ঢাকাSaturday , 30 July 2022

রাজবাড়ীতে শতাধিক কৃষকের হাতে ঋণ না নিয়েও খেলাপির লাল নোটিশ, ব্যাংক কর্মকর্তা বরখাস্ত

Link Copied!

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

ব্যাংকে যাননি কোনোদিন। কোনো ঋণও নেননি। তারপরও ব্যাংক থেকে পেয়েছেন ঋণখেলাপির নোটিশ। এমনই ঘটনা ঘটেছে রাজবাড়ী কৃষি ব্যাংক শাখায়। ঋণখেলাপির লাল নোটিশ পেয়েছেন জেলার শতাধিক কৃষক। এমন কান্ডে হতভম্ব তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৫ সালে রাজবাড়ী কৃষি ব্যাংক শাখা থেকে সদর উপজেলার কৃষকদের দেওয়া ঋণ বিতরণে দালাল চক্র ও ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নয়ছয় করা হয়। প্রকৃত অর্থে উপযুক্ত কৃষকরা ঋণ পাননি। আবার জায়গা-জমি নেই এমন অনেকে ঋণ পেয়েছেন।


জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করা টাকা ব্যাংক কর্মকর্তা ও দালালচক্র ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন। এ ঘটনার দীর্ঘ সাত বছর পর গ্রহীতাদের ঋণখেলাপির নোটিশ দেওয়া হয়েছে ব্যাংক থেকে।
দেখা গেছে, নথিতে নাম-ঠিকানা একজনের অথচ ছবি অন্যজনের। জমির খতিয়ান ও নাম-ঠিকানা ব্যবহারের পাশাপাশি জাল করা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের প্যাড ও ওয়ারিশ সনদপত্র। এমন জালিয়াতির শিকার হয়েছেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের গোবিন্দপুরের মণ্ডল পরিবারের তিন ভাই আজিম উদ্দিন মণ্ডল, ছলিম মণ্ডল ও ইউসুফ মণ্ডলসহ ওই এলাকার অনেকে। তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেননি অথচ পেয়েছেন ঋণখেলাপির নোটিশ। ঋণখেলাপি কারও ১ লাখ ১০ হাজার কারও ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
কৃষি ব্যাংক রাজবাড়ী শাখার রেজাউল হক নামের এক মাঠকর্মীর বিরুদ্ধে এ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি কৃষি ব্যাংক শরীয়তপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ে কর্মরত বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা রেজাউল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন, শরিয়তপুরের এজিএম খোন্দকার রফিকুল ইসলাম।


তিনি জানান, রাজবাড়ী শাখায় ঋণ প্রদানে অনিয়মের অভিযোগে রেজাউল হকের বিরুদ্ধে (২৭ জুলাই ) একটি নোটিশ পান। তখন থেকেই রেজাউল হকের সকল কার্যক্রম স্থগিত (সাময়িক বরখাস্ত) করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী আজিম উদ্দিন মন্ডল, ছলিম মন্ডল ও ইউসুফ মন্ডলকে বলেন, ‘আমাদের মতো এলাকার অনেকে ঋণখেলাপির নোটিশ পেয়েছেন। ইউনিয়ন তহসিল অফিস থেকে আমাদের জমির খতিয়ান নিয়ে নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে অন্যদের ছবি দিয়ে রাজবাড়ী কৃষি ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা রেজাউল ও কিছু স্থানীয় দালাল।’
তারা আরও বলেন, ‘কৃষিকাজ করেই আমাদের সংসার চলে। ঋণ তো দূরের কথা, কোনোদিন ব্যাংকে যাইনি। অথচ নোটিশ এসেছে। পড়ে ব্যাংকে যোগাযোগ করলে বর্তমান দায়িত্বরত কর্মকর্তা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কয়েক মাস হয়ে গেলেও কোনো সমাধান হয়নি।’ এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তারা।
খানগঞ্জ বেলগাছির আশরাফুল আলম আক্কাস ও হরিহরপুরের জিয়া মন্ডল বলেন, ‘অনেক কৃষক জমির মূল কাগজপত্র দিয়েও ঋণ পাননি। কিন্তু যাদের জমি নেই, তাদের থেকে ঘুস নিয়ে নতুন কাগজপত্র তৈরি করে অনেককে ঋণ দেওয়া হয়েছে। যার নামে ঋণ হয়েছে, সে জানেই না তার নামে ঋণ আছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছেন।’
শাহিন নামের একজনকে বলেন, ‘আমি কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চেয়েছিলাম। সে সময় রেজাউল স্যার নিজেই কাগজপত্র বানিয়ে বারেক নামের এক ব্যক্তির নামে ঋণ করিয়ে তাকে টাকা দেন। ঋণের ৬০ হাজার টাকার অর্ধেক ৩০ হাজার টাকা তাকে দেওয়া হয়েছিল। এর বেশি কিছু আমার জানা নেই। পরে ওই টাকার মাত্র এক কিস্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাংক আমার কাছে কখনো টাকা চায়নি এবং আমি নোটিশও পাইনি। শুনেছি নোটিশ পেয়েছে বারেক নামের ওই ব্যক্তিসহ গোবিন্তপুরের অনেকে। জালিয়াতির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’
কথা হয় খানগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আতাহার হোসেন তকদিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালীন গোবিন্দপুর, হরিহরপুর এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষক ঋণখেলাপির নোটিশ পেয়েছেন। যারা ঋণ না নিয়েই খেলাপি হয়েছেন।


সাবেক এ ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রকৃত কৃষকরা ঋণ পায় না, পায় ভূমিহীনরা। সে বিষয় জানতে গিয়ে দেখি আমার পরিষদের প্যাড, ওয়ারিশ সনদসহ অনেক কিছু জাল করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
এই জালিয়াতি চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’
অভিযুক্ত তৎকালীন রাজবাড়ী শাখা কৃষি ব্যাংকের মাঠকর্মী রেজাউল বর্তমানে বদলিজনিত কারণে শরীয়তপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ে কর্মরত।
এ বিষয়ে জানতে ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ‘কিছু সময় পরে কথা বলছি’ বলে ফোন কেটে দেন। এরপর বারবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
রাজবাড়ী কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার মো. মোতাহার হুসাইন বলেন, ‘রেজাউলের বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নাই। কারণ তখন আমি এই শাখায় ছিলাম না। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যোগদান করেছি।’
তিনি বলেন, বর্তমানে রেজাউল শরীয়তপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ে কর্মরত। এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তদন্ত করেছে। তবে ভুয়া ঋণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তার কাছে নেই।

(Visited 371 times, 1 visits today)