ঘুষের টাকায় প্রায়শ্চিত্ত করছেন প্রকৌশলীরা!

আবু মুসা বিশ্বাস :

Rajbari- (3) Unconscious- 28.9.2010.wmv_000002899

রাজবাড়ী আধুনিককৃত সদর হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শেষ না করে পালিয়ে যাওয়া ঠিকাদারদের ফেলে যাওয়া কাজ কমিশন খাওয়া প্রকৌশলীগণ নিজ অর্থে শেষ করতে বাধ্য হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান টেকসিম ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড (মেসার্স টিইপিএল-আইবিজেভি লিমিটেড) রাজবাড়ী হাসপাতালে নির্মাণ কাজ শেষ না করেই ৫কোটি ২২লাখ ২৫হাজার টাকা উত্তোলন করে চম্পট দেয়।বিল তুলে নেয়ার এ কাজে সহায়তা করেন স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ফরিদপুর নির্বাহী প্রকৌশল অফিসের সে সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী,অফিস সহকারীসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা। জনগুরুত্বপূর্ণ এ হাসপাতালের নির্মাণ কাজ হাফডান অবস্থায় প্রায় দু’বছর পড়ে থাকায় হাসপাতালের স্বাভাবিক কর্মকান্ড বিঘিœতসহ যত্রতত্র পড়ে থাকা ইট-বালু ও অর্ধনির্মিত সব অবকাঠামো স্বাভাবিক কর্মকান্ড ভীষণভাবে ব্যহত হচ্ছিল। এসব বিষয় হাসপাতাল ব্যস্থাপনা কমিটি বারবার মহাপরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার পরও কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় এ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়ে ।রাজবাড়ীর বিভিন্ন সময়ে থাকা সিভিল সাজনগণ এ বিষয়ে অন্তত ২৫ টি পত্র সংশি¬ষ্ট দফতরে পেরণ করেন। হাসপাতালে এ নাজুক বিষয়ে দৈনিক যুগান্তরে কয়েকবার ভুঁইফোর এ ঠিকাদার কাজ শেষ না করে টাকা তুলে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ প্রকাশ হয়। টেকসিম ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড নামের এ প্রতিষ্ঠানটির অফিস ঢাকার মিরপুরের বেগম রোকেয়া সরণীর ৫৬৭,পূর্বকাজী পাড়ায় (৪র্থ তলা) উলে¬খ থাকলেও তার কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এর সত্বাধিকারী মোঃ শফিকুর রহমানকেও খুঁজে পায়নি কেউ ।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি) প্রধান কার্যালয় ঢাকা থেকে রাজবাড়ী জেলা সদরের এ হাসপাতালটিকে ৫০শয্যা থেকে ১০০শয্যায় উন্নীতকরণ কাজের (দ্বিতীয় পর্যায়) জন্য উপরে উলে¬খিত ঠিকাদারী প্রষ্ঠিানকে ৫ কোটি ৯১ লাখ ৫০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেয়া হয়। সে সময় মাত্র ৫০ভাগ কাজ করে সংশি¬ষ্ট প্রকৌশলীদের যোগসাজসে ৯০ভাগ কাজ শেষ করার সনদ প্রদানের মাধ্যমে ৫কোটি ২২লাখ ২৫হাজার টাকা উত্তোলন করে পালিয়ে যায় ঠিকাদার। অনেক লেখালেখি ও পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর প্রকৌশল বিভাগ ও ঠিকাদারের যুগপথ যোগসাজসকে আমলে নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন। যার ফলশ্রুতি দুদক অনুসন্ধান শুরু করে। দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত কার্যালয় ফরিদপুর থেকে ৬ মে ২০১৪ সালে প্রেরিত পত্রে স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সমস্থ নথিপত্র ১২জুন ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সরবরাহ করতে বলা হয়। এর মধ্যে দাখিলকৃত দরপত্র সমূহ, তুলনামূলক বিবরণী, মূল্যায়ন প্রতিবেদন,বিক্রিত সিডিউলের তালিকা,প্রাক্কলন রিপোর্ট,অনুমোদিত নক্সা, চুক্তিপত্র, পরিমাপ বই, ঠিকাদারের প্রদানকৃত বিল সমূহ, সমাপনী প্রতিবেদন এবং প্রকল্পের অনুমোদিত বাজেট নথি ইত্যাদি।
জানা গেছে, দুধকের চিঠি পাওয়ার পর ফরিদপুর নির্বাহী প্রকৌশল অফিস থেকে দুধকের চাহিদা অনুযায়ী সংশি¬ষ্ট কাগজপত্র ঢাকায় রয়েছে মর্মে উত্তর দেয়া হয়।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের ফরিদপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সংশি¬ষ্ট নথিপত্র দৃষ্টে দেখা যায়, ২০১০সালের ১৮আগস্ট কার্যাদেশ দেয়ার পর ২০ সেপ্টেম্বর লে-আউট প্রদান করা হয়। ৫ কোটি ৯১ লাখ ৫০ হাজার টাকার এ কাজ ১৫ মাসের মধ্যে শেষ করে ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেয়ার কথা। কাজ শেষ করা না করা ঠিকাদারের সাথে প্রকৌশল বিভাগের পত্র চালাচালিতে সীমাবদ্ধ থাকায় কাজের কাজ কিছুই হয়নি।একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়,প্রভাবশালী সরকার দলীয় ঠিকাদার হওয়ায় কোন উদ্যোগই কাজে লাগেনি। ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী রাজবাড়ী হাসপাতাল পরিদর্শনে এলে নির্মাণ কাজ বিষয়ে তাকেও অবিহিত করা হয়। কিন্তু,কোন ফল না হলেও প্রকৌশলীদের যোগসাজসে ৯০ভাগ কাজ শেষ করার সনদ প্রদানের মাধ্যমে ৫কোটি ২২লাখ ২৫হাজার টাকা উত্তোলন করে করে ঠিকাদার।
কাজের ড্রয়িং এর মধ্যে নিম্নবর্ণিত কাজ গুলোই প্রধান। জুনিয়র কন্সাল্টেন্টেদের আবাসিক কোয়াটার,সুপারিন্টেন্টের কোয়াটার, মর্গ (ডেডবডি রাখার আধুনিক ভবন), বিদ্যুতের সাবস্টেশন ভবন,ইমার্জেন্সি ভবনের রি-মডেলিং, প্রশাসনিক ভবনের ঊর্ধমুিখ (ভার্টিকেল) সম্প্রসারণ, মূল ভবনের তিনতলা ঊর্ধ মুখি সমপ্রসারণ, দ্বিতীয় তলায় অতিরিক্ত আরেকটি আধুনিক অপারেশন থিয়েটার নির্মাণ, হাসপাতালে অবস্থিত সবগুলো ভবন সংস্কার, হাসপাতলের অভ্যন্তরে সড়ক নির্মাণসহ নতুন কন্সল (কভার) তার দিয়ে বৈদ্যুতিক ইলেক্ট্রিফিকেশন ইত্যাদি কাজ। গত ২৯ জুন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের ডিজি,প্রধান প্রকৌশলী রাজবাড়ীর দু’জন এমপি হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে বাস্তব চিত্র দেখে হতবাক হয়ে যান।এক পর্যায়ে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি কাজ না করে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করায় প্রধান প্রকৌশলীকে রীতিমতো ভর্ৎসনা করেন।পরে প্রধান প্রকৌশলী সংশি¬ষ্ট ঠিকাদার ও ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও সংশি¬ষ্টদের কাজ শেষ করার নিদের্শ দেন। দুদকের অনুসন্ধান ও প্রধান প্রকৌশলীর চাপে ঠিকাদারকে না পেয়ে নিজেরাই কাজ শেষ করার দায়িত্ব নেন এ প্রকৌশলীরা।
বুধবার রাজবাড়ী হাসপাতাল ঘুরে রাজমিস্ত্রি ও রংমিস্ত্রিদের কাজ করতে দেখা গেছে।আলাপকালে জনৈক রংমিস্ত্রি জানান,ফরিদপুরের প্রকৌশলীদের নিজ টাকায় একাজ হচ্ছে।রাজমিস্ত্রি জানান,এপর্যন্ত ৩০পিয়ার জানালার গ্রিল,২০পিয়ার দরজার চৌকাঠ,এবং তৃতীয় তলায় টাইল্স লাগানোর কাজ শেষ পর্যাযে।পাশপাশি রং ও হোয়াইট ওয়াসের কাজ চলছে সমান তালে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক প্রকৌশলী জানান.ঠিকাদার সরকার দলীয় নেতা হওয়ায় তাদের ‘টিকি’ পর্যন্ত না ধরতে না পারায় বিল থেকে প্রাপ্ত কমিশনের টাকায় এখন পুরো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে এরা। এতে ৬০/৭০লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিভিল সার্জন ডাঃ মাহবুবুল হক জানান,গত ঈদের আগে আকম্মিকভাবে কিছ্র লোক কাজ করতে এলে কারা কাজ করাচ্ছেন জিজ্ঞাসা করলে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তারা।তবে সিভিল সার্জনের ধারণা দুদকের অনুসন্ধান ও মহাপরিচালকের চাপে সংশি¬ষ্ট প্রকৌশলীরা নিজ উদ্যোগে এ কাজ করছেন। আর এঅর্থ যোগান দিচ্ছেন তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এফ,এ মোঃ মুরশিদ,সহকারীী প্রকৌশলী আলতাফ হোসেন ও অন্যরা।তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী বর্তমান বরিশালে পোস্টিং পেয়েছেন বলে জানা গেছে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।তবে প্রধান প্রকৌশলীসহ পদস্থ কর্মকর্তাগণ ওই প্রভাবশালী ঠিকাদারের কাছে অসহায় ছিলেন বলে দাবি করেছিলেন তারা।
এদিকে, প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের ক্রীড়নক মাহবুল হাসান কাবুলের পার্টনার সিমটেক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের মালিক শফিকুর রহমানের অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরে কথিত শ্বেতপত্র তৈরী করে রাজবাড়ীসহ সংশি¬ষ্ট বিভিন্ন অফিসে পাঠিয়েছেন।কাবুল সাহেব নিজেকে ‘ধোয়া তুলসি পাতা’হিসাবে প্রচার করার চেষ্টা করছেন বলে জানান অভিজ্ঞরা।

(Visited 150 times, 1 visits today)