কেসমতের ভুয়া পার্সপোট তৈরী করে বিদেশে পালানোর চেষ্টা রুখে দিলেন রাজবাড়ীর এসপি –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম : 

তিন বছর আগেও রাজবাড়ী অজপাড়াগায়ের বাসিন্দা ছিলো আল মামুন ওরফে কেসমত মন্ডল। হঠাৎ করেই রাজধানী ঢাকায় উইনার ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস’র খুলে রাতারতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি। তবে গত সোমবার রাতে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার দুই মাস আগে থেকেই সে দেশে ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে লক্ষে তিনি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র বের করেন এবং নতুন পাসপোট পাবার জন্য তিনি আবেদন করেন। তবে রাজবাড়ীর চৌকস পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান পিপিএম-এর কারণে তার নতুন পাসপোটটি আজো তিনি হাতে পান নি। ধারনা করা হচ্ছে এই পাসপোসটি বের করতে পারলেই বিদেশে পারি দিতো আল মামুন ওরফে কেসমত মন্ডল।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান পিপিএম বলেন, একাধিক অস্ত্রধারী বডিগার্ড ও ওয়াকিটকি নিয়ে চলাফেরা করতো আল মামুন ওরফে কেসমত মন্ডল। দুই মাস আগে সে নতুন একটি জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরী করে। সেই সাথে নতুন পাসপোটের জন্য আবেদনও করে। ওই আবেদন পাসপোট অফিস থেকে পুলিশ ভেরিভিকেশনের জন্য রাজবাড়ীর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এর পর পরই তদবির করতে আল মামুন ওরফে কেসমত মন্ডল তার কার্যালয়ে আসেন। তিনি আল মামুনের সাথে কথা বলে জানতে পারেন, তার উইনার ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস, সিকিউরিটি গার্ড সরবরাকারী প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অথচ আল মামুন বলছেন তার কোন পাসপোর্ট নেই। এতে তার সন্দেহ হয় এবং আল মামুনের পুলিশ ভেরিভিকেশনের আবেদনটি তদন্তভার রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) ফজলুল করিমের উপর ন্যন্ত করেন। যে কারণে সময় কালক্ষেপন হয়। এতে ক্ষুব্দ হন আল মামুন। তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) ফজলুল করিমকে তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত দেবার জন্য চাপ দেন এবং খারাপ আচরণ করে। সেই সাথে তিনি অল্প কিছু দিন পূর্বে পুনরায় তার (পলিশ সুপারের) সাথে দেখা করেন। সে সময় পুলিশ সুপার আল মামুনের কাছে তার এসএসসি পাশের সনদপত্র চান এবং তার আবেদনটি যাচায়ের জন্য রাজধানী ঢাকার এসবিতে পাঠান। এখনো সে প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। আল মামুন র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হবার পর এখন বোঝা যাচ্ছে সে নতুন এই পাসপোর্টটা বের করতে পারলে দেখ ছেড়ে পালাতো। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হতো প্রতারিতরা।


উল্লেখ্য, রাজবাড়ীর কেসমত মন্ডল ঢাকায় গিয়ে হয়েছেন উইনার ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস’র মালিক আল-মামুন। তাকে দেড় কোটি টাকা প্রাতারণার অভিযোগে গত সোমবার রাতে রাজধানী ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার প্রতিষ্ঠান থেকে র‌্যাব-২ সদস্যরা গ্রেপ্তার করেছে। আল-মামুন ওরফে কেসমত মন্ডল রাজবাড়ী সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের জৌকুড়া গ্রামের আফসার মন্ডলের ছেলে।
আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার নারায়নগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ’র মৃত শামসুদ্দিন ভুইয়ার ছেলে হাজী মোঃ আলাউদ্দিন ভুইয়া বাদী হয়ে ঢাকার ক্যান্টরমেন্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। বাদী বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা প্রতারনার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেছে আল মামুনের বিরুদ্ধে। সেই সাথে ওই মামলায় মোঃ আলী আকবরের কাছ থেকে ২৩ লাখ, মোঃ আব্দুল আলিমের কাছ থেকে ২লাখ বিশ হাজার, ইসমাইল হোসেনের কাছ থেকে ৪ লাখ, মোঃ ফয়সালের কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকা নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখারও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা গত সোমবার র‌্যাব-২ এর কোম্পানী অধিনায়কের কাছে অভিযোগ দায়ের করলে ওই দিন রাতেই উইনার ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস-এর রাজধানির বারিধারা ডিওএইচএস থেকে প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় র‌্যাব সদস্যরা। সেখান থেকে হয় শতাধিক পাসপোর্ট, অনুমোদনহীন ওয়াকটিক’সহ প্রতারণায় ব্যবহৃত নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের মালিক আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জানাগেছে, র‌্যাব-২ -এর সহকারী পুলিশ শহিদুল ইসলাম জানান, আল মামুন পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে নানা প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতো। কখনো কখনো ভয় দেখিয়ে আদায় করতো অর্থ। টাকা ফেরত চাইতে এসে অনেকে মারধরের শিকারও হয়েছেন। নিজেকে ক্ষমতাধর জাহির করতে ওয়াকিটকির অনৈতিক ব্যবহার করতেন তিনি। প্রতারণার টাকায় গ্রামের রাজবাড়ী যেতেন হেলিকপ্টারে চরে। অফিস কর্মচারি কাউকেই দুই মাসের বেশি চাকরিতে রাখতেন না এ প্রতারক। সে আরো ৫০ জনের কাছ থেকেও অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।
রাজবাড়ীর চন্দনী ইউনিয়নের বাসিন্দা আফসার উদ্দিন বলেন, কেসমত মন্ডল বেশ কিছুদিন সৌদি আরব ছিলো। কয়েক বছর আগে দেশে ফেরে। এর পর সে ঢাকা ব্যবসা শুরু করে। সেখানে তার নাম দেয় আল-মামুন। রাজবাড়ীতে সে যখন আসতো সাথে চার/পাঁচ জন অস্ত্রধারী থাকতো এবং তার হাতে থাকতো ওয়াকিটকি। দামী পাজেরো গাড়ী থাকতো সাথে। ভাব-সাব ছিলো হিন্দি ফ্লিমের গড়ফাদারদের মত। মাঝে মধ্যে সে হেলিকপ্টরেও আসতো। সর্বশেষ তার গত বছরের ২৭ মে ঈদের আগে দৌলতদিয়া ঘাটের যানজট থেকে রক্ষা পেতে রাজবাড়ীর কাজী হেদায়েত হোসেন ষ্টেডিয়ামে স্ব-পরিবারে হেলিক্টরে আসে। সে সময় কতিপয় মুাক্তযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের নেতা ও কিছু সংখ্যক সাংবাদিক নামধারীরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। সেই সাথে আল-মামুন বিশেষ দিবসে স্থানীয় পত্রিকায় ছবিসহ বিজ্ঞাপন প্রচারও করতেন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একেএম সিরাজুল ইসলাম ইসলাম জানান, মাত্র দুই-তিন বছরে কেসমত মন্ডল টাকার পাহাড় গড়েছেন। মাঝে মধ্যেই সে হেলিকপ্টরে রাজবাড়ী আসতেন। তার অপর দুই ভাই ক্ষুদ্র দোকান করে সংসার পরিচালনা করলেও আল-মামুন ওরয়ে কেসমত মন্ডল পুরো টাইলস দিয়ে রাজসিক ভাবে নির্মাণ করেছেন দ্বিতীয় তলা বিশিষ্ঠ ভবন। সে বাড়ীতে আসলে ওই ভবনে অনেকেই যাতায়াত করতেন।

(Visited 2,407 times, 1 visits today)