বিশেষ প্রতিবেদন- ফিরে দেখা অগ্নিঝরা সেই দিনগুলি – লেখক মুক্তিযোদ্ধা প্রদ্যুৎ কুমার দত্ত-

 

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

99nn870

 

অগ্নিঝরা ১৯৭১ এর ৭ ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ান্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে ৩০ লাখ মানুষের উপস্থিতি। লাঠিসোটা নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য। দুপুর ২টায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য ভোর থেকে মানুষ জড়ো হয়েছিল সেখানে । অধীর আগ্রহভরে অপেক্ষা সবার । কি শোনাবেন বঙ্গবন্ধু। অবশেষে ৩টা বেজে ২০ মিনিটে মঞ্চে এলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। দিলেন বজ্রকন্ঠে ঐতিহাসিক ভাষণ। ভাষণতো নয়। অসাধারণ সম্মোহনী শক্তির জাদুকরী কবিতা। আত্মপ্রত্যয়ে বলীয়ান এক নেতার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের শ্রেষ্ঠ উপাখ্যান। যা ছিল ঐক্যবদ্ধ সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মনের চুড়ান্ত বাসনার সাহসী উচ্চারণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কবিতা, মানুষের মুক্তি সংগ্রামের নির্দেশনা। ৭ই মার্চের ভাষণের পরিমন্ডল বিশাল। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর প্রতি দৃঢ়-কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিলেন- ”সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না”।
৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার আপামর জনগণের প্রতি মুক্তি সংগ্রামের উদাত্ত আহবান জানিয়েছিলেন। ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি বিশেষ করে ঐ সময়ের সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন-
”সরকারি কর্মচারীদের বলি-
আমি যা বলি মানতে হবে”
কার্যত ১৯৭১ এর মার্চের পূর্বে দেশ পিনিয়ামের উপর দুলছিল। কখন কি হয়? সবই কেমন যেন একটা উৎকন্ঠার মধ্যে। ঐ উৎকন্ঠার মধ্যে ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ান্দী উদ্যান) মহান নেতার কন্ঠে উচ্চারিত হলো-”সরকারি কর্মচারীদের বলি- আমি যা বলি মানতে হবে”। ঐতিহাসিক সেই ভাষণে বাংলার আপামর জনগণের প্রিয় নেতা আরও ঘোষণা দিলেন- প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলো এবং তোমাদের যা কিছু তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। ঐতিহাসিক সেই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে শহীদ হওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছেন এভাবে, ”রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ”। তিনি প্রতিপক্ষকে হুশিয়ার করেছেন। একইসাথে বাঙালি জাতিকে প্রস্তÍত থাকতে বলেছেন। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন। ভাষণটির শেষ লাইনে বাঙালি জাতির করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, ”এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা”। এ লাইনের মর্মার্থ তখন মুক্তিপাগল বাঙালি মাত্রই বুঝেছিল। তাই তারা তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ছিনিয়ে এনেছে রক্তভেজা স্বাধীন লাল সবুজের পতাকা, সার্বভোম স্বাধীন ভূখন্ড, পৃথক জাতীয় সঙ্গীত, বিশ্ব মানচিত্রে পৃথক পরিচিতি। আমি ঐ সময়ে ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার রাজবাড়ী সার্কেলের আটদাপুনিয়া ইউনিয়নের (বর্তমানে রাজবাড়ী জেলার সদর উপজেলার মুলঘর ইউনিয়ন) ছায়াসুনিবিড় পল্লী গ্রাম এড়েন্দা গ্রাম এলাকায় বসবাসকারী একমাত্র সরকারি কর্মচারী। তখন আমার পোস্টিং ছিল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর সি,ও (সার্কেল) অফিসে। সংগত কারণেই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার আহবানে সাড়া দিয়ে ৮ ই মার্চ ১৯৭১ অফিস ত্যাগ করে নিজ গ্রামের বাড়ী এড়েন্দাতে চলে আসি।
তখন মহান নেতার বজ্রকন্ঠে উচ্চারিত ভাষণের প্রতিটি কথা আমার ধমনী-শিরার প্রতিটি রক্ত কণায় আষ্ঠে-পীষ্ঠে মিশে রণিত-অনুরণিত হতো। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অফিস ত্যাগ করে নিজ বাড়ী এড়েন্দায় এসে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ২/৩ দিন অথবা ৩/৪ দিন পরে তারিখ ঠিক মনে নেই, রাজবাড়ীতে এসে তৎকালীন মাননীয় এমপিএ কাজী হেদায়েত হোসেনের সংগে সাক্ষাৎ করি। তাঁর উপদেশ/পরামর্শ মতে, আমি ঐ সময়ের একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে গ্রাম উপ-সংগঠকের ভূমিকা নিয়ে আমার এড়েন্দা গ্রামের হিন্দু-মুসলমান যুব সমাজকে গ্রাম সংগ্রাম পরিষদ গঠনের বিষয়টি অবহিত করি। বিষয়টির সংগে সবাই একমত পোষণ করলে কোলাগ্রাম নিবাসী শ্রদ্ধেয় জালালউদ্দিন বিশ্বাসকে (প্রতিষ্ঠাতা, কোলা সদরউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়) দলের উপদেষ্টা মনোনয়ন করে ৪৫ সদস্য সমন্বয়ে এড়েন্দা গ্রাম সংগ্রাম পরিষদ গঠন করি। যার দপ্তর খোলাসহ খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় আমাদের বাড়ী এড়েন্দা দত্ত বাড়ীতেই। বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণেই লুটতরাজ, খুন-হত্যা হতে পারে মর্মে আগাম আভাস দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ আরো একটি বিষয় পরিষ্কার করে গেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বাঙালিদের মধ্যেও স্বাধীনতা-বিরোধী থাকবে। তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য তিনি স্বাধীনতাকামীদের সতর্ক করেন, ”শোনেন, মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে”। গ্রাম সংগ্রাম পরিষদের ক্যাম্প আমাদের বাড়ীও ঐ সময়ে স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার ও অবাঙালীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। তাই বাড়ীর মালামাল লুটতরাজ,অগ্নিসংযোগসহ অনেকেই সেই সময়ে শহীদ হয়েছিলেন।
আমার গঠিত এড়েন্দা গ্রাম সংগ্রাম পরিষদের সদস্য, যাদের মধ্যে আজ অনেকেই জীবিত নেই-তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, আত্মার শান্তি কামনা করে সেই সংগ্রাম পরিষদের বীরদের নাম আমার লেখনিতে সংযোজন করছি। (১) শ্রদ্ধেয় জালাল উদ্দিন বিশ্বাস, উপদেষ্টা (প্রতিষ্ঠাতা,কোলা সদরউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়), (২) প্রদ্যুৎ কুমার দত্ত, দল প্রধান, সরকারি কর্মচারী, মুকসুদপুর সিও (রাজস্ব) সার্কেল (লেখক নিজে), (৩) কাশেম মাস্টার কোলা সদরউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, সদস্য (৪) রহমান (জামাই),গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য, (৫) নিমাই সরদার, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৬) হোসেন গেদা, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৭) মেনাই ভাই, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৮) সত্যরঞ্জন পাল, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৯) নিত্যরঞ্জন পাল, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১০) অমূল্য পাল, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১১) ননী গোপাল পাল, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১২) ভোলা পাল, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১৩) যতিন্দ্র নাথ পাল (মনি পাল), গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১৪) রমেশ চন্দ্র গুহ, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১৫) দুলাল চন্দ্র গুহ, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১৬) সুভাষ চক্রবর্তী, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১৭) সুকুমার চৌধুরী, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১৮) কালীপদ রুদ্র, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (১৯) নিরঞ্জন বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২০) রতন বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২১) প্রীতিশ কুমার দত্ত, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২২) নরেশ কুমার দত্ত, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২৩) জগদীশ চন্দ্র দত্ত, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২৪) মলিন কুমার দত্ত, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২৫) নগেন্দ্র নাথ দত্ত, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২৬) মাখন লাল দত্ত, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২৭) বিমল বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২৮) বিঞ্ষু পদ বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (২৯) সত্য বৈরাগী, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৩০) ভূবন মোহন বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৩১) ভুটু বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৩২) জীতেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৩৩) অমূল্য বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৩৪) জীতেন্দ্র নাথ কর, গ্রাম-শিবরামপুর, সদস্য (৩৫) কালীপদ রাউৎ, গ্রাম-নিমতলা, সদস্য (৩৬) জোনাব আলী সেখ, গ্রাম-বাঘিয়া, সদস্য (৩৭) মনিরদ্দিন মোল্লা, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৩৮) গীতা কর, গ্রাম-শিবরামপুর, সদস্য (৩৯) ইরা কর, গ্রাম-শিবরামপুর, সদস্য (৪০) কার্তিক বিশ্বাস, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৪১) সমসের, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৪২) আমু, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৪৩) আকবর, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৪৪) অভিমান্য পাল, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য (৪৫) উষা পাল, গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য এবং দিনু সেখ,গ্রাম-এড়েন্দা, সদস্য ।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর ভাষণে প্রদত্ত নির্দেশনাকে পবিত্র দায়িত্ব মনে করে আমার গঠিত সংগ্রাম পরিষদের সকল সদস্যের সহযোগিতায় আমরা লাঠি, শরকি, দা,রামদা ইত্যাদি সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তুলি। রাজবাড়ীতে অবাঙালিসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের অত্যাচার বেড়ে গেলে এড়েন্দা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এপ্রিল, ১৯৭১ এর মাঝামাঝি সময়ে দুই থেকে আড়াই হাজার লোকের একটি মিছিল লাঠি, শরকি, দা,রামদা ইত্যাদি নিয়ে রাজবাড়ীতে বসবাসরত অবাঙালিসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলে পথিমধ্যে আলাদিপুর জামাই পাগলের মাজারের সন্নিকটে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শ্রদ্ধেয় কাজী হেদায়েত হোসেন তৎকালীন মাননীয় এমপিএ সাহেবের অনুরোধের প্রেক্ষিতে রাজবাড়ী শহরে আমরা ঢুকতে পারি নাই। আমরা পুনরায় সংগ্রাম পরিষদের ক্যাম্পে ফিরে আসার পর সংগ্রাম পরিষদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখি।
অবশেষে ০৭/০৫/১৯৭১ তারিখ অনুমান বেলা এক টা হতে দেড় টার মধ্যে ১২ শত থেকে ১৪ শত অবাঙালি আর স্বাধীনতা বিরোধী তাদের দোসরদের একটি দল আমাদের সংগ্রাম পরিষদের ক্যাম্পে আক্রমণ করে। তারা সে সময় চালায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, লুটতরাজ, খুন, হত্যা ও অগ্নিসংযোগ। চলে তুমুল সন্মুখ যুদ্ধ। শিবরামপুর নিবাসী জিতেন্দ্র নাথ কর ও নিমতলা নিবাসী কালীপদ রাউৎ নামে দুইজন সে সন্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। রামদার কোপে আমার বা হাতের অনামিকার মাথা কখন কেটেছে তখন আঁচ করতে পারি নাই। সে সময়ে পাশের গ্রামের লোকজনের সহযোগিতায় এবং আমাদের প্রতিরোধের মুখে শত্রুরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। উল্লেখ্য, আশে-পাশের গ্রাম ছাড়াও অনেক বহিরাগতরাও আমাদের বাড়ীতে সে সময়ে আশ্রয় নিয়েছিল। অবাঙালি আর স্বাধীনতা বিরোধী তাদের দোসরদের দ্বারা আমাদের বাড়ীতে লুটতরাজ ও হত্যাকান্ডের পর অর্থ সংকট, খাদ্য সংকট বিশেষ করে শিশু খাদ্য সংকট ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় ০৭/০৫/১৯৭১ তারিখের ঘটনার পর ২/৩ দিন দেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করে সিদ্ধান্ত নিলাম ভারতে যাবার। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে দেশকে শত্রুমুক্ত করার সংকল্প নিলাম। এরই মধ্যে উপনিবেশিক ওয়ারেন্ট মাথায় নিয়ে সরকারের হাজারো কঠিন কঠিন আল্টিমেটামের পরেও ঘৃণাভরে চাকুরীতে আর যোগদান করি নাই।
বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই পেড়িয়ে ২৪/০৫/১৯৭১ তারিখে ভারতে পৌঁছাই। বাম হাতে অনামিকার ব্যাথাসহ শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। একটু সুস্থ হয়ে কলকাতায় ৮ নং থিয়েটার রোডে গেলাম। সেখানে যথারীতি পরামর্শ গ্রহণের পর কল্যাণীতে (Board of Control Youth and Receiption camp) Mujibnagar ভর্তি হই। ক্যাম্প কমাড্যান্ট মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তৎকালীন মাননীয় এমপিএ কাজী হেদায়েত হোসেন সাহেব ক্যাম্পের রেশনের হিসাব রাখার দায়িত্ব দেন।
ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছি। একদিন ঘোষণা এলো-পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের গোটা নয় মাস আমি আমার সংগঠক কাজী হেদায়েত হোসেন, তৎকালীন মাননীয় এমপিএ নেতৃত্বাধীনেই থেকেছি। তিনি আমাকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার্টিফিকেট দিয়েছেন-যেখানে লেখা আছে”Strong Principal, Sincere @ Active” সহ চাকুরীতে পদোন্নতির সুপারিশ। মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ ১৮/০২/১৯৭২ তারিখে বাংলাদেশে আসেন। বাড়ীতে লুট হওয়া জিনিসপত্রসহ সংঘটিত দুইটি হত্যাকান্ডের বিষয়ে ২৩/০২/১৯৭২ তারিখে স্থানীয় থানায় এবং তৎকালীন ইউনিয়ন রিলিফ কমিটিকে অবহিত করা হয়।
বিধ্বস্ত বাড়ীঘর মেরামত/সংস্কার করে বাসোপযোগী করার লক্ষ্যে আমার পূর্বের কর্মস্থল গোপালগঞ্জ মহকুমা (বর্তমানে জেলা) মুকসুদপুর সার্কেল থেকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ মহকুমাতে বদলীর আবেদনের প্রেক্ষিতে সুকোমল হƒদয়ের অধিকারী তৎকালীন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক আমাকে গোয়ালন্দ মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলী করেন। গোয়ালন্দ মহকুমার প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদানের পর মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের বিবৃতি দিয়ে পদোন্নতির জন্য সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে ০১/০৬/১৯৭৪ তারিখে আবেদন করলে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ০৮/০১/১৯৭৫ তারিখের M-II/507/74-30   সংখ্যক স্মারকে একটি ফরম পূরণসহ প্রয়োজনীয় তথ্যাদি বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। আমি উক্ত ফরম পূরণ করে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিস্বাক্ষরের মাধ্যমে আমার স্বপক্ষীয় কাগজপত্র দাখিল করলে দাখিলীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করে স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার আমাকে পদোন্নতি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সে অনুযায়ী আমাকে পদোন্নতি প্রদানের জন্য তদানীন্তন রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের সংস্থাপন বিভাগের শাখা ম-২ এর ২৫/৯/১৯৭৫ তারিখের ম-২/৫০৭/৭৪-১৬১১-১(৩) সংখ্যক স্মারকে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। তদপ্রেক্ষিতে অবিভক্ত বৃহত্তর ফরিদপুর কালেক্টরেটে প্রায় ৬/৭ শত কিংবা তদূর্ধ্ব নিম্নমান সহকারীর মধ্যে আমি তাদেরকে অতিক্রম করে ২৫/৯/১৯৭৫ তারিখে পদোন্নতি প্রাপ্ত হই। স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটিতে হাজির হওয়া ব্যতিরেকেই বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ১৪০(২) এর বিধান অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতির পুরস্কার হিসেবে সরকারের স্বীকৃতি ছিল আমার সেই পদোন্নতি।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে মহান মু্ক্িতযুদ্ধকালীন সরকারি চাকরী পরিত্যাগ করে নিজ গ্রামে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মোতাবেক সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ আমার জন্য গর্বের বিষয়। একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার আমাকে পদোন্নতি দিয়ে কৃতজতা পাশে আবদ্ধ করেছিল। Government Service (Seniority of Freedom Fighter) Rules, 1979 এ বর্ণিত সংগা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বিনা বাধায় বা বিনা অভিযোগে সরকারি চাকুরী সমাপ্তি করে এখন অবসর যাপন করছি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে সরকারি কর্মচারীদের প্রতি যে নির্দেশনা ছিল তা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে সমর্থ হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুসরণ করেই আমি তৎকালীন দখলদার সরকারের চাকুরী পরিত্যাগ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম। ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতিটি নির্দেশনা আজও আমার পাথেয়-আমার আলোকবর্তিকা। উল্লেখ্য, ঐ সময়ে আমি মিত্র বাহিনীর কোন সহযোগিতা পাই নাই। পরবর্তীতে আমার ধারাবাহিকতায় সুপারদর্শী নায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব বাকাউল আবুল হাসেম তাঁর সুদক্ষ দল নিয়ে আমার ঐ দত্ত বাড়ি ক্যাম্পে অবস্থান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যান এবং অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছেঁন। এ জন্য তাঁকে আমার শত-সহস্র অভিবাদন, হƒদয়ের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানাই। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

(Visited 90 times, 1 visits today)