ঢাকাTuesday , 19 April 2022

“একজন আত্মভোলা মানুষ” – ড. কাজী মোতাহার হোসেন : লেখক -শিপন আলম –

Link Copied!


রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :  (প্রথম অংশ)

ছোটবেলা থেকেই তিনি নাকি ভুলোমনা। ঠিকমতো কোন কিছু খেয়াল করতেন না- ভুলে যেতেন তাড়াতাড়ি। তাই সবাই তাঁকে ভুলোমনা বা আত্মভোলা মানুষ হিসেবেই চিনতো। এখনো ভুলোমনা মানুষ বললে যে কয়জন প্রথিতযশা ব্যক্তির নাম মানসপটে ভেসে ওঠে তাদের মধ্যে তিনি একজন। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে- ভুলোমনা স্বভাব নাকি মানুষের জন্য ভালো। এমন মানুষ নাকি নতুন নতুন জিনিস দ্রুত শিখতে পারে। কারণ সে মস্তিষ্ক থেকে পূর্ব কাজের অপ্রয়োজনীয় তথ্য শীঘ্রই মুছে দিয়ে তাতে দ্রুত নতুন তথ্য প্রবেশ করাতে পারে। তাই সে পূর্বের অনেক কথাই ভুলে যায়। ভুলোমনা এই স্বভাবের কারণেই হয়তো তিনি গণিতশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা, পরিসংখ্যানবিদ্যা, সাহিত্য, সঙ্গীত, দাবা আর অন্যান্য খেলাসহ বিবিধ বিষয়ে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পেরেছিলেন। হতে পেরেছিলেন একজন প্রকৃত জ্ঞানতাপস। তীক্ষ্ণ জ্ঞানের বর্ণিল আলোয় যিনি আলোকিত করতে পেরেছিলেন নিজ পরিবার, সমাজ ও দেশকে। হাজারো গুণে গুণান্বিত মহৎ হৃদয়ের এ মানুষটিই আমাদের আত্মভোলা ড. কাজী মোতাহার হোসেন।

তাঁর ভুলোমনা স্বভাব নিয়ে তাঁর জন্মস্থান রাজবাড়ী জেলার হাবাসপুর-বাহাদুরপুর অঞ্চলে, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী, ছাত্র ও আত্মীয় পরিজন সবার মাঝেই অসংখ্য গল্প প্রচলিত আছে যা প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশের পাশাপাশি নির্মল ও পরিশীলিত বিনোদনের খোরাক জোগায়।

তাঁর এই ভুলোমনা স্বভাবের কারণ মূলত অঙ্কশাস্ত্র ও দাবা খেলার প্রতি বিশেষ দূর্বলতা। এই দুইটা জিনিসের ভূত মাথায় চাপলে তিনি দুনিয়ার সবকিছু ভুলে যেতেন। অঙ্কের প্রতি দূর্বলতা বা পারদর্শিতা তাঁর ছোটবেলা থেকেই। তাই ভুলোমনা স্বভাবও তাঁর ছোটবেলা থেকেই। ছোটবেলায় একবার তাকে গাই দোয়াবার জন্য বাছুর নিয়ে আসতে বলা হলে তিনি ভুলে অন্য গাইয়ের বাছুর নিয়ে চলে আসেন। পরে কারণ হিসেবে বলেছিলেন- তিনি তখন মনে মনে একটি অঙ্ক মেলাতে ব্যস্ত ছিলেন। অঙ্কটা বার বার করেও তিনি মেলাতে পারছিলেন না। তাই ধ্যান জ্ঞান সব অঙ্কের মধ্যে নিবদ্ধ করায় আসল বাছুরের প্রতি খেয়াল ছিল না।

শৈশবের এ ভুলোমনা স্বভাব কৈশোরেও বর্তমান ছিল তার মধ্যে। কৈশোরকালে একবার তিনি তার জন্মস্থান- বাহাদুরপুরের পাশের গ্রাম সেনগ্রাম বাজার থেকে গামছায় করে কই মাছ কিনে এনে মা-কে দিলে মা গামছা খুলে দেখেন গামছায় একটি কই মাছও নেই। কই মাছগুলো কখন গামছার ফাঁক গলে একটা একটা করে পড়ে গেছে তা কিশোর মোতাহার একদমই খেয়াল করে নি।

শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে ছাত্র জীবন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ছুটির অবকাশে তিনি প্রায়ই গ্রামে আসতেন। পার্শ্ববর্তী দুটি গ্রাম মেঘনা ও সেনগ্রাম হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় সেখানে প্রায়ই যাত্রাপালা ও গানের অনুষ্ঠান হত। বাড়িতে এসেই তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের সান্নিধ্যপ্রাপ্ত আত্মীয় এবং গ্রামের প্রতিবেশী স্নেহধন্য মরহুম আব্দুল জলিল মৃধাকে সাথে নিয়ে যাত্রাপালা ও গান উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়তেন। গ্রামীণ মেঠো পথে চলতে চলতে তিনি হারিয়ে যেতেন তার ভাবনার জগতে। গ্রামের মানুষের পশ্চাদপদ জীবন যাপন, নদী, পাখি, ফুল, ফসল, সৌন্দর্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি তার ভাবনার জগতে প্রতিনিয়তই দোলা দিয়ে যেত। মরহুম আব্দুল জলিল মৃধা তার ‘সান্নিধ্যের স্মৃতি’ প্রবন্ধে তাই লিখেছেন-‘ তিনি আজন্ম ভাবুক ছিলেন। আনমনা হয়ে চিন্তা করতে করতে পথ চলতেন। তাঁর এই আত্মভোলা স্বভাব নিয়ে অনেক কাহিনী কিংবদন্তীর মত লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে।’

তাঁর এই চিন্তামগ্ন থাকার বিষয়টি তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। তাঁর আরেক আত্মীয় এবং একই গ্রামের বাসিন্দা মরহুম জনাব আজিজুল কাদের তার ‘অন্তরঙ্গ আলোকে কাজী মোতাহার হোসেন’ স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছে- ‘আমি তাঁকে একদিন বললাম বাল্যের সহপাঠী সোবহান কাজী আমাকে বলেছিলেন যে, আপনি নাকি বাল্যবয়সে মাঠে একাকী বসে ইটের উপর কি হিজিবিজি আঁকতেন এবং তা দেখে তখনকার গুরুজনেরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এই বলে যে, মোতাহার কালক্রমে প্রতিভাবান হবে। উত্তরে তিনি বললেন, সব কথা মনে নেই তবে এটা ঠিক যে শৈশবেই একাকী চলতে ফিরতে ভালবাসতাম এবং সর্বদা চিন্তামগ্ন থাকতাম। বললেন, একদিন আজুদিয়া হাটের পথে অনেকটা হেঁটে গেলে পথিমধ্যে যদু কাজী জিজ্ঞাসা করলেন, মোতাহার কোথায় যাচ্ছ? আমি বললাম- হাটে। তিনি বললেন- আজ তো হাট নেই। তখন ভেবে দেখলাম সত্যি তো আজ হাটবার নয়। ফিরে এলাম।’

কাজী সাহেবের নানা বাড়ি ছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। এখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
একবার তিনি মাতুলালয় থেকে গ্রামের বাড়িতে আসলে তার এক প্রতিবেশী (মরহুম আজহার মুনশী) আসার পথে ‘মহিষবাথানের রাসের মেলা কেমন দেখলে’ তা জানতে চান। উত্তরে তিনি কোন মেলা দেখেন নি বলে জানান। উল্লেখ্য উক্ত মেলাটি তার মাতুলালয় থেকে আসার পথেই ছিল কিন্তু বালক মোতাহার চিন্তামগ্ন থাকার কারণে মেলার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে আসলেও তা খেয়াল করেন নি।

কর্মজীবনেও তিনি ছিলেন ‘অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর’। ক্লাস নেওয়ার সময় সময়ের ব্যাপারে তাঁর কোন খেয়াল থাকতো না। ভুলে যেতেন কোন দিন বিশ্ববিদ্যালয় খোলা আর কোন দিন বন্ধ। তাঁর ছাত্র জামিল চৌধুরী তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন- ‘ক্লাস নেবার সময়ে় তিনি এমন তন্ময় হয়ে থাকতেন যে, সময় সম্পর্কে খেয়াল থাকত না। অনেকবার দেখেছি হয়তো চটি খুলে চেয়ারে বসে কথা বলছেন। হঠাৎ করে চটি রেখে খালি পায়ে বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে লিখতে আরম্ভ করেছেন। কোন দিন যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ আর কোন দিন খোলা তারও খবর রাখতেন না। একদিন হয়ত এসে দেখলেন কার্জন হল প্রাঙ্গণের প্রধান গেটে তালা দেওয়া, তিনি গেট টপকে ভেতরে ঢুকে নিজের ঘরে গিয়ে কাজ আরম্ভ করে দিতেন।’

আরেক প্রিয় ছাত্র ও সিএসপি অফিসার এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কাজী ফজলুর রহমান তাঁর ‘কাজী মোতাহার হোসেন: একজন সম্পূর্ণ মানুষ’ শিরোনামে স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধে বলেছেন- ‘ ক্লাসে পড়ানোর সময় কখন ঘণ্টা শেষ হলো সেটা কদাচিৎ তাঁর খেয়াল হত। সমস্যা হত যখন পরবর্তী ঘণ্টাটি থাকত সাবসিডিয়ারি ক্লাসের জন্য। উশখুশ করতাম, মনে করিয়ে দেবার সাহস হত না।’

একবার এমএসসি’র ভাইভার সময় স্যারের ছাত্র ও পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কাজী সালেহ আহমেদ- কে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট আটকে রেখেছিলেন। অর্থাৎ ভাইভা নিতে গিয়ে তিনি ডাস্টার, চক ব্যবহার করে পুরোপুরি ক্লাস নেওয়া আরম্ভ করে দিয়েছিলেন। শেষে ভাইভা বোর্ডের আরেকজন সদস্যের হস্তক্ষেপে তিনি ছাড়া পান।

লেখক: শিপন আলম, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 45 times, 1 visits today)