ভালবাসা দিবস ও আমাদের নৈতিকতা – লেখক : শিপন আলম –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

আসছে ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালবাসা দিবস। হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে। যদিও ভালবাসা দিবসের ইংরেজি সমার্থক শব্দ কখনই ভ্যালেন্টাইন্স ডে হতে পারে না। এর প্রতিশব্দ হলো লাভ ডে। অনেক শব্দেরই আভিধানিক অর্থ এবং ব্যবহারিক অর্থ আলাদা। যেমন ডেপুটি কমিশনারের আভিধানিক অর্থ হলো উপ-কমিশনার, এর অর্থ কখনই জেলা প্রশাসক হতে পারে না। কিন্তু বর্তমানে এর অর্থ জেলা প্রশাসক হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন এর ব্যবহারিক অর্থ ভালবাসা দিবস হিসেবেই সর্বজন বিদিত।
এখন আসি ভালবাসা দিবসটির সাথে ভ্যালেন্টাইন শব্দটি কিভাবে সম্পৃক্ত হলো তার রহস্য অন্বেষণ করতে। এর পশ্চাতে অনেকগুলো ঘটনা থাকলেও সবচেয়ে সুন্দর, অধিকাংশ পণ্ডিতগণ কর্তৃক স্বীকৃত যে মহৎ এবং করুণ কাহিনীটি রয়েছে তা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলোঃ
সময়টা তখন ২৬৯ কিংবা ২৭০ খ্রিস্টাব্দ। সারা বিশ্বে তখন রোমানদের জয়জয়কার। রোমে তখন খুবই শক্তিমান এবং অত্যাচারী সম্রাট ক্লডিয়াস এর নিষ্ঠুর শাসন চলছে। কোন একটি সমীক্ষার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন অবিবাহিত যুবকগণ বিবাহিত যুবকগণ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী। অন্যকথায় কোন একটি যুদ্ধের জন্য অধিক সৈন্যের প্রয়োজন হলে তিনি সৈন্য সংগ্রহে গেলে সেখানে বাধ সাধে যুবকদের স্ত্রীগণ। তারা কোনভাবেই তাদের স্বামীদের যুদ্ধে পাঠাতে সম্মত নয়। সম্রাট তখন রাগে ক্ষোভে অপমানে সাম্রাজ্যে বিবাহ বন্ধের ফরমান জারি করেন। তিনি ঘোষণা দেন, আজ থেকে কোনও যুবক বিয়ে করতে পারবে না। যুবকদের জন্য শুধুই যুদ্ধ। তার মতে, যুবকরা যদি বিয়ে করে তবে যুদ্ধ করবে কারা? সম্রাট ক্লডিয়াসের এ অন্যায় ফরমানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এক যুবক এবং ঐ যুবকের নামই ছিল ভ্যালেন্টাইন। তিনি ছিলেন একই সাথে খ্রিস্টান যাজক এবং চিকিৎসক। তার প্রচেষ্টায় বহু যুবক সম্রাটের আদেশ প্রত্যাখ্যান করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এতে সম্রাট তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষেপে যান। তাকে কারাগারে বন্দী করা হয়। ঐ কারাগারের জেলারের এক অন্ধ মেয়ে ছিল। ভ্যালেন্টাইনের চিকিৎসায় তার চোখ ভাল হয়ে যায়। এরপর জেলার খুশি হয়ে মেয়েকে ভ্যালেন্টাইনের সাথে গোপনে বিয়ে দেন। কিন্তু সম্রাট বিষয়টি জানার পর রাজদ্রোহের শাস্তি হিসেবে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রত্যূষে তাকে এই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। মৃত্যুর পূর্বে ভ্যালেন্টাইন তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর বরাবর একটি পত্র লিখেন যার উপর লেখা ছিল ফ্রম ইউর ভ্যালেন্টাইন (From Your Valentine)। ভালোবাসার জন্য ভ্যালেন্টাইনের এ আত্মত্যাগকে চির সমুজ্জ্বল করে রাখার প্রয়াসে তখন থেকেই এ দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
গল্পটি বলার উদ্দেশ্য হলো যে ভালবাসা দিবসের সাথে এতো বড় একটি আত্মত্যাগ, ভালবাসার শাশ্বত রূপ আর নিষ্ঠুরতার এক করুণ ইতিহাস জড়িত সেই ভালবাসার প্রকৃত শিক্ষা কি বর্তমানে আমরা যারা ভালবাসা দিবস পালন নিয়ে এতো মাতামাতি করি তারা বহন করি? বরং এখন আমরা দেখি ভালবাসায় ত্যাগের বদলে স্বার্থপরতা, উদারতার স্থলে সংকীর্ণতা, সংযমের বিপরীতে পাই উন্মাদনা। দিনের আলোতেই এদিনে পার্কে, গার্ডেনে, লেকের পাড়ে, নদীর পাড়ে, সাগর সৈকতে ভালবাসা দিবস পালনের নামে চলে অশ্লীলতা আর বেহায়াপনার মহড়া। ভালবাসার পবিত্র রূপটিকে এদিনেই সবচেয়ে অপবিত্র করা হয়। কিশোর কিশোরী, যুবক যুবতীরা এদিনে মেতে উঠে ভালবাসার নগ্ন খেলায়। বিজাতীয় সংস্কৃতির কুৎসিত রূপ এদিনেই চোখে পড়ে বেশি। রাতের বেলায় হোটেলে হোটেলে বসে মদ, জুয়ার আসর। সেই সাথে রুচিহীন গানের সাথে চলে ভাড়াটে নর্তকীদের অশ্লীল নৃত্য। পতিতাবৃত্তিকে উৎসাহিত করার পশ্চাতে বোধ করি এ দিবসটি বর্তমানে একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
পোশাক বদল করার মতই এখন চলছে গার্ল ফ্রেন্ড, বয় ফ্রেন্ড বদলানোর হিড়িক। কারো কারো জীবনের ব্রতই এখন হয়ে গেছে প্রতি বছর এ দিবসটিকে সামনে রেখে নতুন নতুন গার্ল ফ্রেন্ড তৈরি করা আর দিবস শেষে তাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া।
ভালবাসার ঐশ্বর্য চিরন্তন। ভালবাসার আবেদনও তাই শাশ্বত। ভালবাসা তাই একদিন ও এক রাতের ব্যাপার নয়। বছরের মাত্র একটি দিন ও রাত প্রেম সাগরে ডুব দিয়ে নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে নিজ চরিত্রের ওপর কালিমা লেপন করে ভালবাসার অমিয় বন্ধনকে অপবিত্র করা তাই কোন বুদ্ধিমান মানুষের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
মানব জীবনের অতি মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে নৈতিকতা। এটি জীবনের সঞ্জীবনী শক্তি। সকল ভাল কাজ, মহৎ চিন্তা, উন্নত ও সমৃদ্ধ জীবনপ্রণালী এই নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। আমার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক স্যার বলেছিলেন সুন্দর কোন কিছু সৃষ্টি করতে হলে আগে সুন্দর একটি মন তৈরি করতে হবে। উন্নত নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষের পক্ষেই সুন্দর একটি মনের অধিকারী হওয়া সম্ভব। তাই ভালবাসা দিবস পালনের উদ্দেশ্য হোক নীতি ও নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়া নয় বরং এটিকে ধারন করা।

লেখক, শিপন আলম, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 156 times, 1 visits today)