করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বরাটের সাদেকাবাদ জনকল্যাণ ট্রাস্ট -এর ভিন্নধর্মী উদ্যোগ –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের মন্ডল বাড়ি বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ঠেকাতে বিরল ইতিহাস সৃষ্টি করলো। সারা পৃথিবীতে যখন বিভিন্ন উন্নত দেশে লকডাউন বিরাজ করছে। অনেক দেশে যখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে যখন সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ। রাস্তায় রাস্তায় যখন আর্মি টহল দিচ্ছে। সারা দেশের শিক্ষিতজন, বুদ্ধিজীবী, সচেতন সমাজ যখন হোম করোনটাইনে ব্যস্ত। কেউ যখন ঘর থেকে বের হচ্ছে না। রেডিও, টিভি, নিউজ পেপারসহ বিভিন্ন মিডিয়াতে যখন হাত ধোয়া, হাত ধোয়া বলে মুখে ফুপরি তুলে ফেলছে। কেউ ঘরে থেকে বের হচ্ছে না। বিষয়টা এমন হয়েছে যে হাতে অস্ত্রনেই, কিন্তু বার বার বলা হচ্ছে যুদ্ধ কর।
তখন সেই সময় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন সাচ্চু নামক এক ব্যাক্তির অকুতোভয় নেতৃত্বে মন্ডল পরিবার থেকে, সমস্ত মৃত্যু, ভয়ডর উপেক্ষা করে দুস্থ-বিধবা এতিম পরিবার কে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে কি ভাবে হাত ধুতে হয়? তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় হাত ধোয়ার উপকরণ।
নিয়ম মেনে দেয়া হলো এই উপকরণ গুলো। যে স্থান থেকে এই কাজটি সম্পূর্ণ হলো, সেটা হচ্ছে সাদেকাবাদ জনকল্যাণ ট্রাস্ট আঙিনা। দুইদিন আগে থেকে আঙিনার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়। জীবাণুনাশক স্প্রে করা হয় বারবার। ৪ ফিট পর পর গোল বৃত্ত আঁকা হয়। সেখানে আলাদা আলাদা করে রাখা হয় চেয়ার ও টুল। এক সারিতে ৪ ফুট পর পর রাখা হয় ৬টা ব্রেঞ্চ। ব্রেঞ্চের পাশে রাখা হয় ৬টা বালতি। পানি পূর্ণ বালতি ও মগের সাথে হাত ধোয়ার সাবান।
আঙিনায় ঢোকার মুখে রাখা হয় জীবাণু নাশক স্যানিটাইজার। প্রত্যেকে জীবাণু মুক্ত হয়ে আঙিনায় প্রবেশ করেন। বসেন ৪ ফুট দূরে দূরে।
হাত ধোয়ার প্রশিক্ষণ দেন বরাট ভাকলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শম্পা প্রামাণিক। উপস্থিত ছিলেন পল্লী চিকিৎসক মোতালেব মিয়া, সহকারী শিক্ষক নাজমুল ইমাম ও সেজান মাহমুদ অতুল।
সকাল ৯টার পর অনুষ্ঠান সীমিত করা প্রসংগে সাদেকাবাদ জনকল্যাণ ট্রাস্ট এর সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সাচ্চু কে জানতে চাইলে তিনি বলেন- “আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দান কালে বলেছেন- ‘করোনা ভাইরাস মোকাবেলা একটি যুদ্ধ।’ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সবাই যুদ্ধ করেনি। অনেকেই ঘরে ছিলো। যারা যুদ্ধ করেছিল, তারা মৃত্যু ভয় করেনি। মৃত্যু জেনেই দেশ মাতৃকার তরে স্বাধিকার অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তেমনি মনে কর আমি মৃত্যু জেনেই মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি। আজকের অনুষ্ঠান কোনো ভাবেই বন্ধ হবে না। ওদের জানিয়ে দাও।
আরো বলেন- যে দেশে এখনো নিরক্ষরতার হার ৪০.১৪ শতাংশ। সেখানে কিভাবে ঐ মানুষ গুলো সচেতন হবে? আমরা যদি না এগিয়ে আসি। যে দেশে এখনো দারিদ্র্যের হার ২০.০৫ শতাংশ। যারা দিন আনে দিন খায়। যারা দুস্থ-এতিম, বিধবা, হতদরিদ্র, তারা কি ভাবে সাবান কিনে ১৫ মিনিট পর পর হাত ধোবে। যেখানে দুবেলা ক্ষুধা নিবারণ করাই তাদের জন্য কষ্ট সাধ্য।
তোমরা যে সোশ্যাল ডিসটেন্সের কথা বলছ, সেটা আমি বুঝি। তোমরা যে সোশ্যাল চেইন ভেঙে দেবার কথা বলছ, সেটাও বুঝি। আমি তোমাদের সচেতন সমাজ কে বলে দিতে চাই- নিজেকে বাঁচাতে ঘরে বসে থাকলেই হবে না। তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমি স্যালুট জানাই সেই সকল ডাক্তারদের। যারা মৃত্যু জেনেও করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ করে তুলছেন। তা না হলে মৃত্যু হার আরও অনেক গুন বেড়ে যেতো। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের মতো এটাও আমাদের আর একটি যুদ্ধ। এ যুদ্ধে জয় আমাদের হবেই। এরকম মহামারি পৃথিবীতে আরও অনেকে হয়েছে। হয়েছে ১৩২০ সালে,১৪২০ সালে,১৫২০সালে, ১৬২০সালে,১৭২০ সালে, ১৯২০ সালে। এসকল মহামারি জয় করেই মানবসভ্যতা এগিয়ে যাবে। জয় হোক মানব সভ্যতার।”
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সত্যিই এক বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলো মন্ডল পরিবারের সাদেকাবাদ জনকল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত দুস্থ-এতিম প্রযতœ প্রকল্প দাতব্য চিকিৎসালয়। তাদের এ মহতি কাজকে সম্মান জানান এলাকার সমস্ত জনগন।

(Visited 66 times, 1 visits today)