ঢাকাSunday , 10 July 2022

ছেলেবেলার ঈদ: শিপন আলম

Link Copied!

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

আমার ছেলেবেলা ঠিক কখন থেকে শুরু হয়েছিল তা আজ আর মনে পড়ে না। কেননা আমার সঠিক জন্ম সনটি অজানা। প্রাইমারি শেষ করে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সময় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত সনদের মাধ্যমে জানতে পারলাম আমার জন্ম সন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে। আবার কিছুদিন আগে পাড়ার এক চাচি গল্পে গল্পে তার ছোট ছেলের জন্মের সাথে আমার জন্ম এবং পাড়ার আরো অনেকের জন্মের পরম্পরা খুঁজতে গিয়ে বললেন, ‘তোমাদের যে বছর জন্ম অয় ঐ বছর খুব বন্যা অয়, চারদিক খালি পানি আর পানি।’ বুঝতে পারলাম ১৯৮৮ সালের বন্যার কথা বলছেন হয়তো। আবার আমার এক চাচাতো ভাই মোস্তফা আমার চেয়ে ২০ দিনের ছোট। তাঁর বাবা-মা মোটামুটি শিক্ষিত। তাদের বক্তব্যও চাচির ওই ঘটনাকে সমর্থন করে। যদি তাই হয় তাহলে এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, আমার লেখাপড়াটা দুই বছর পরে শুরু হয়েছিল।

আমার ছেলেবেলাটা কবে কিভাবে শুরু হয়েছে এটি বলতে না পারলেও কবে শেষ হয়েছে এটি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। ২০০৬ সালে এসএসসি পাশের পর গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে পাড়ি জমানোর মাধ্যমেই আমার ছেলেবেলার ইতি ঘটে। অথচ গ্রামীণ এক সহজ সরল দুরন্ত ছেলে হিসেবে এই সময়টাতেই কেটেছে নানা রঙে রঙিন ছেলেবেলার চমৎকার সব দিনগুলো।

গ্রামীণ ছেলেবেলা কাটানোর যত রকম উপকরণ থাকার কথা তার সবকিছুই পেয়েছি আমি। মোবাইলবিহীন সে সময়ের কথা বললে এখনকার ছেলেমেয়েরা নিশ্চিতভাবেই জেলাস (Jealous) ফীল (Feel) করবে। ছেলেবেলায় কাটানো দিনগুলোর মধ্যে ঈদের দিনগুলো বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ছেলেবেলায় সারা বছর অপেক্ষা করতাম কখন ঈদ আসবে। মাঝে মাঝে মা-বাবা, বড় ভাই-বোনকে জিজ্ঞেস করতাম ঈদ আসতে আর কতদিন বাকী আছে। রোযার ঈদ শেষ হওয়ার পরে কুরবানির ঈদ খুব দ্রুতই আসতো। কিন্তু কুরবানির ঈদ শেষ হওয়ার পরে আবার ঈদ আসতে অনেক দেরি হলে মাঝে মাঝে তাই খেলার সঙ্গী সাথীরা বলাবলি করতাম আরেকটা ঈদ থাকলে ভালো হতো। কিন্তু ঈদ তো আর আমাদের বলাবলিতে আসে না। ঈদ আসে নির্দিষ্ট সময় পরে। আবার ঈদ এসে চলে গেলেও মনটা খারাপ হয়ে যেতো। তখন বলতাম ঈদের পরের চেয়ে ঈদের আগেই ভালো মজা হয়েছিল, ঈদ কেন আরো কিছু দিন পরে হলো না ইত্যাদি আরো অনেক বালকসুলভ কথা।

সংসারের অভাব অনটনে ছেলেবেলায় কোন ঈদে নতুন পোশাক কিনেছি বলে মনে পড়ে না। তারপরেও ঈদটা খুব টানতো। এটি শুধু আমার বেলায় নয়। তখনকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা খুবই দূর্বল ছিল এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। পদ্মানদী তীরবর্তী অঞ্চল হওয়ায় কৃষিই ছিল মানুষের আয়ের প্রধান উৎস। সেই দিক থেকে পাড়া প্রতিবেশীদের অনেকের তুলনায় আমাদের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভালোই ছিল বলা যায় কিন্তু যেটির অভাব ছিল সেটি হচ্ছে সচেতনতা আর সামাজিকতা। কেননা কৃষি আর শারীরিক পরিশ্রম থেকে যতটুকু সঞ্চয় ছিল তার পুরোটাই প্রায় আমাদের অভিভাবকেরা সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যের দিকে ব্যয় না করে বাপ-দাদাদের মতো জমি কেনায় আর লোক দেখানোতে ব্যয় করে ফেলতো। আর এ কারণেই আমাদের ছেলেবেলার ঈদের দিনগুলো ছিল অনাড়ম্বর আর অনেকটা গরীবানা গোছের।

বাড়িতে সেমাই রান্না হতো শুধু ঈদের দিন। তার মানে আমরা বছরে শুধু দুইটা দিন সেমাই খেতাম- ঈদুল ফিতরের দিন আর ঈদুল আযহার দিন। ফলে আমরা মনে করতাম সেমাই শুধু ঈদের খাবার। ঈদের দিনই এটা রান্না করা হয়। গায়ে মাখা সাবানও বলতে গেলে দুই ঈদেই ব্যবহার করতাম। অবশ্য বুদ্ধি একটু ভারী হওয়ার পরে আর লেখাপড়ায় শ্রেণি টপকানোর সাথে সাথে আত্মসচেতনতায় এ অবস্থার উন্নতি ঘটেছে কিছুটা। চুলে শ্যাম্পু ব্যবহার শিখেছি অনেক পরে। সাবানই মাখতাম চুলে। আরেকটা জিনিস খুব কাজে দিতো চুলে- সেটি হচ্ছে এঁটেল মাটির কাদা। চুল ঝরঝরে হয়ে যেতো। কাদা দিয়ে চুলের ময়লা পরিষ্কারের এ অভিনব পদ্ধতি গ্রামের মানুষ কেমন করে আবিষ্কার করেছিল তা আজও অজানা। অবশ্য এ পদ্ধতির একটা বড় সমস্যা ছিল কাদা মাথার চামড়ার (স্ক্যাল্প) সাথে লেগে গেলে উঠতে চাইতো না। তাই সাবধানে শুধু চুলের উপর দিয়ে ব্যবহার করতাম আমরা।

ছেলেবেলায় বলতে গেলে সারা বছর নদীতে গোসল করতাম কারণ আমাদের বাড়ি ছিল পদ্মা নদীর পাড়েই। একবার মনে আছে আমি তখন অষ্টম কিংবা নবম শ্রেণিতে পড়ি। বর্ষাকালে নদীতে একা একা গোসল করছিলাম। এক পাল তোলা (আমরা বলতাম বাদামছালা) নৌকার মাঝি জোরে ডাক দিয়ে বললেন- ‘বর্ষাকালে নদীতে গোসল দিও না বাপু। কারণ এ সময় পানিতে ময়লা আর জীবাণু থাকে। মরা গরু ছাগল ভেসে যায়।’ মাঝির এ বারণে তারপর কিছুদিন মনে হয় যেতাম না। তবে ঈদের দিনে হয় নদীতে নইলে পাড়ার পুকুরে গোসল দিতাম আমরা। পাড়ায় বেশ কয়েকটা পুকুর ছিল যেগুলোতে সারা বছর গোসল করা হতো। ঈদের দিন আমরা দলবেঁধে এসব পুকুরে বা নদীতে গোসল দিতে যেতাম। তবে কোনো কোনো ঈদে বড় ভাই আমাকে সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল করিয়ে দিতো। গোসল করে সেমাই খেয়ে ঈদগাহে যেতাম।

ছোটবেলায় ঈদের নামাজ খুব কম পড়েছি। অষ্টম-নবম শ্রেণি থেকে হয়তো নিয়মিত ঈদের নামাজ শুরু করি। তার আগ পর্যন্ত ঈদগাহের দোকানগুলোতে ঘুরঘুর করে আর পাড়ার বন্ধুদের সাথে গুটি (মার্বেল) খেলে সময় কাটিয়ে দিতাম।

ছেলেবেলায় আমি যে সকল খেলা খেলতাম সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পারদর্শী ছিলাম এই গুটি খেলায়। আমি ছোট হয়েও বাবার বয়সী, চাচার বয়সীদের সাথে খেলতাম কারণ সমবয়সী যারা ছিল তারা অনেকেই হারার ভয়ে আমার সাথে খেলতো না। বড়দের যাদের সাথে খেলতাম তাদেরও হারিয়ে দিতাম। বিশেষ করে ছড়ানো বাদবাদ (শুদ্ধ নাম আছে কিনা জানা নেই), টক্কা খেলা, ঘর টেনে খেলা এগুলোতে আমি ছিলাম অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই সবাই যখন হেরে যেতো আমার নিকট থেকে ওরা গুটি ধার নিতো। এক টাকায় বিশটা বা পনেরটা এরকম। আর টাকা পরিশোধের দিন দিতো ঈদের দিন। আমি হিসেব করে রাখতাম কার কাছে কত টাকা পাবো। ওদেরকে মাঝে মাঝে মনেও করিয়ে দিতাম- ‘ঈদের দিন কিন্তু টাকা দিতে হবে।’ ঈদের দিন যথারীতি আগে আগে গিয়ে পথে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর এক এক করে আমার দেনাদার আসলে তাদের নিকট থেকে গুটি বাবদ পাওনা আদায় করতাম। ওরাও দুষ্টু ছিল আমাকে দেখে অন্য পথে যেতো। দেনা পরিশোধের ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতো। তবে আমি গুটিরই আরেকটি খেলা লক্কি (শুদ্ধ নাম বোধ হয় লক্ষ্মী খেলা হবে) খেলায় খুব দূর্বল ছিলাম। আমিও ভয়ে এই খেলাটি খেলতাম না কারো সাথে। বিশেষ করে আমার বাল্যবন্ধু শাহীনূরও এই খেলায় পারদর্শী ছিল। ও প্রস্তাব দিলে আমি সাথে সাথে না করে দিতাম।

ঈদের আগে- পরে এমনকি ঈদের দিন পর্যন্ত এভাবে সারাদিন (মাঝে মাঝে দুপুরের খাওয়া বাদ দিয়েও) গুটি খেলে কাটিয়ে দিতাম। বাবা-মা থেকেও চাপ ছিল না তেমন। অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছিলাম ছেলেবেলায়। ঈদের দিন বন্ধু বান্ধবদের বাড়িতেও যেতাম না তেমন। ক্লাস সেভেন থেকে ফার্স্ট বয় হওয়ার সুবাদে দু একজন বন্ধু আসতো বাড়িতে আবার ওরা ইনভাইট করলে ওদের সাথে যেতাম। বান্ধবীদের বাড়ি যাওয়া শুরু হয় আরও পরে। হয়তো ক্লাস নাইন-টেনে উঠে।

ঈদের দিন কাটানোর আরেকটি উপলক্ষ্য ছিল বিটিভিতে বাংলা ছায়াছবি দেখা। বিকেল সাড়ে তিনটের দিকে সিনেমা শুরু হতো। বিজ্ঞাপনের চাপে শেষ হতে হতে রাত আটটা- নয়টা বেজে যেতো কখনো কখনো। আমাদের পাড়ায় বিদ্যুৎ ছিল না। তাই টেলিভিশনও ছিল না। শুধু আমার এক কাকার বাড়িতে ব্যাটারিতে টিভি চালানো হতো। সেখানেও নানা কারণে মাঝে মাঝে বন্ধ থাকতো। তখন অনেকটা টিকিট কেটে অন্যেদের বাড়িতে টিভি দেখতে হতো। ভাল ছেলে ও লেখাপড়ায় ভাল হওয়ার সুবাদে অনেকেই আমাকে ফ্রি ফ্রি দেখতে দিতো কখনো কখনো। ছেলেবেলার এই টিভি দেখা নিয়ে হাজারো স্মৃতি এখনো মনের কোণায় প্রতিনিয়ত উঁকি দেয়।

ঈদুল আযহায় পশু কুরবানি দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের ছিল না। সমাজ থেকে যতটুকু অংশ পেতাম ততটুকু দিয়েই আমরা ঈদের আনন্দে শরিক হতাম। তবে আমার বাবা আমি যখন বেশ ছোট তার আগে থেকে গরু পালন করতেন। বড় বড় গরু ছিলো কয়েকটা। আমি দেখেছি। একটা গোয়ালঘরও ছিল। একবার একটি বাছুর খানিকটা শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাবা- মা সিদ্ধান্ত নেন সেটি বড় হলে কুরবানি দিবেন। হয়েও ছিল তাই। সেটি বড় হলে কুরবানি দেওয়া হয়। আমি তখন বোধ হয় প্রাইমারিতে পড়ি।

জৌলুসবিহীন ঈদের সেই দিনগুলো এখনো আমাকে আন্দোলিত করে। দারিদ্র‍্য আর শত সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে প্রাচুর্য আর প্রাপ্তির খানিকটা ছোঁয়া পেলেও যে সময়টি হারিয়েছি তা চিরদিন অধরাই রয়ে যাবে। এখন তাই পরিবারের ছোটদের মাঝেই খুঁজে ফিরি হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলো, শত বর্ণে বর্ণিল গুটি খেলা আর বাংলা ছবি দেখার ছেলেবেলার ঈদের দিনগুলো।   
লেখক- শিপন আলম, প্রভাষক , হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি সা’দত কলেজ, টাঙ্গাইল।

(Visited 64 times, 1 visits today)