানি প্রেমের কবিতা/ এমন কাউকে ভালবাস যে তোমাকে বাসে না’ (জাপানি প্রেমের কবিতা, জনান্তিক, ২০১৪)
গদ্যগ্রন্থ : ‘ঘাসের রেস্তরাঁ’ (বৃক্ষ, ২০০৮) ও ‘লতাপাতার শৃঙ্খলা’ (ধ্রুবপদ, ২০১২), চারদিকে উদ্যানের সৌরভ (ধ্রুবপদ, গল্পগ্রন্থ, ২০১৪)।
সম্পাদনা গ্রন্থ : ‘দুই বাংলার নব্বইয়ের দশকের নির্বাচিত কবিতা’ (শিখা, ২০১২)।
সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন : শালুক (১৯৯৯)
পুরস্কার ও সম্মাননা:
‘শীতের প্রকার’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম শ্রেষ্ঠ তরুণ কবি পুরস্কার ২০০৮’;
‘শালুক’ সম্পাদনার জন্য ‘কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার ২০০৯’।
এবং সামগ্রিক কাজের জন্য লন্ডন থেকে ‘সংহতি বিশেষ সম্মাননা পদক ২০১২’।

(Visited 24 times, 2 visits today)