‘ট্রলারের ভটভট শব্দ পাইলেই…’

গণেশ পাল :

82

‘ঘরে চাইল নাই। প্যাটের খিদায় পুলাপানরা খালি কান্দে। তাগো মুখে খাওন দিতে পারি না। এদিকে কামকাইজ না থাকোনে সুয়ামীও ঘরে বইসা আছে। তাই ট্রলারের ভটভট শব্দ পাইলেই গাঙের পারে যাই। মনে হয় এই বুজি রিলিফ নিয়া ট্রলার আইল।’ কথাগুলো রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দেবগ্রামের দিনমজুর ছাদেক আলী শেখের স্ত্রী রেজিয়া বেগমের। পদ্মার গ্রাসে জমি-ঘরবাড়ি হারিয়ে তিনি এখন আশ্রয় নিয়ে আছেন দেবগ্রামের চরে। সেখানে পলিথিন ও পাটখড়ির ছাউনিঘরে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেবগ্রামে রেজিয়ার মতো নদীভাঙা কয়েক শ পরিবার এখন পানিবন্দি হয়ে আছে। পাশাপাশি ওই পরিবারগুলোর মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।

গতবৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, গোয়ালন্দের দেবগ্রাম ইউনিয়নের সাজাপুর, দেবগ্রাম, চরদেলুন্দি, বেধুরী, কাউজানি, রাখালগাছি, বেতকা, দৌলতদিয়া ইউনিয়নের নহারী মণ্ডলপাড়া, ঢল্লাপাড়া, ইদ্রিস মিয়ারপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। এলাকার ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, মসজিদ, কবরস্থান পানিতে ডুবে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় বন্ধ হয়ে গেছে বেতকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাশাপাশি নদীভাঙন দেখা দেওয়ায় অনেক এলাকার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে, গাছপালা কেটে পরিবার-পরিজন নিয়ে নৌকা ও ট্রলারে করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে।

দেবগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান মো. আতর আলী সরদার জানান, দেবগ্রাম ইউনিয়ন একটি নদীভাঙন এলাকা। কয়েক বছরের ভাঙনে এই ইউনিয়নের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা এখন নদীতে। এবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। গত সাত দিনে দেবগ্রামের শতাধিক পরিবার ভাঙন আতঙ্কে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে গেছে। এদিকে প্রতিবছর ভাঙনের ফলে পদ্মাপারের এ ইউনিয়নটির ভৌগোলিক সীমানা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। অথচ গণদাবির পরও এলাকার নদীভাঙন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন ঠেকানো না গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেবগ্রাম ইউনিয়ন এলাকা সম্পূর্ণ পদ্মায় বিলীন হয়ে যাবে।

দৌলতদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম মণ্ডল জানান, দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়ন নদীভাঙন এলাকা। প্রতিবছর এখানে ভাঙন দেখা দেওয়ায় এলাকায় ভূমিহীনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি সরকারের কাছে দাবি জানান।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম খান গোয়ালন্দ উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন ও বন্যার্তদের মধ্যে টাকা ও চাল বিতরণ করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, পদ্মাপারের গোয়ালন্দ এলাকার নদীভাঙন ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক গোপাল চন্দ্র দাস, গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ ঘোষ, দৌলতদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম মণ্ডল, দেবগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান মো. আতর আলী সরদার প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

(Visited 24 times, 1 visits today)