ঢাকাWednesday , 25 May 2022

“কাজী নজরুল ইসলাম ও কাজী মোতাহার হোসেনঃ বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতা”-লেখক: শিপন আলম

Link Copied!

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩তম জন্মদিন। ১৮৯৯ সালের এই দিনে তিনি অসাম্য আর মানবতাবর্জিত পৃথিবীকে সাম্য আর মানবতার গান শোনানোর জন্য ধরাধামে আবির্ভূত হন। জীবনভর তিনি তার সকল লেখার মাধ্যমে একদিকে যেমন শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন অন্যদিকে তেমন সমাজের অসহায়, দরিদ্র আর ক্ষুধাতুর মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শাসক শ্রেণির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাদের মুক্তির গান শুনিয়েছেন, প্রেমের বীণা বাজিয়েছেন।

ঊনিশ শতকের একেবারে শেষপ্রান্তে জন্ম নেওয়া এই সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে আপোষহীন এই বিদ্রোহী কবির সাথে প্রায় কাছাকাছি সময়ে জন্ম নেওয়া বিশ্বখ্যাত দাবাড়ু, বিজ্ঞানী, আত্মভোলা জ্ঞানসাধক ড. কাজী মোতাহার হোসেনের ছিল গভীর অন্তরঙ্গতা। তিনি ছিলেন নজরুল ইসলামের চেয়ে বয়সে দুই বছরের বড়। নজরুল জীবনের অনেক অন্তরঙ্গ স্মৃতির সাথে তিনি গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। নজরুল ইসলামের সাথে তাঁর প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯২০ কিংবা ১৯২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতায়। দু’জনের এই পরিচয় বন্ধুত্বে রূপ নেয় ১৯২৫ সালে আয়োজিত নিখিল ভারত দাবা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আর বন্ধুত্বের এই গাঢ়ত্ব পরিপক্কতা লাভ করে ১৯২৭ সালের গোড়ার দিকে ঢাকায় আয়োজিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক অধিবেশনে উভয়ের যোগদানের মাধ্যমে। পরের বছর একই উদ্দেশ্যে নজরুল ইসলাম ঢাকায় আগমন করলে কাজী মোতাহার হোসেন তার আতিথ্য গ্রহণ করেন। সে বছর কবি একনাগাড়ে প্রায় আড়াই মাস ছিলেন মোতাহার হোসেনের বাসায়। উল্লেখ্য মোতাহার হোসেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুবাদে সপরিবারে বর্ধমান হাউজের (বর্তমানে বাংলা একাডেমী ভবন) নিচ তলায় বসবাস করতেন।

দীর্ঘদিন একই সাথে অবস্থানের কারণে উভয়ে উভয়ের চরিত্র মাধুর্য সম্পর্কে অবগত হন একান্ত কাছ থেকে, রপ্ত করেন উভয়ের চারিত্রিক গুণাবলি। একজন লাভ করেন সাহিত্যরস অপরজন বিজ্ঞান সাধনা। নজরুলের সাহিত্যগুণ তাকে কিভাবে আন্দোলিত করেছিল সে বিষয়ে ড. কাজী মোতাহার হোসেন তার ‘আমার সাহিত্যিক জীবনের অভিজ্ঞতা; ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’, মুক্তধারা, ঢাকা, জুন ১৯৭৬- এর ১৭ নং পৃষ্ঠায় চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন-

‘এই সুযোগে নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমার কিছুটা অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। এর ফলে কাব্য, সঙ্গীত প্রভৃতির উৎসমুখেরও কিছুটা অনুভূতি জন্মে। তাতে হয়তো সাহিত্য ক্ষেত্রে আমার লেখায় কিছু সজীবতা এসে থাকবে। আমার জীবনে আন্তরিকতার অভাব বোধ হয় কোন দিনই ছিল না, নজরুলেরও তাই। এ কারনে নজরুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দিনগুলো আমার সাহিত্যিক জীবনের অমূল্য সঞ্চয়। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা (বৈজ্ঞানিক হিসেবে) আগে থেকেই ছিল, কিন্তু নজরুলের সংস্পর্শে এসে হয়ত মানুষকে আরও নিকট করে, আপন বলে ভাবতে শিখেছি। এই দুর্লভ মানবীয় অনুভূতি যদি সত্যিই কিছুটা এসে থাকে তবে তার ষোল আনা না হলেও অন্তত বারো আনাই যে নজরুলের প্রভাবে হয়েছে, একথা অকুণ্ঠভাবে স্বীকার করবো।’

পরস্পরের এই অন্তরঙ্গতা এতোটাই গভীরতা লাভ করেছিল যে নজরুল ঢাকায় আসলেই কাজী সাহেবের বাসায় উঠতেন, একই বিছানায় ঘুমাতেন। এই কারণে রসিক নজরুল রসিকতা করে বলতেন, বেগম মোতাহার নিশ্চয়ই তাকে ‘সতীন’ বলে মনে করেন। কাজী সাহেব খুবই সুদর্শন পুরুষ ছিলেন। কথিত আছে, নজরুল নাকি দুষ্টামি করে প্রায়ই বলতেন, ‘মোতাহার তুমি যদি ছেলে না হয়ে মেয়ে হতে তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করতাম।’ গভীর সখ্যতা আর অন্তরঙ্গতার কারণে নজরুল কাজী সাহেবকে মোতাহার না বলে ‘মতিহার’ নামে সম্বোধন করতেন। ষাটের দশকের শেষ দিকে ঢাকায় আয়োজিত রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে মোতাহার হোসেন এ সত্যটি স্বীকার করে বলেন, ‘কাজী নজরুল আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাকে আদর করে বলতেন মতিহার।’

কাজী সাহেবের দাড়ি-কাঁটা নিয়ে ‘দাড়ি-বিলাপ’ নামে একটি দীর্ঘ কবিতাও নজরুল রচনা করেছিলেন। কবি যখন ‘পিকস ডিজিজ’ নামে মস্তিষ্কের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে স্মৃতিভ্রষ্ট তখন তিনি একদিন কবি আব্দুল কাদিরের উপস্থিতিতে ‘মোতাহার’, ‘মোতাহার’ বলে কয়েকবার ডেকেছিলেন।

নজরুল জীবনের সাথে যে নারী চরিত্রগুলোর পরিচয় পাওয়া যায় তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত পড়ুয়া ফজিলাতুননেসা অন্যতম। সে সময়ে তরুণ কবি নজরুল মহিয়সী এ নারীর রূপে ও গুণে মুগ্ধ হয়ে তাঁর সাথে প্রেম সম্পর্ক স্থাপনে প্রয়াসী হন। কিন্তু ছোটবেলা থেকে দারিদ্র্েযর সসঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া গুণবতী ফজিলাতুননেসার পক্ষে ভবঘুরে কবি নজরুলের সে প্রেম নিবেদন গ্রহণ করা সম্ভব হয় নি। নজরুল জীবনের এই অজানা দিকটির একমাত্র সাক্ষী মোতাহার হোসেন। উভয়ের পরিচয়ের সেতুবন্ধনও তিনিই রচনা করেছিলেন। কাজী সাহেব ফজিলাতুননেসাকে তাঁর ছোট বোনের মত দেখতেন। তাঁকে রোগে-শোকে সেবা শুশ্রূষা করতেন। কবি, গবেষক ও অনুবাদক আব্দুস সাত্তার একবার কাজী সাহেবকে নজরুল-ফজিলাতুননেসা সম্পর্কে মানুষের মাঝে যে কানাঘুষা প্রচলিত ছিল সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘দু’জনেরই তারুণ্য ছিল। তবে ফজিলাতুননেসা তখনকার দিনের অঙ্কশাস্ত্রের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া মেয়ে। সে ছিল অতিমাত্রায় আত্মসচেতন এবং আশাবাদী। কেউ যদি আবেগের অতিরেক দেখায় তবে তা আবেগই। বাস্তবের কিছু নয়। ফজিলাতুননেসাকে আমি ভালো জানতাম।’

চারিত্র্িযক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে নজরুল ছিলেন অনেকটা ভবঘুরে। তিনি ছিলেন অস্থির, দুরন্ত আর চঞ্চল। অনেকটা বাউণ্ডুলে গোছের। অন্যদিকে মোতাহার হোসেন ছিলেন ঠিক তার বিপরীত। তিনি ছিলেন সংসারী, শান্ত ও স্থির এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা অধ্যাপক। নজরুলের জীবনে একাধিক নারীর আগমন ঘটলেও মোতাহার হোসেনের জীবনে এক স্ত্রী ব্যতিত অন্য কোন নারী চরিত্রের আগমন ঘটেছে বলে জানা যায় নি। নজরুল যেখানে নিবিষ্ট থাকতেন মানব মনের বিচিত্র রহস্য উদঘাটনে, প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকনে, সমাজ ও দেশে বিদ্যমান অন্যায় অবিচারের স্বরূপ উদঘাটনে; মোতাহার হোসেন সেখানে নিবিষ্ট থাকতেন বিজ্ঞানের অসীম রহস্য উদঘাটনের মাধ্যমে নতুন নতুন জ্ঞান অন্বেষণে, দাবার কূটচালে মত্ত থাকতেন দিনের পর দিন। উভয়ের এই পরস্পরবিরোধী স্বভাব সত্ত্বেও কি কারণে তারা একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তা এক রহস্যই বটে। বাংলাদেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক আব্দুল্লাহ আল-মুতি তাঁর ‘আমার প্রিয় শিক্ষক’ রচনায় এ রহস্যেরই তালাশ করেছেন। তাঁদের বন্ধুত্বের কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তাঁদের বন্ধুত্বের বড় কারণ তাঁরা দু’জনেই সেদিনের সেই প্রাচীন গোঁড়া সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। একজন কবি আর গায়ক, অন্যজন বিজ্ঞানী আর প্রবন্ধকার। দু’জনেই এক ভেদাভেদহীন, উদার, সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন।’ দু’জনের এই ঘনিষ্ঠতার আরেকটি কারণ হতে পারে তাঁরা উভয়ই নৃতাত্ত্বিকভাবে একই গোষ্ঠী হতে উদ্ভূত ছিলেন। দু’জনেরই পারিবারিক ও সামাজিক পরিচিতি ছিল ‘কাজী’। অনুসন্ধিৎসু আর ভাবনার নিবিষ্টতাও তাদের চারিত্রিক মিলবন্ধনের অন্যতম কারণ। তাছাড়া মোতাহার হোসেনের সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ততাও এ বন্ধুত্বের অন্যতম কারণ হতে পারে।

সাদৃশ্য আর বৈসাদৃশ্যের আশ্চর্য মিলবন্ধনের মাধ্যমে এরকমই নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে কাজী মোতাহার হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলাম জড়িয়েছেন গভীর বন্ধুত্বে। একে অপরের প্রাত্যহিক জীবনের নানা অনুষঙ্গের সাক্ষী হয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে দু’জনই হয়ে আছেন মনীষী। দু’জনেই উদার জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের সমাজ, দেশ ও জাতিকে।

লেখক: শিপন আলম
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 26 times, 1 visits today)