২০০-র ওপর পদক জিতেছে রাজবাড়ীর সাঁতারু ডলি আক্তার –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

76555

অলিম্পিকে প্রথমবার গিয়ে ডিসকোয়ালিফাইড। আরেকবার অলিম্পিকে এসে দুঃখ ভোলার শপথ করেছিল যে কিশোরীটি সময়ের পরিক্রমায় তাঁর নামের পাশে এখন তিন অলিম্পিকে অংশ নেয়ার গৌরব। দুঃখ আছে আরেকটা, সাফ বা এসএ গেমসে সোনা নেই। এইটুকু বাদ দিলে ডলি আক্তারের আর সব কিছুতে শুধুই পাওয়ার গল্প। দক্ষিণ এশিয়া পর্যায়ে ৯টি পদক আর জাতীয় পর্যায়ে! প্রায় ২০০! জলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নাকি প্রেমের মতো। জলকন্যার এই দীর্ঘ প্রেমের গল্প শুনলেন কালের কন্ঠের রিপোর্টার নোমান মোহাম্মদ।
প্রশ্ন : অলিম্পিক মাত্র শেষ হলো। তা দিয়েই কথাবার্তা শুরু করতে চাই। আপনি তো তিনটি অলিম্পিকে অংশ নেন?
ডলি আক্তার : হ্যাঁ। প্রথম ২০০০ সালে সিডনিতে, এরপর ২০০৪ সালে এথেন্সে আর সর্বশেষ ২০০৮ সালে বেইজিংয়ে।
প্রশ্ন : এবার আবার যখন অলিম্পিক এলো, নিজের অলিম্পিক স্মৃতিগুলো মনের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে নিশ্চয়ই?
ডলি : অবশ্যই ভালো লাগে। অলিম্পিক এলেই পুরনো দিনের কথাগুলো মনে হয়। অনেক অভিজ্ঞতার কথা মনে হয়। প্রথম যখন অলিম্পিকে যাই, তখন আমি খুব ছোট। বয়স ১৩-১৪ বছরের মতো। অলিম্পিক যে কত বড় আসর, তা বোঝার মতো বয়স হয়নি। বরং এরপর যত সময় যায়, ততই মনে হয় আমি কী করেছি। কিভাবে করেছি। সত্যি বলতে কি, তখন যতটা ভালো লাগত, এখন স্মৃতিগুলোর কথা মনে করে আরো বেশি ভালো লাগে।
প্রশ্ন : ২০০০ সালের গেমসে মাইকেল ফেলপসও ছিলেন। তাঁর সঙ্গে দেখা হয়?
ডলি : সুইমিং পুলে আমাকে অনেক বড় বড় সাঁতারুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন কারার ছামেদুল ভাই। মাইকেল ফেলপসের সঙ্গেও হয়তো পরিচয় হয়। কিন্তু ওই যে আমার বয়স তখন খুব কম। সব কথা মনে নেই। আবছা আবছা কিছু মনে পড়ে। তবে এরপর আমি ও ফেলপস একই সুইমিং পুলে ওয়ার্মআপ করি।
প্রশ্ন : এরপর মানে ২০০৪ সালের অলিম্পিকে?
ডলি : না, ২০০৮ সালে বেইজিংয়ে। একই পুলে, একই লেনে অনুশীলন করি আমি ও ফেলপস। তখন একেবারে চোখের সামনে থেকে দেখি, ওর সাঁতারের ধরন, শারীরিক গড়ন—সব কিছু। যত দেখি, তত মুগ্ধ হই। আসলে ২০০০ সালে দেখা হলেও তখন তো ফেলপস এত বড় সাঁতারু হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ২০০৮ সালে ও রীতিমতো কিংবদন্তি। সোনার পর সোনা জিতছেন। এমন একজনের সঙ্গে একই পুলে অনুশীলন করাও ভাগ্যের ব্যাপার। অনুশীলন শেষে ছবি তুলি ফেলপসের সঙ্গে। সে ছবি আমার কাছে আছে এখনো।
প্রশ্ন : ২০০০ সালে প্রথম অলিম্পিকে গিয়ে আপনি ডিসকোয়ালিফায়েড হন। তা কতটা দুঃখের?
ডলি : খুব দুঃখজনক ঘটনা। কিভাবে যে কী হয়ে যায়, বুঝতে পারিনি। আসলে আমাদের বাংলাদেশে সাঁতার শুরুর জন্য একজন মুখে হুইসেল নিয়ে বাজান। ওখানে আবার ইলেকট্রনিক হুইসেল। সাঁতারের স্টার্টিং পয়েন্টে যাওয়ার পর ওই মুহৃর্তে কেন যেন মনে হয়, গ্যালারি থেকে কেউ হুইসেল বাজায়। ব্যাস, লাফ দিয়ে দিই পুলে। হয়ে যাই ডিসকোয়ালিফায়েড। ছামেদুল ভাই আমাকে তখন বলেন, ‘অ্যাই, তুই এটা কী করলি?’ যে কী করলাম, তা তো বুঝিনি। সবাইকে বলি, ‘আমি হুইসেল শুনেই লাফ দিয়েছি।’ তখন তাঁরা বুঝিয়ে বলেন, হুইসেল সম্ভবত গ্যালারি থেকে বাজে। কারণ ওরা যে ইলেকট্রিক হুইসেল দেবে, তা অন্য রকম। ১৩-১৪ বছরের বাচ্চা একটা মেয়ে সেই কোন দূরের অস্ট্রেলিয়া যাই অলিম্পিক সাঁতারে অংশ দিতে; ওই সাঁতরাতেই যখন পারিনি কি যে মন খারাপ হয়, বলার মতো না।
প্রশ্ন : তখন কি ভেবেছিলেন, আবার অলিম্পিকে কখনো সাঁতরাতে পারবেন? ডলি : বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, সেবার ঠিকঠাক সাঁতরাতে পারলে হয়তো আবার অলিম্পিকে আসার জেদ থাকত না। কিন্তু আমি তো ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে যাই। মনে মনে তখন শপথ করি, ‘আবার আমি এই অলিম্পিকে আসব, আবার আমি এখানকার সুইমিং পুলে নামব।’ ওই শপথের কারণেই আরো দুটি অলিম্পিকে অংশ নিতে পারি।
প্রশ্ন : সেখানে তো পারফরম্যান্স মোটামুটি ভালোই ছিল?
ডলি : ২০০৪ অলিম্পিকের প্রস্তুতিতে আমাকে ও জুয়েল আহমেদকে বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশন থেকে পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে। ওখানে তিন মাস থাকার পর চীনের কুনমিংয়ে তিন মাস। এই প্রস্তুতি খুব কাজে লাগে। এথেন্স অলিম্পিকে আমি অংশ নিই ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে। আমি হিটে হই প্রথম। আর সেখানে নিজের আগের সেরা টাইমিংয়ের চেয়ে ভালো টাইমিং করি। তখন মনে হয়, চার বছর আগে যে শপথ করি, তা সার্থক হয়েছে। সাঁতার নিয়ে আমার সাধনাও সার্থক। প্রশ্ন : ২০০৮ সালে? ডলি : বেইজিংয়েও আমার ইভেন্ট ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল। সেখানেও নিজের সেরার চেয়ে ভালো টাইমিং করি। ৮৬ জনের মধ্যে হই ৬১ নম্বর। আমরা তো আর পদক জিততে অলিম্পিকে যাই না। সে কারণে এই টাইমিং, এই অবস্থান মন্দ কি! প্রশ্ন : বাংলাদেশের মতো দেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য একবার অলিম্পিক অংশ নেওয়াই অনেক বড় ব্যাপার। সেখানে আপনার অংশগ্রহণ তিন-তিনটি আসরে। তা কতটা গর্বের?
ডলি : এ গর্ব বলে বোঝানোর মতো না। যে মেয়েটি প্রথম অলিম্পিকে গিয়ে ডিসকোয়ালিফায়েড হয়, তার জন্য অর্জনটা আরো বেশি কিছু। আর আমার জানামতে, বাংলাদেশের আর কেউ তিন অলিম্পিক খেলতে পারেনি। সে হিসেবে গর্ব হয় অবশ্যই। তবে এই ‘তিন’-এ আমি থেমে থাকতে চাই না।
প্রশ্ন : মানে আরো অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন আছে? ডলি : অবশ্যই, কেন নয়। আমার বয়স সাঁতার ছাড়ার মতো হয়নি। মনপ্রাণ ঢেলে দিয়ে তাই চেষ্টা করব। তাতে হয়েও যেতে পারে। ২০১২ ও ২০১৬ সালে পারিনি। কিন্তু সামনে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, বাংলাদেশ গেমস, এসএ গেমসে যদি নিজের সেরা দিতে পারি—তাহলে ২০২০ অলিম্পিকে খেলা অসম্ভব না। আমি অন্তত থামব না, সে চেষ্টা করে যাব।
প্রশ্ন : এবার সাঁতারের শুরুটা একটু জানতে চাই…। ডলি : আমার জন্ম রাজবাড়ীর দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামে, ১৯৮৮ সালে। বাবা মো. রওশন আলীর ছিল রিকশার গ্যারেজ। মা আমেনা বেগম বাসা সামলান। এক ভাই, এক বোনের মধ্যে আমি বড়। গ্রামের মেয়ে বলে পুকুরে সাঁতার কাটি একেবারে ছোটবেলা থেকে। সাঁতারে যে প্রতিযোগিতা হয়, এখানে ভালো করলে পদক পাওয়া যায় এসব কিছু তো আর জানতাম না।
প্রশ্ন : জানলেন কবে? মানে প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারের ধারায় এলেন কিভাবে? ডলি : রাজবাড়ীর শহীদ স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শ্রেণিতে পড়ি তখন। শহীদুন নবী আলম কাকু তখন সম্ভবত স্কুল কমিটির সভাপতি। তিনি খেলাধুলা খুব পছন্দ করেন। পাকিস্তান আমলে ভালো দূরপাল্লার দৌড়বিদ ছিলেন। স্কুলে যখন খেলাধুলা হতো, ১০০ মিটার, ২০০ মিটার দৌড়, হাই জাম্প, লং জাম্প, সাঁতার—সব কিছুতে নাম দিই আমি। আর আমার কাছ থেকে কোনো ইভেন্টে কেউ প্রথম পুরস্কার ছিনিয়ে নিতে পারে না। এগুলোর মধ্যে বেশি ভালো ছিলাম সাঁতারে। ফলে আলম কাকুর অধীনে সাঁতার প্রশিক্ষণ শুরু হয়। প্রশ্ন : সুইমিং পুলে নিশ্চয়ই নয়? ডলি : না। স্টেডিয়ামের পাশে বড় একটি পুকুর আছে, সেখানে। কোচকে আমরা সবাই বলি আলম কাকু। তিনি নিজের চেষ্টায়, রাজবাড়ী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহায়তায় ওই পুকুরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দেন। তখন আমার স্কুলের ব্যাগের মধ্যে সব সময় সাঁতারের পোশাক থাকত—একটি শর্ট প্যান্ট, একটি স্যান্ডো গেঞ্জি ও একটি গামছা। বিকেল ৪টায় স্কুল ছুটি হওয়ার পর দৌড়ে ছুটে যাই সাঁতার অনুশীলনে। প্রশ্ন : ঢাকা এলেন কবে? ডলি : ১৯৯৭ সালে, জুনিয়র সাঁতারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে। প্রশ্ন : ফল কেমন ছিল? ডলি : সেবার মোট ১১টি ইভেন্টে অংশ নিই। জিতি চার সোনা, তিন রুপা ও চার ব্রোঞ্জপদক। রাজবাড়ীর পুকুর থেকে ঢাকায় এসে জাতীয় পর্যায়ে যখন এমন সাফল্য পাই, তখন মনে হয়, সাঁতারে বোধ হয় আমি কিছু করতে পারব। প্রশ্ন : ঢাকায় আসার জন্য মা-বাবাকে রাজি করানো কি সহজ ছিল?
ডলি : না, শুরুতে তো তাঁরা বেশ রাগী রাগী। তাঁদের ছাড়া ঢাকা যাব, সেখানে ঠাণ্ডা পানি লেগে অসুখ হবে—এমন কথা বলেন। কিন্তু দাদির জন্য আমাকে আটকাতে পারেননি। আসলে রাজবাড়ীর স্টেডিয়াম পুকুরে সাঁতার শুরুর সময় মা-বাবা জানতেন না। জানার পর খুব উৎসাহও দেননি। বাড়িতে আমার একমাত্র উৎসাহদাতা দাদি। তিনি এসে পুকুর পাড়ে বসে আমার সাঁতার দেখেন। মা-বাবাকে ধমক দেন, ‘আমার নাতির সাঁতার কাটতে ভালো লাগে, ও সাঁতার কাটবে।’ ঢাকা যাওয়ার সময়ও তা বলেন। দাদি আনিসা খাতুন এখন বেঁচে নেই। এ বছর ১ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন। তবে সাঁতারে আমার যা কিছু সাফল্য, তাতে দাদির অনেক অবদান। বাসার অন্যরা কী খাবে না খাবে, দাদি আমার জন্য ডিম-দুধ-কলা আলাদা করে রাখতেন। আর কোচ আলম কাকুর ঋণও কখনো শোধ করার নয়।
প্রশ্ন : প্রথমবার ঢাকা গিয়ে ১১ ইভেন্টের সব কটিতে পদক পাওয়ার পর মা-বাবা খুশি হননি?
ডলি : হ্যাঁ, আমি বাড়ি ফেরার আগেই তো পত্রিকায় ছবি দেখেন। খুব খুশি। দাদি তো মহাখুশি। ফেরার পর গ্রামের লোকও মাথায় হাত দিয়ে আদর করে। রাজবাড়ী জেলা ক্রীড়া সংস্থার লোকজনও খুশি।
প্রশ্ন : তিন অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার কারণে আপনার সাফ গেমস কিংবা এখনকার এসএ গেমসের কীর্তি কিছুটা আড়ালে পড়ে যায়। ওই প্রতিযোগিতায়ও তো আপনি বেশ কয়েকবার সাঁতরান?
ডলি : চারবার। ১৯৯৯ সালে কাঠমাণ্ডু সাফ গেমসে প্রথমবার। সেবার নেপাল যাওয়ার সময় মজার ঘটনা। আমরা মেয়ে ছিলাম চারজন। সবুরা খাতুন, কমলা আক্তার, লিপি আক্তার ও আমি। আমাদের কোচ এসএম ঢালী স্যার। আমি তখনো তো পিচ্চি। জীবনে প্রথম প্লেনে উঠেছি, ভয় ভয় লাগছে। স্যার এসে জিজ্ঞেস করেন, ‘কি রে, তোরা ভয় পাচ্ছিস?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, যদি প্লেন থেকে পড়ে যাই।’ তিনি বলেন, ‘তোদের আর নেপাল নেব না। হিমালয় পাহাড়ে নিয়ে প্লেনের জানালা দিয়ে ফেলে দেব। তোরা গড়াতে গড়াতে বাংলাদেশে চলে যাবি।’ আমার একবার মনে হয়, স্যার মজা করছেন। আবার মনে হয়, সত্যিও হতে পারে। আমরা কেউ আর প্লেনের জানালার দিকে বসি না। মাঝের দিকের সিটে এসে বসি।
প্রশ্ন : পদক জয়ের আশা নিয়ে যান কাঠমাণ্ডুতে?
ডলি : আমি অতশত কিছু বুঝি তখন? শুধু বুঝি, সবচেয়ে দ্রুত সাঁতার কাটতে হবে। তা করেই ৫০ মিটার ও ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে রুপা পাই। ২০০ মিটারে ব্রোঞ্জ। আর ১০০ মিটার মিডলে রিলেতে রুপা। মোট চারটি পদক। এতে আমি যতটা খুশি হই, দলের অন্যদের আনন্দ দেখে খুশি হই আরো বেশি।
প্রশ্ন : ২০০৪ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে পরের সাফ গেমসে?
ডলি : সেখানেও জিতি সিলভার-ব্রোঞ্জ। আর শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ২০০৬ সালের গেমসে একটুর জন্য সোনার পদক পাইনি। ৫০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে দুজন প্রায় একসঙ্গে স্পর্শ করি ফিনিশিং প্যাড। এখানে আমি মাইক্রো সেকেন্ডে পিছিয়ে থাকায় সোনার পদক পাওয়া হয়নি। আর এসএ গেমসে সর্বশেষ খেলি ২০১০ সালে; আমাদের দেশে।
প্রশ্ন : চার সাফে মোট পদক কয়টি?
ডলি : ৯টি সম্ভবত। ছয়টি রুপা, তিনটি ব্রোঞ্জ।
প্রশ্ন : একবারও যে সোনার পদক পাননি, এ নিয়ে আফসোস হয় না?
ডলি : আসলে আমরা যতটা এগোই, ভারত তো আরো বেশি এগোয়। ওদের সঙ্গে পারা খুব কঠিন। কোনো কারণে ওদের সেরা সাঁতারু যদি পুলে না নামে, তাহলে ব্রেস্টস্ট্রোক ইভেন্টে বাংলাদেশ অবশ্যই সোনার পদক পাবে। এবার এসএ গেমসে যেমন পেল শিলা। কিন্তু ভারতের সেরা সাঁতারু নামলে কঠিন হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে বারবার যা হয়েছে। আমি হয়তো নিজের টাইমিং এক সেকেন্ড কমাই, ওরা দুই সেকেন্ড কমিয়ে বসে থাকে। এ কারণে সোনার পদক পাওয়া হয়নি। হ্যাঁ, অবশ্যই এটি আমার অনেক কষ্টের জায়গা। শ্রীলঙ্কার সাফে তো পাওয়া সোনার পদক পাইনি। মাইক্রো সেকেন্ডের ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে রুপা জিতি।
প্রশ্ন : ইন্দোবাংলা গেমসে আবার অনেক সোনার পদক জেতেন আপনি। তাতে কী সাফে সোনা না পাওয়ার আক্ষেপ গেছে?
ডলি : আমি তিনটি ইন্দোবাংলা গেমসে অংশ নিই। তাতে জিতি মোট ৯টি সোনার পদক। কিন্তু সাফে যে একবারও সেরা হতে পারিনি, ওই আক্ষেপ যায়নি। তবে আমি আশা ছাড়নি না। এখনো তো সাঁতারে আছি। চেষ্টা করব ভবিষ্যতে সাফে খেলে যেন সোনার পদক জিততে পারি।
প্রশ্ন : জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের পদক কয়টি?
ডলি : তা ভাই গুণে বলা যাবে না। সপ্তম বাংলাদেশ গেমসে আমার ৯টি সোনার পদক, সবই জাতীয় রেকর্ড গড়ে। এ ছাড়া প্রতি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সাত-আট-৯টি করে পদক থাকে। মোটা দাগে বলতে পারি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাঁতার মিলিয়ে ২০০-র ওপর পদক জিতেছি।
প্রশ্ন : ২০০!
ডলি : হ্যাঁ। আমি সব সময় মনে করি, সাঁতার আমার সহজাত প্রতিভা। সৃষ্টিকর্তা আমার ভেতরে কিছু দিয়ে দিয়েছেন। নইলে গ্রামের একটি মেয়ে এত এত পদক জেতে কিভাবে!
প্রশ্ন : এই ২০০ পদক ঠিকঠাক মতো সংরক্ষণ করাও তো কঠিন…
ডলি : বাবা খুব যতœ নিয়ে কাজটি করেন। এই যে কাল বাড়ি গিয়েছিলাম। তখন দেখি, পদকগুলো বাবা সুন্দর করে মুছে প্যাকেট করে রেখে দিয়েছেন। এক প্যাকেটের মধ্যে ছয়-সাতটি করে পদক। আমাকে বলেন, ‘দেখো, তোমার জিনিসগুলো কত সুন্দরভাবে রেখে দিলাম।’ আমি বলি, ‘খুব ভালো করেছেন। কারণ আমি তো এর পেছনে সময় দিতে পারছি না।’
প্রশ্ন : অলিম্পিক ও সাফ গেমসের বাইরে আর কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন?
ডলি : সাঁতারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে স্পেনের বার্সেলোনায় যাই ২০০৩ সালে আর ইতালির রোমে ২০০৯ সালে। ২০০৬ সালে এশিয়ান গেমস খেলি কাতারের দোহায়। এসব জায়গায় তো আর পদক জেতা যায় না। কিন্তু আমার যা টাইমিং, তার চেয়ে ভালো করে আসি। এতেই আমার তৃপ্তি।
প্রশ্ন : সর্বশেষ এসএ গেমসে আপনি ছিলেন না কেন?
ডলি : আমাকে ক্যাম্পে ডাকা হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে তাতে যোগ দিইনি। আর ২০১৪ সালের পর তো সাঁতারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হয়নি। প্রতিযোগিতামূলক সাঁতার করা হয়নি তাই। সামনে নভেম্বর-ডিসেম্বরে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হওয়ার কথা। সেখানে ইচ্ছা আছে আনসার-ভিডিপির হয়ে অংশ নেওয়ার। ভালো করলে এরপর আবার এসএ গেমস, অলিম্পিক ওসবের কথা ভাবা যাবে।
প্রশ্ন : মজা করে একটি প্রশ্ন করি। সাঁতার অনুশীলনের জন্য আগে দিনের একটা বড় অংশ তো পুকুরে পড়ে থাকতে হয়েছে, পরে যেমন কাটাতে হয় সুইমিং পুলে। পানিতে থাকতে থাকতে নিজেকে মাছ মনে হয় না কখনো?
ডলি : (হাসি) আমিও মজা করে উত্তরটা দিই। আনসার-ভিডিপির এক সহকর্মী বিলকিস ওর ছোট ছেলেকে নিয়ে আমার সাঁতার দেখতে যায় মিরপুর সুইমিং কমপ্লেক্সে। সুইমিংয়ের সময় আমাদের পোশাক থাকে আলাদা। ছোট ছেলেটি আমাকে ঠিক চিনতে পারে না। সুইমিংপুলের আমাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, ওটা কী?’ বিলকিস উত্তর দেয়, ‘ওটা হচ্ছে মাছ।’ ততক্ষণে ও আমাকে একটু একটু চিনেছে। বলে, ‘ওটা মাছ? ডলি আন্টি কি মাছ হয়ে গেছে?’ সবাই এ নিয়ে খুব হাসাহাসি করে। সাঁতার শেষ করে ওঠার পর আমার কাছে বলে এই গল্প। আমি বলি, ‘ঠিকই বলেছে। আমি তো মাছই। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টা পানিতে থাকতে হয়। এখন তো মাছই হয়ে গেছি।’ আসলে আমার কোচ একটি কথা বলতেন সব সময়, ‘তুই ভালোবাসবি পানিকে। তোর সম্পর্ক হবে পানির সঙ্গে। অন্য কারো সঙ্গে নয়।’ ওই কথা আমার কানে আজও বাজে। আমার ভালোবাসা, আমার সম্পর্ক তাই এখনো পানির সঙ্গেই।
প্রশ্ন : এখন আপনি আনসার-ভিডিপিতে চাকরি করছেন। এর শুরু কিভাবে?
ডলি : ১৯৯৭ সালে জুনিয়র সাঁতারের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ দেখার পর আনসার-ভিডিপি নিয়ে আসে আমাকে। সরাসরি চাকরি দেওয়া কঠিন বলে ভাতা দেয় ওরা। খেলা শুরুর তিন মাস-ছয় মাস আগে ওরা এই একাডেমিতে এনে ক্যাম্পের মতো করে অনুশীলন করায়।
প্রশ্ন : শুরুতে ভাতা কেমন ছিল?
ডলি : মাসে ১৫০০ টাকা। পরে তো স্থায়ী চাকরি হয়। এখন আমি সৈনিক হিসেবে আছি মহিলা আনসার ব্যাটালিয়নে। আসলে আনসার-ভিডিপিতে না এলে সাঁতারে এত দূর এগোতে পারতাম না। এই বাহিনী আমাকে আর্থিক নিশ্চয়তা দেয়, প্রশিক্ষণ দেয়, সব সময় আগলে রাখে। এখনকার স্পোর্টস ডিরেক্টর নিমাই চন্দ্র সাহা স্যার, স্পোর্টস অফিসার রায়হান উদ্দিন ফকির স্যার, এডিজি মিজান স্যাররা খুবই ক্রীড়াপ্রেমী। তাঁরা সব সময় আমাদের ক্রীড়াবিদদের উৎসাহিত করেন।
প্রশ্ন : মূলত কম দৈর্ঘ্যের সাঁতারে অংশ নেন আপনি। এর মধ্যে প্রিয় ইভেন্ট কোনটি?
ডলি : পানিতে থাকাই আমার প্রিয়, সাঁতার করেই মজা পাই। এর মধ্যেও ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল একটু বেশি। যদিও সাফে আমি বেশির ভাগই অংশ নিই ব্রেস্টস্ট্রোকে। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সাধারণত শেষ দিনে শেষ ইভেন্ট থাকে ৫০ মিটার ফ্রি স্টাইল অথবা ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল। সেখানে প্রধান অতিথির সামনে জিতে তাঁর হাত থেকে পুরস্কার নিতে বেশি ভালো লাগে।
প্রশ্ন : সমসাময়িকদের মধ্যে প্রিয় সাঁতারু কে?
ডলি : ছেলেদের মধ্যে কাজী মনির, কারার ছামেদুল, মেয়েদের মধ্যে সবুরা খাতুন, কমলা আক্তার, টুম্পা, নাজমা, শিলা। একটি মজার কাহিনী বলি। ওই যে কাজী মনিরের কথা বললাম, তাঁকে আমরা মেয়েরা সবাই ‘মামা’ বলি। একবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ছেলেদের ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইলে তিনি সোনার পদক জেতেন, মেয়েদের ইভেন্টে আমি। তখন পেপারে লেখা হয়, ‘মামা-ভাগনির সোনার পদক জয়’। খুব মজা লাগে। ওই পেপার কাটিং আমার বাসায় আছে এখনো। আরেকটি মজার ঘটনা মনে পড়ছে। বলি?
প্রশ্ন : বলুন না…
ডলি : বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর এখনকার সাঁতার কোচ আমিরুল ইসলাম, সহকারী কোচ কামাল হোসেন। আমি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে পুলে নামলে তাঁরা দুজন এক হাজার করে টাকা বের করেন। বলেন, ‘ডলি, এই টাকা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। সোনার পদক জিতলেই পাবে।’ ঠিকই সোনার পদক জিতি। আর পানিতে থাকা অবস্থাতেই টাকা আদায় করে নিই। এরপর সেই টাকা দিয়ে দলের সবাই পার্টির মতো করি। খুব মজা হয়।
প্রশ্ন : জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে আপনার তো ভুরি ভুরি সোনার পদক। এক হাজার টাকা করে নিতে নিতে ওই দুজনকে তাহলে ফতুর করে দিয়েছেন…
ডলি : (হাসি) আসলে আমার সাফল্যের জন্য তাঁরা অমন করেন। যেন আরো ভালো করতে পারি, টাইমিং যেন আরো কমাতে পারি—সে জন্য সবার সামনে এমন অনুপ্রেরণা দেন। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ এলেই তাই কোচদের বলি, ‘আপনারা টাকা আলাদা করে রাখেন। এবারও সোনার পদক জিতব।’
প্রশ্ন : যেসব কোচের অধীনে সাঁতার শেখেন, সেরা মনে হয় কাকে?
ডলি : সেই ১৯৯৭ থেকে শুরু করি সাঁতার। ২০ বছরের মতো হয়ে গেল। কম কোচের অধীনে তো প্রশিক্ষণ নিইনি। তাঁদের মধ্যে আলাদা করতে গেলে প্রথমেই বলব রাজবাড়ীর শহীদুন নবী আলমের কথা। প্রথম কোচ হিসেবে তাঁর প্রতি দুর্বলতা অন্য রকম। আর অন্যদের মধ্যে এসএম ঢালী ও মাহবুব রহমানের কথা বলতে পারি। আর বিদেশি হিসেবে সেরা পার্ক তে গুন।
প্রশ্ন : আমাদের সমাজে মেয়েদের চলার পথে অনেক বাধা। এই যে আপনি রাজবাড়ী থেকে ঢাকায় এসে সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, গাজীপুরে আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে থাকেন—এসব নিয়ে অনেক বাধার সম্মুখীন নিশ্চয়ই হতে হয়?
ডলি : শুরুর সময়ে কত দিক দিয়ে কত কথা শুনেছি! আসলে রাজবাড়ী খুব ছোট শহর। মা-বাবা-দাদিকে লোকে নানা কথা বলে, তা আমার কানেও আসে। কিন্তু মনে হতো, যে যাই বলুক, কানে নেব না। আমি সাঁতরে যাব, আমার কাজ করে যাব।
প্রশ্ন : কাজটি সার্থকভাবে করতে পেরেছেন বলে মনে করেন?
ডলি : অবশ্যই। যে লোকগুলো একসময় আমাকে নিয়ে নানা কথা বলত, বাঁকা কথা বলত—তারা এখন আপনজন হয়ে গেছে। দেখা হলে ভালো ভালো কথা বলে, ফোন করে খোঁজখবর নেয়। তাদের সন্তানকে সাঁতারে দিতে চায়। তাতেই মনে হয়, আমি সার্থক হয়েছি।
প্রশ্ন : সাঁতার ছাড়া অন্য কোনো খেলায় আগ্রহ নেই?
ডলি : আমি তো জাতীয় পর্যায়ে ভলিবল খেলছি নিয়মিত; ছয়টি জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা হয়ে গেছে। এখনো সেরা ছয়জনের মধ্যে আছি। সাঁতারের পাশাপাশি ভলিবলও আমি প্রতিদিন অনুশীলন করি। ফুটবলে নিজের জেলার হয়ে খেলে এলাম ফরিদপুর থেকে। এ ছাড়া জুনিয়র পর্যায়ে বিভিন্ন আন্তজেলা প্রতিযোগিতায়, মিল্কভিটা প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার দৌড়, গোলক নিক্ষেপ, হাই জাম্পে অংশ নিই। সেসব ইভেন্টে পদকও আছে। পরে সাঁতারে বেশি ব্যস্ত হয়ে যাই। এখনকার অনুশীলন সাঁতার ও ভলিবলের। সঙ্গে আমার জেলা রাজবাড়ীর যখন প্রয়োজন পড়ে, ফুটবল খেলে দিয়ে আসি।
প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ার নিয়ে, জীবন নিয়ে আপনার তৃপ্তি কতটা?
ডলি : আনসার বাহিনীতে বর্তমান আমি ভালো অবস্থানে আছি। আর তা সাঁতারের কারণেই। সব মিলিয়েও তো সাঁতারের কারণে আমি আজকের ডলি। জীবনে যা পেয়েছি, তাতে পুরোপুরি তৃপ্ত। একটু কষ্ট আছে, সাফ গেমসে কখনো সোনার পদক না জেতার কারণে। কিন্তু সে লক্ষ্য এখনো আছে। সঙ্গে চাই অন্তত আরেকটি অলিম্পিকে হলেও অংশ নিতে। দেখা যাক, সামনে কী হয়!

(Visited 272 times, 1 visits today)