ঢাকাTuesday , 19 July 2022

“ নারী আন্দোলন এবং হেনা দাস ”- লেখক : হুসনে নাহিদ প্রিয়া

Link Copied!

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

নারী আন্দোলন এবং নারী নেতৃত্বের জগতে “হেনা দাস” একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯২৪ সালে দেশ বিভাগ এবং বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য সারা দেশ উত্তাল তখন সিলেটে হেনা দাস” এর জন্ম। হেনা দাসের বাবা ছিলেন সিলেট জেলার জর্জ কোর্টের সরকারী উকিল। উনি উকালতির পাশাপাশি লেখালেখিও করতেন। বৃটিশ সরকারের কাছ থেকে হেণা দাসের বাবা “ রায় বাহাদুর” উপাধি পান। উনার মা ছিলেন একজন খাঁটি গৃহিনী। পড়াশুনা খুব সামান্য জানতেন উনার মা। হেনা দাসের পরিবারের সবাই রাজনীতি করতেন। উনার সব দাদারা এবং পরিবারের অন্যান্য বড়রা সবাই সমাজতান্ত্রিক আর্দশে দীক্ষিত হয়ে কমিউনিষ্ট আন্দোলন এবং বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে গেলেন।

হেনা দাসের পরিবারে যেহেতু সবাই কমিউনিষ্ট রাজনীতির সাথে জড়িত সেহেতু খুব ছোট বেলা থেকেই উনি রাজনৈতিক আবহে বড় হতে লাগলেন। অনেক ছোট অর্থাৎ শৈশব থেকেই উনি অনুভব করলেন সমাজ এবং পরিবার পিতৃতান্ত্রিক আবহ বিরাজ করেন। বিশেষ করে উনার বড় দিদিকে যখন সপ্তম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় বাড়ীর ছেলেরা জোড় করে বিয়ে দিয়ে দেন। তখন তিনি বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারলেন এই সমাজ এবং পরিবার পুরুষতান্ত্রিক। তিনি শৈশব থেকে বুঝতে পারলেন এই পিতৃতান্ত্রিক বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে মেয়েদের মুক্তি নাই। উনি সিলেট সরকারী গার্লস স্কুলে পড়তেন। সপ্তম শ্রেনীতে পড়ার সময়ই তিনি ক্লাসের কিছু মেয়েদের নিয়ে গোপনে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। পড়াশুনার পাশাপাশি মেয়েদের নিয়ে উনি অনেক বই পড়া শুরু করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার জীবনী, বিপ্লবী বই, সমসময়িক পত্রিকা নিজে পড়েন এবং অনান্য মেয়েদের পড়তে উদ্ধুদ্ধ করতেন। তিনি স্কুলে গালর্স গাইড করতেন। ১৯৪০ সালে তিনি মেট্রিকুলেসন পাশ করেন এবং কলেজে ভর্তি হন। কলেজে ভর্তির পরেই তিনি সরাসরি কমিউনিষ্ট পার্টি করতেন। তিনি মেয়েদের নিয়ে নিজেই একটা সংগঠন গড়ে তুলেন।

তিনি গ্রামে যেয়ে কৃষকের সাথে কাজ করেছেন। তাদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছেন। গ্রামের মেয়েদের সংঘবদ্ধ করে তাদের নারী মুক্তি এবং নারী অধিকার সম্পর্কে বুঝাতেন। তিনি মূলত বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়েই তিনি নারী আন্দোলনও গড়ে তোলেন একই সাথে। ১৯৪২ সালে তিনি ইন্টার পাশ করেন। উনার বাবা উনাকে ডিগ্রীতে ভর্তি করে দেন। উনি ডিগ্রীতে পড়াশুনা না করে ৩০ বছর বন্ধ রাখেন এবং তখন তিনি অনুভব করেন শুধু শহরের মেয়েদের নিয়ে নারী আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব না । মেয়েদের একটা বিরাট অংশ গ্রামে পড়ে আছে। তিনি গ্রামে যেয়ে কাজ শুরু করেন। তাছাড়া হেনা দাস নিজেকে মনে প্রাণে একজন কমিউনিষ্ট মনে করতেন।তিনি শুধু শহরের ভিতর তার কাজকে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামের কৃষক,শ্রমিক এবং নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। গ্রামের মেয়েদের স্বনির্ভর করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তখন যাতায়াত ব্যবস্থা এত ভালো ছিলোনা। মাইল পর মাইল হেঁটে উনারা কলেজ পড়–য়া কয়েকটা মেয়ে গ্রামের অবরুদ্ধ বন্দীখানা থেকে মেয়েদের মুক্তির পথ দেখান। হেনা দাস গ্রামের প্রতিটা ঘরে ঘরে যেয়ে তখনকার জমিদার প্রথা এবং বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য কৃষক, শ্রমিক এবং মেয়েদের বোঝানো শুরু করেন।

তাদের নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলেন। যেহেতু হেনা দাস তার কলেজের কয়েকজন মেয়ে সহপাঠিদের নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামের কাজ করছিলেন। বয়োজৈষ্ঠ্য কোন নারী নেত্রী না থাকায় কাজ করতে যেন বাধার সম্মুখিন হতে হচ্ছিলো ঠিক সেই মুহুতে একমাত্র মুসলিম নারীনেত্রী জোবেদা খাতুন চৌধুরী এগিয়ে আসেন। জোবেদা খাতুন চৌধুরি কংগ্রেস সভানেত্রী ছিলেন। হেনা দাস জোবেদা খাতুন চৌধুরীকে তাদের দলের সভানেত্রী করে কাজ শুরু করলেন। হেনা দাস তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রায় সময়ই কাটিয়েছেন সমাজে বিভিন্ন পেশার শ্রমিক,মজুর,কৃষক এবং মেয়েদের শোষন,নিপিড়নের হাত থেকে মুক্তির জন্য। ১৯৬১ সালে নারায়নগঞ্জে একটা মাধ্যমিক স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্বে ছিলেন।তিনি কমরেড উপাধি পান। তিনি সা¤্রাজ্যবাদকে উৎখাত করার জন্যই তিনি কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন। পরিশেষে বলবো হেনা দাসকে এত অল্প কথায় বা লেখায় উনার জীবনি বলে শেষ করা যাবেনা। তাঁর জীবনের পুরোটাই তিনি ব্যয় করেছেন ফ্যাসিবাদি সমাজের বিরুদ্ধে লড়ায়ে। ২০০৯ সালের ২০ জুলাই হেনা দাসের মৃত্যু হয় এবং তার দীর্ঘ রাজনীতি জীবনের অবসান ঘটে।

লেখক- হুসনে নাহিদ প্রিয়া, সমাজকল্যান সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রাজবাড়ী জেলা শাখা।

(Visited 28 times, 1 visits today)