আদালতে রাজবাড়ী রেলওয়ের ডিজেল চোর চক্রের নাম প্রকাশ –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

 

রাজবাড়ী অঞ্চলে চলাচলরত ট্রেনের ইঞ্জিন ও ট্রেনের বগিতে থাকা পাওয়ারকার ইঞ্জিন থেকে নিয়মিত ভাবে হচ্ছে ডিজেল চুরি। ওই চুরি রোধে সাম্প্রতিক সময়ে রেলওয়ের গোয়েন্দা শাখার পুলিশ সদস্যরা তৎপর হয়। তারা রাজবাড়ীর কালুখালী রেলষ্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রেনের পাওয়ারকার থেকে ডিজেল চুরির সময় হাতেনাতে ইয়াদ আলী নামে এক চোরকে গ্রেপ্তার করে। তারা ইয়াদ আলীর বিরুদ্ধে রাজবাড়ীর রেলওয়ে থানায় করেন মামলা দায়ের। ওই মামলার প্রেক্ষিতে ইয়াদের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। রিমান্ড শেষে তাকে গত বৃহস্পতিবার আদালতে সোর্পদ করা হয়। এর পরই ইয়াদ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার ওসি হারুন মজুমদার বলেন, ইয়াদ আলী ওই জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালতের বিচারক আরিফুজ্জামান। জবানবন্দীতে ইয়াদ আলী বলেন, তিনি রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার তাজুল ইসলাম ওরফে তাজু মেম্বারের মালিকানাধিন জেলার কালুখালী রেলষ্টেশন এলাকায় থাকা জিএম ট্রেডার্সের একজন কর্মচারী। তিনি তাজু মেম্বারের নির্দেশে গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া থেকে ছেড়ে আসা রাজবাড়ী গামী “ভাটিয়াপাড়া-কালুখালী এক্সপ্রেস ট্রেন”টি জেলার কালুখালী রেলষ্টেশনে পৌছানোর পর ওই ট্রেনের ৫৪/২ না কোচে থাকা “পাওয়ারকার”এ ওঠেন এবং ওই পাওয়ারকারের ইঞ্জিন চালক আলাউল হক বিশ^াস তাকে দুইটি ক্যানে ২০ লিটার ডিজেল প্রদান করেন। আর ওই ডিজেল নিয়ে তাজু মেম্বারের জিএম ট্রেডার্সে যাবার আগ মূহুর্তে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি আরো বলেন, তাজু মেম্বারের ভাই আবু বক্কারের একটি তেলের দোকান রয়েছে সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের সূর্যনগর বাজারে। তারা ইঞ্জিন থেকে ডিজেল সংগ্রহ করে তা পর্যায়ক্রমে আবু বক্কারের দোকানে পাঠায় ওই দোকান থেকেই ক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি করা হয়। তারা ইঞ্জিন থেকে ৫০ টাকা লিটার দরে ডিজেল কেনেন। আর বিক্রি করে ৬০ টাকা লিটার দরে। পেট্রেল পাম্পে ওই ডিজেলের দাম প্রতিলিটার ৬৮ টাকা। তাছাড়া পেট্রোল পাম্পের ডিজেলের চাইতে ট্রেনের ইঞ্জিনের ডিজেলের চাহিদা বাজারে বেশি এবং দাম লিটার প্রতি ৮ টাকা কম। ফলে স্যালো ইঞ্জিন চালিত নছিমন, করিমন, পাওয়ার টিলারসহ ডিজেল চালিত যানবাহন চালকরা এ তেল সংগ্রহ করতে অধিক ব্যস্ত থাকেন।
ওসি হারুন মজুমদার আরো বলেন, ইয়াদ আলী জেলার কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের ইয়াছিল মোল্লার ছেলে। তার জবানবন্দীতে ট্রেনের পাওয়ারকারের ইঞ্জিন চালক আলাউল হক বিশ^াস, জেলার কালুখালী রেলষ্টেশন এলাকায় থাকা জিএম ট্রেডার্সের মালিক ও রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার তাজুল ইসলাম ওরফে তাজু মেম্বার এবং তাজু মেম্বারের ভাই আবু বক্কারের না উঠে এসেছে। মামলার এজাহারে ওই তিন জনের নাম না থাকলেও গ্রেপ্তার হওয়া আসামির জবানবন্দীতে ওই নাম গুলো উঠে আসায় তারাও এখন এ মামলার আসামি। তবে ঘটনার পর থেকে ওই তিন জন আতœগোপনে রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাত রয়েছে।
জানাগেছে, এর আগে ২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর “দৈনিক কালের কণ্ঠ” পত্রিকার প্রিয় দেশ পাতায় “ইঞ্জিন থেকে তেল চুরি” শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। ওই রিপোর্ট প্রকাশ পাবার পর এ অঞ্চলের রেলওয়ে বিভাগে হয়েছিল তোলপাড়া। সে সময় একাধিক তদন্ত কমিটির গঠন হয়। ওই তদন্ত কমিটির কর্তাব্যক্তিরা বেশ কয়েক দফা রাজবাড়ীতে এসে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে বন্ধ হয়নি তেল চুরি। তৎকালিন সময়ে সাময়িক ভাবে ওই চুরির ঘটনা রোধ হলেও পরবর্তীতে চোরেরা রাতের আঁধারে শুরু করে ট্রেনের ইঞ্জিনের ডিজেল চুরির কার্যক্রম। যদিও ওই রিপোর্ট প্রকাশের পর দিন রেল ইঞ্জিন গুলোর দেখভালকারী রাজবাড়ী রেলওয়ের লোক ফোরম্যান বিজয় কুমার ঘোষ রেলওয়ের উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী রাজবাড়ী রেলওয়ে থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। ওই অভিযোগে তেল চোর চক্রের সদস্য ও জেলা সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের সাবেক সদস্য তাজুল ইসলাম ওরফে তাজু মেম্বার, জেলা সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের দফাদার মোসলেম মোল্লা, কালুখালী ষ্টেশন সংলগ্ন তেল ব্যবসায়ী রানা চৌধুরী ও পাংশার খালেকসহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিলো।
সংশ্লিষ্ঠরা জানায়, বৃটিশ আমল থেকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটের সাথে দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম বাহন ট্রেন। বর্তমানে রাজবাড়ী-খুলনা, রাজবাড়ী-রাজশাহী, রাজবাড়ী-পোড়াদহ, রাজবাড়ী-ফরিদপুর, কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া, রুটে বেশ কয়েকটি ট্রেন নিয়মিত ভাবে চলাচল করছে। প্রতিদিন এ ট্রেনের ইঞ্জিন গুলো খুলনার ডিপো থেকে কয়েক হাজার লিটার তেল নিয়ে রাজবাড়ীতে আসে। ইঞ্জিনের চালকরা ওই তেলের অংশ বিশেষ রাজবাড়ীর একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়।
সৈয়দপুর রেলওয়ের পুলিশ সুপার সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান জানান, দীর্ঘ দিন ধরে রাজবাড়ী অঞ্চলে চলাচল রত ট্রেন থেকে ডিজিল চুরির ঘটনা ঘটছে। চোরদের গ্রেপ্তার করতে তিনি রেলওয়ের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদের নিযুক্ত করেন। ওই সদস্যরা গত শনিবার সন্ধ্যায় গোপালগঞ্জের ভাটিয়াপাড়া থেকে ছেড়ে আসা রাজবাড়ীগামী “ভাটিয়াপাড়া-কালুখালী এক্সপ্রেস ট্রেন”টি জেলার কালুখালী রেলষ্টেশনে পৌছার পর নজরদারী শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা দেখতে পান ওই ট্রেনের ইঞ্জিনের পাওয়ার কার থেকে তেল তুলে তা দুইটি ড্রপে ভড়া হয়েছে। তারা সে সময়ই ওই তেল জব্দ করার পাশাপাশি তেল চোর চক্রের সদস্য ইয়াদ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে।

(Visited 335 times, 1 visits today)