ঢাকাTuesday , 2 August 2022

“আমাদের কাজী মোতাহার হোসেন” – লেখক : খালিদ হোসেন

Link Copied!

 

  রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :                               

জ্ঞানতাপস বহুমাত্রিক গুণগ্রাহী ব্যক্তিত্ব- শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ,বিজ্ঞানী, বিখ্যাত দাবাড়ু, ধর্মপ্রাণ, প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী সামাজ জাগরণের মহীরুহ অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন। মহান এ পুরোধা পুরুষ ১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই, কুষ্টিয়ার কুমারখালির লক্ষ্মীপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন ৷ তার পৈত্রিক নিবাস ছিল, তৎকালীন ফরিদপুরের গোয়ালন্দ মহাকুমায় বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার অধীন বাগমারা গ্রামে ৷  তাঁর পিতা কাজী গওহরউদ্দীন আহমদ এবং মাতা তসিরুন্নেসার আট ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। পদ্মাপাড়ের প্রকৃতির সাহচর্যে বেড়ে ওঠা এই দুরন্ত বালক ছাত্রজীবনে অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। গ্রামের নিম্ন প্রাইমারী স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি পর্যন্ত তিনি বরাবর কৃতিত্বের কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তিলাভ করেন।

১৯০৭ সালে নিম্ন প্রাইমারি ও ১৯০৯ সালে উচ্চ প্রাইমারি।  ১৯১৫ সালে কুষ্টিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিকুলেশন) পাস করেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পূর্ববঙ্গ ও আসামের মধ্যে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে,  মাসিক পনেরো টাকা হারে প্রাদেশিক বৃত্তি লাভ করেন। ১৯১৭ সালে আইএসসি (উচ্চ মাধ্যমিক)-রাজশাহী কলেজ থেকে| ১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বিএসসি পরীক্ষায় বাংলা ও আসাম জোনে প্রথমস্থান অর্জন করে মাসিক ৩০ টাকা বৃত্তিলাভ করেন। কাজী মোতাহার হোসেনের পিতা চাকরিজীবী হলেও সংসার ছিলো অসচ্ছল। তাই মোতাহার হোসেনের বৃত্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। গ্রীষ্ম কিংবা পূজার ছুটিতে বাড়িতে না গিয়ে  টিউশনি করেছেন। পড়াশোনার খরচ চালাতে শিক্ষকতাও করেছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বুদ্ধিরমুক্তি আন্দোলনের প্রবক্তা ড.কাজী মোতাহার হোসেন নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত  করেছিলেন। তিনি বিজ্ঞান গবেষণার পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতি-সঙ্গীত-খেলাধুলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। দাবা খেলার প্রতি ছিল তার চিরকালের অনুরাগ। ১৯২৯ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানে দাবার চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। ‘বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন’ এর প্রতিষ্ঠাতা এবং আজীবন সভাপতি ছিলেন তিনি। তার দাবার  প্রতি অনুরাগ এতটাই বেশি ছিলো কাজী মোতাহার হোসেনের বড় মেয়ে ডক্টর সানজিদা খাতুন  উল্লেখ করেছেন , মাসের বাজারের ফর্দটি নিয়ে বাজারে যেতে কোথায় দাবার আসর বসতে দেখলে জগৎ-সংসার ভুলে তিনি দাবায়  মগ্ন হয়ে যেতেন। এখানেই তার আত্মভোলা মনের পরিচয় মেলে। তার আত্মভোলা মনের আরো পরিচয় পাওয়া যায়, নিজের জামাতাকে ঘরে ঢুকতে দেখে ‘কাকে চাই?’ প্রশ্ন করেছেন তিনি। পথিমধ্যে নিজ কন্যাকে চিনতে না পেরে অপরিচিত ভদ্রমহিলা-জ্ঞানে সালাম দিয়েছেন। মাঝে মাঝে তিনি কাউকে দাওয়াত করেও ভুলে যেতেন। তার ভাব-ভাবনা যাতে হারিয়ে না যায় এজন্য তৎক্ষণাৎ হাতের কাছে যা পেতেন; যেমন-পুরাতন খবরের কাগজ ,খাম,কোন কিছুর মলাটের পেছনের অংশে তিনি লিখে রাখতেন। হয়তো নিজের আত্মভোলা মনের খবরটা নিজের  কাছেও ছিল। সেই কারণেই চটজলদি এই ধরনের বাতিল কাগজের টুকরোয় মনের কথা লিখে রাখতেন। তার স্বভাবসুলভ কারণেই হয়তো শিক্ষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাকে ‘আপনভোলা’ বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ সেটা শুধরে নিয়ে বলেছেন, তিনি আত্মভোলা ছিলেন না, ছিলেন আত্মমগ্ন এক মানুষ।

বাঙালি মুসলমান সমাজকে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দিতে; যুক্তি, বুদ্ধি ও জ্ঞানের আলোয় তাঁদের আলোকিত করতে এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে  তিনি নিরলস প্রয়াস চালিয়েছেন। উনিশ শতকের বাঙালি মুসলিম সমাজে  নতুন যুগের হাওয়া বইয়ে দিতে ১৯২৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন। বিশ ও ত্রিশের দশকে  “বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন” নামে পরিচিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন অন্যতম সংগঠক এবং ওই আন্দোলনের মুখপত্র বিখ্যাত “শিখা’ পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক। শিখার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে সম্পাদক ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। ‘শিখা’তে লেখা থাকতো ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ পূর্ববঙ্গের প্রথম মুক্তচিন্তার পত্রিকা  শিখাগোষ্ঠীর শিখারা স্বপ্ন দেখতেন বুদ্ধিবৃত্তি  চর্চার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। প্রগতিশীলতার চর্চা করতে গেলে, প্রচলিত সমাজব্যবস্থার সংস্কার চাইলে রাজনীতি ও ধর্মের প্রতিক্রিয়াশীলদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে হয়। শিখাগোষ্ঠীও এর বাইরে ছিল না। কাজী আবদুল ওদুদ বা আবুল হোসেনদের মতো নিগৃহীত বা অপমানিত না হলেও কাজী মোতাহার হোসেনকেও ধর্মান্ধদের রক্তচক্ষুর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে । তা সত্ত্বেও তিনি বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীলতা বিকাশের অনন্য পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

তার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল অতি স্বচ্ছ ও প্রগতিবাদী। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ধর্মপ্রাণ; কিন্তু তাঁর মধ্যে ধর্মের কোনো অন্ধ অনুকরণ বা গোঁড়ামী ছিল না। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সাম্প্রদায়িকতামুক্ত ও সর্বমানবিক। ধর্মের সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে তিনি বলেন, ধর্মের মূল মাটিতে প্রোথিত হলে আর মস্তক আকাশে বিস্তারিত হলে সব ধর্মের প্রকৃতিই সাদৃশ্যপূর্ণ। সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ মুক্ত দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুদৃঢ় ভিত গড়ে তোলার স্বপ্ন তিনি দেখতেন। ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ প্রবন্ধে তিনি ধর্মশিক্ষার পাশাপাশির বিজ্ঞান, সাহিত্য ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখার জ্ঞানার্জনের কথা তুলে ধরেছেন। সাহিত্যকে হিন্দুকরণ বা ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে তিনি বলেছিলেন, “…জলকে পানি বলে উল্লেখ করলে সাহিত্যের জাত যাবে না-জাত যাবে যদি জলচৌকিকে পানিচৌকি, পানিপথকে জলপথ, জলযোগকে পানিযোগ, জলপানিকে পানিপানি বা পাণিপ্রার্থীকে যদি জলপ্রার্থী করা হয়৷”। কাজী মোতাহার হোসেন বাল্যকাল হতেই অসাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। একবার  তিনি তার শিক্ষক যতীনবাবুর উৎসাহে কুষ্টিয়ায় রথযাত্রা উপলক্ষে রচনা লেখা প্রতিযোগিতায় রচনা লিখে প্রথম হয়েছিলেন।

তিনিই প্রথম বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণার দাবি জানিয়ে ১৯৫৪ সালের ,এপ্রিল মাসে সংবাদপত্রে নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। আবদুল্লাহ আল-মূতী তাঁকে রেনেসাঁ-পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-বিজ্ঞানচর্চার ওপর যখনই আঘাত এসেছে তখনই তিনি তার  প্রতিবাদ করেছেন। শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবীতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন । বক্তৃতা, বিবৃতি ও প্রবন্ধ প্রকাশ করার মাধ্যমে এসব আন্দোলনকে তিনি গতিশীল করেছেন। মাতৃভাষা রক্ষার জন্য বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিল মাতৃভাষার জন্য কী করণীয় তা শ্রেণিকক্ষের ভেতর ও বাহিরে শিক্ষার্থীদের তিনি বোঝাতেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট তৈরিরও অন্যতম কারিগর ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্বপাকিস্তানের ভাষাসমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘যদি গায়ের জোরে উর্দুকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের উপর রাষ্ট্রভাষা রূপে চালাবার চেষ্টা হয়, তবে সে চেষ্টা ব্যর্থ হবে। কারণ ধূমায়িত অসন্তোষ বেশি দিন চাপা থাকতে পারে না। শীঘ্রই তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের সম্বন্ধের অবসান হবার আশংকা আছে।’

বাংলা ভাষা বিজ্ঞান চর্চার উপযোগী নয় তিনি ছিলেন এ ধারণার ঘোরতর বিরোধী। তাঁর পাঠদানের মাধ্যমও ছিল বাংলা । কাজী মোতাহার হোসেন বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ ও পুস্তক রচনা করেছেন। স্কুলজীবনে অবসর সময়ে পিতার বইপুস্তক পাঠ করার মাধ্যমে তার সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনাসমূহ হচ্ছে-সঞ্চয়ন, নজরুল কাব্য পরিচিতি, সে পথ লক্ষ্য করে, সিম্পোজিয়াম, গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস এবং আলোক বিজ্ঞান। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম মৌলিক প্রবন্ধসংকলন ‘সঞ্চরণ’ প্রসঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেনকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাধুবাদ জানিয়ে পত্রে লিখেছিলেন, “… বিচিত্র ভাবকে এবং আলোচনার বিষয়কে স্বচ্ছ প্রাঞ্জল ভাষায় রূপ দিয়ে যে প্রবন্ধগুলি আপনার ‘সঞ্চরণ’ গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন তা পড়ে পরিতৃপ্ত হয়েছি। আপনার বলবার সাহস এবং চিন্তার স্বকীয়তা সাধুবাদের যোগ্য। …” প্রমথ চৌধুরী, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখেরও বিশেষ প্রশংসা লাভ করে ‘সঞ্চরণ’। কাজী মোতাহার হোসেন বাংলা বানান ও লিপি সংস্কার কমিটির সদস্য ছিলেন।

কাজী মোতাহার হোসেনের খুব কাছের বন্ধু ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁদের দুজনের বন্ধুত্ব ছিল প্রগাঢ়। কাজী নজরুল ইসলাম কাজী মোতাহার হোসেনকে ‘মোতিহার’ বলে সম্মোধন করতেন। তাঁদের সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিল যে, কাজী নজরুল ইসলাম কাজী মোতাহার হোসেনের  বাড়িতে আসলে, মোতাহার হোসেন নিজের স্ত্রীর সাথে না ঘুমিয়ে তার সাথে ঘুমাতেন। এজন্য কাজী মোতাহার হোসেনের  স্ত্রী তাকে ভনিতা করে ‘সতীন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কাজী নজরুল মোতাহার হোসেনের বাচ্চাদের কোলে নিয়ে নজরুল সঙ্গীত শুনিয়েছেন অনেকবার। তাদের মধ্যে এতটাই সখ্যতা ছিল , ফজিলাতুন্নেসা কে না পাওয়ার ব্যথায় বেদনা ভেজা বহিঃপ্রকাশের চিঠি কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে লিখেছিলেন। এরূপ শোনা যায় ,মোতাহার হোসেনের মাধ্যমেই ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠেছিল নজরুলের। সেই ফজিলাতুন্নেসার প্রেমে বিভোর ছিলেন নজরুল। কাজী মোতাহার হোসেনকে কবি নজরুলের লেখা চিঠিতে ….  বন্ধু, তুমি আমার চোখের জলের মতিহার, বাদল রাতের বুকের বন্ধু। যেদিন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর আর সবাই আমায় ভুলে যাবে, সেদিন অন্ততঃ তোমার বুক বেঁধে উঠবে। তোমার ঐ ছোট্ট ঘরটিতে শুয়ে, যে ঘরে তুমি আমায় প্রিয়ার মত জড়িয়ে শুয়েছিল, অন্ততঃ এইটুকু স্বান্তনা নিয়ে যেতে পারবো, এই কি কম সৌভাগ্য আমার !!! কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও কাজী মোতাহার হোসেনের দাড়ি-কাটা নিয়ে নজরুল ‘দাড়ি-বিলাপ’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতাও লিখেছিলেন। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথেও মোতাহার হোসেনের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। এমনকি শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পটিও মোতাহার হোসেনের সঙ্গে আলাপচারিতাই সৃষ্টি। রবীন্দ্র-নজরুলের প্রগাঢ় প্রীতি আর বিরল বন্ধুত্ব ছিল কাজী মোতাহার হোসেনের মধ্যে। পাকিস্তানের সামরিক সরকার যখন রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধ ও রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল তখন কাজী মোতাহার হোসেন  সম্মুখ সারিতে থেকে তিনি তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানকে ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের জন্মশত বার্ষিকী পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল, সেখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন।

তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান তিনটি বিভাগেই অধ্যাপনা করেছিলেন। প্রথমে মোতাহার হোসেন নব প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ডেমোনেস্ট্রেটর হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯২৩ সালে তিনি এ বিভাগের সহকারী প্রভাষকের পদ লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি নিজস্ব উদ্যোগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যাতত্ত্ব ও তথ্যগণিত বিষয়ে এম.এ কোর্স চালু করেন। তিনি এ নতুন বিভাগে যোগদান করেন এবং ১৯৫৪ সালে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। এছাড়া তিনি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইমেরিটাস প্রফেসর’ পদে নিযুক্তি লাভ করেন। তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গে প্রথম স্বীকৃত পরিসংখ্যানবিদ। কাজী মোতাহার হোসেনের নিবন্ধগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসীমের সন্ধানে’, ‘কবি ও বৈজ্ঞানিক’, ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’, ‘সঙ্গীতচর্চা ও মুসলমান’, ‘নাস্তিকের ধর্ম’, ‘মানুষ মোহাম্মদ’, ‘ভুলের মূল্য’, ‘লেখক হওয়ার পথে’ । তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনাসমূহ হচ্ছে: সঞ্চয়ন (১৯৩৭), নজরুল কাব্য পরিচিতি (১৯৫৫), সে পথ লক্ষ্য করে (১৯৫৮), সিম্পোজিয়াম (১৯৬৫), গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস (১৯৭০), আলোক বিজ্ঞান (১৯৭৪) এবং প্লেটোর সিম্পোজিয়াম (অনুবাদ-১৯৬৫) অন্যতম। তাঁর রচনাসমূহে সুস্থ মনন ও পরিচ্ছন্ন জীবনবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।

১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর কর্তৃক আয়োজিত কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে কাজী মোতাহার হোসেনকে সভাপতি করা হয়েছিল । বাংলা ভাষা ও সাহিত্য  স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনকে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উপাধিতে ভূষিত করেন । ১৯৬৬ সালে প্রবন্ধসাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ১৯৭৪ সালে বিজ্ঞান ও কলা বিষয়ে অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ডি.এস.সি ডিগ্রি দ্বারা সম্মানিত করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো মোট তিন জনকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। সেই তিনজনের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ ছিলেন কাজী মোতাহার। বিজ্ঞান চর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে “স্বাধীনতা পুরস্কার” লাভ করে । ১৯৮১ সালে শেরে বাংলা জাতীয় পুরস্কার, ভাসানী পুরস্কার, ১৯৮৫ সালে শেরে বাংলা জাতীয় স্মৃতিসংসদ স্বর্ণপদক এবং ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রীড়া স্বর্ণপদক লাভ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যানেক্স ভবনটির নামকরণ করা হয় ‘কাজী মোতাহার হোসেন ভবন’।

বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে কাজী মোতাহার হোসেন নিজের মধ্যে একজন দেশপ্রেমিক বাঙালি, উদারমনা মুসলমান এবং সত্‍ ও আদর্শবান ব্যক্তিত্বকে লালন করেছেন। বার্ধক্যে এসে তাঁর সবচেয়ে বড়ো সঙ্গী ছিল দাবার বোর্ড। কানে কিছুটা কম শুনতে পেতেন বলে মানুষের সাথে খুব একটা কথা বলার, গল্প-আড্ডার সুযোগ হতো না । তাই যেখানেই দাবাড়ু পেতেন দাবার বোর্ড সাজিয়ে বসে পড়তেন। ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর শুক্রবার পবিত্র ঈদ-উল-আযহার সকালে ,৮৪ বছর বয়সে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে এই জ্ঞানতাপস ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন।মহান এই গুণী মানুষের জীবন ও সৃষ্টি আজও আমাদের মাঝে অনুকরণ এর প্রতীক হয়ে আছে ।

খালিদ হোসেন

শিক্ষার্থী, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ড. কাজী মোতাহার হোসেন কলেজ

(Visited 90 times, 1 visits today)