জাতিসংঘে বাংলাদেশের অ্যাসোসিয়েটস প্রোটেকশন অফিসার এখন রাজবাড়ীর ফাহমিদা করিম –


রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

রাজবাড়ীর মেয়ে ফাহমিদা করিম। ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত, ডানপিটে। স্কুলজীবনেই খেলাখুলা, শুটিংয়ে সুনাম কুড়ান। জেলা শহর থেকে এসএসসি, এইচএসসিতে স্টার মার্ক পেয়ে মেধারও প্রমাণ দেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য ভার্সিটি কোচিং করতে চলে আসেন ঢাকায়। বাবার অনুপ্রেরণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হন। কৃতিত্বের সাথে এলএলবি অনার্স করে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিন মাস পার না হতেই উপলব্ধি হয় আইন পেশার স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য। বিকল্প খুঁজতে থাকেন। হঠাৎ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থায় (টঘঐঈজ) যোগদানের ডাক পান। আইন পেশা ও ব্যারিস্টার পড়ার স্বপ্ন ত্যাগ করে জাতিসংঘের কাজ নিয়ে চলে যান হংকংয়ে। পাল্টে যায় ভাগ্য। শরণার্থী সংস্থায় বিভিন্ন দেশে সুনামের সাথে কাজ করে ফাহমিদা এখন অ্যাসোসিয়েটস প্রোটেকশন অফিসার হিসেবে আছেন বাংলাদেশ কার্যালয়ে।
তিনি ব্যারিস্টার পড়ার স্বপ্ন ত্যাগ করে আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগদান, বিভিন্ন দেশে কাজের অভিজ্ঞতার গল্প জানিয়েছেন রাইজিংবিডিকে। কথোপকথনে ছিলেন রাইজিংবিডির সুপ্রিম কোর্ট প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম।
সোনালী দিনগুলো –
বাড়ি রাজবাড়ী। আমরা তিন ভাই বোন। বাবা ব্যবসায়ী। প্রথম স্কুল ছিল ঢাকার মিশনারী স্কুল। আমার শৈশব দারুণ ছিল। ছোটবেলায় খুবই দুরন্ত প্রকৃতির ছিলাম। যেমন ধরুন, ইচ্ছে হলে রাত ১০টায় সাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এক ঘণ্টা চালিয়ে আবার ঘরে এসেছি। অনেক সময় ছেলে সেজে বের হয়েছি। মা টেনশনে দাঁড়িয়ে থাকতো মেয়ে কখন ফিরবে। আমার বাবা-মা লেখাপড়া নিয়ে কখনো জোর করতেন না। সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় লেখাপড়া করেছি। পাশাপাশি এক্সটা কারিকুলামে বেশি জোর দিতাম। আমার স্পোর্টসে খুব ইন্টারেস্ট ছিল। শুটিং করতাম। ন্যাশনাল লেভেলে শুটিং করতাম। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বিভিন্ন জেলায় গিয়েছি। পরবর্তীতে পড়ালেখার কারণে শুটিং ছেড়ে দিতে হয়। ভালো ছবিও আঁকতাম। দাদা-দাদি, মা-বাবা, ভাই বোন মিলে আমরা পারিবারিকভাবে বড় হয়েছি। রাজবাড়ি সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও আদর্শ কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসিতে স্টার মার্ক পাই। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হই।
আইন পড়ার গল্প-
ছোটবেলা থেকে বাবা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে আমাকে আইন পড়তে হবে। তখনকার দিনে তারকাদের উকিল চরিত্রে কালো গাউন পড়ে অভিনয় করতে দেখতাম। এটা খুব আমাকে অনুপ্রাণিত করতো।
টার্গেট ছিল আইন পড়ব ঢাকা ইউনিভার্সিটিতেই। বাবা অন্য কোথাও ফরমও তুলতেও দেয়নি। ২০০১ সালে মেধাতালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে চান্স পেয়ে গেলাম। মা বাবা তো ওই সময় খুশিতে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন। ওই দিনটার কথা খুব মনে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো –
বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। এর মধ্যে ড. মিজানুর রহমান স্যার অন্যতম। তখন প্রথম বর্ষে পড়ি, একদিন মিজান স্যার ডেকে বললেন তুমি কি স্বেস্বাসেবী কাজ করতে আগ্রহী। আমি বললাম, অবশ্যই করবো। প্রথম বর্ষ থেকেই স্যারের এলকোপ নামে একটা এনজিওর সাথে কাজ শুরু করি। এলকোপ বছরে প্রায় দুই হাজার শিশুকে বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে, বস্তিতে গিয়ে দৈনন্দিন আইন সম্পর্কে সচেতন করতো। এভাবে ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে কাজ শুরু।
আইন পেশায় তিন মাস –
এলএলবি শেষ হওয়ার পর এক চেম্বারে কাজ শুরু করলাম শিক্ষানবিশ হিসেবে। কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছিলাম না কোর্টে। কখনও এমনও হতো চেম্বারে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তাতেও অসুবিধা ছিল না। দেখতাম অনেক অসহায় মানুষ বিচারের আশায় ঘুরছেন, দিনের পর দিন খরচ করে যাচ্ছেন শেষ সম্বলটুকু। এগুলো আমাকে খুব পিড়া দিত। অনেক কিছু করার আছে। মেয়েদের কমনরুমে গেলে মনটা আরো খারাপ হয়ে যেত। কোথাও ভালো কিছু শোনা যেত না। শুধু হতাশার কথা আসতো। হতাশা থেকে বের হয়ে পজিটিভ কিছু করার কথা ভাবছিলাম।
আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগদান –
তখন শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ করছি। পাশাপাশি মিজান স্যারের এনজিওর সাথেও আছি। একদিন জানতে পারলাম ইউএনএইচসিআর সম্পর্কে। ইন্টার্নিশিপের আবেদন করলাম সেখানে। পাশাপাশি সিভিও দিয়ে রেখেছিলাম। হঠাৎ একদিন আমাকে ফোনে যোগাযোগ করে বলা হল, ইউএনএইচসিআরের হংকংয়ে একটা ভ্যাকেন্সি আছে। আমি আগ্রহী কি না। আমাকে একা হয়তো যেতে দিবে না এই ভেবে মানা করে দিলাম। হংকংয়ের অফারটা বাবাকে ফোন করে জানালাম। বাবা বললেন, এত বড় সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে? তুমি কি পাগল? পরে আমার সিভি শর্টলিস্টেড হল। এরপর পরীক্ষা দিলাম। শুনলাম পরীক্ষায় আমি প্রথম হয়েছি। ভাইভাতেও প্রথম। ২০০৭ সালের ৩০ এপ্রিল চলে গেলাম হংকংয়ে। এটা ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
এরপরের গল্প –
আমি হংকংয়ের উদ্দেশ্যে ওই যে প্লেনে একা উঠলাম, সেই থেকে আমার লাইফ চেঞ্জ হয়ে গেল। ওটা আমার জন্য খুব সাহসী একটা মুভ ছিল। আমি হংকংয়ে আট মাস ছিলাম। তবে সেখানে কাজ করে প্রথম অভিজ্ঞতা হল একটা ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশনের পরিবেশটা কেমন হয়। মাল্টিন্যাশনাল পিপলের সাথে কাজ করা বলতে কি বোঝায়। একটা রুমের মধ্যে আমরা ১২ জন বসতাম। এর মধ্যে কেউ পাকিস্তানি, বাংলাদেশি, ইন্ডিয়ান, শ্রীংলকান, চাইনিজ। বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা একসাথে কাজ করেছি একটা কমন উদ্দেশ্য নিয়ে। এতগুলো কালচার এক সাথে বসে কাজ করা- এটা হচ্ছে লার্নিং।
আমার পারফরমেন্স ভালো হওয়ায় বেটার পজিশন অফার করা হয়। আমার তখন মাথায় একটাই ঝোঁক। দেশে ফিরে আসতে হবে। এসে বিয়ে করতে হবে। এটা হচ্ছে প্রথম কাজ (হাসি)। তারপর ডিসেম্বরে আমি বাংলাদেশে চলে আসি। দেশে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলএমে ভর্তি হলাম। কিছুদিন পর ইউএনএইচসিআর’র ঢাকা অফিসে ফুলটাইম জব শুরু করি। ফুলটাইম জবের কারণে এলএলএম ছেড়ে দিতে হল। দুই বছর ঢাকা অফিসে কাজ করার পর ২০১০ সালে আমি ইথিওপিয়াতে চলে গেলাম। জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরিতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে। ইথিওপিয়াতে এক বছরের কিছু বেশি সময় কাজ করার পরে ২০১১ সালে দেশে ফিরে আসি। ২০১১ সালের আগস্ট থেকে ঢাকা অফিসে আবার কাজ শুরু করি। ন্যাশনাল অফিসার হিসেবে। সেই থেকে এখনও ইউএনএইচআরে কাজ করে যাচ্ছি। অ্যাসোসিয়েটস প্রোটেকশন অফিসারের দায়িত্ব পালন করছি।
প্রেম, ভালোবাসা ও বিয়ে –
আমার স্বামী কাজী মোরশেদ আলম। এইচএসসি পাস করে রাজবাড়ী থেকে এসে ঢাকায় কোচিংয়ে ভর্তি হই। তখন থেকেই মোরশেদের সাথে পরিচয়। ও টাঙ্গাইলের ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করে একই কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিল।


তারপর আমি আইন বিভাগে ও মোরশেদ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশুনা করি। তখন পর্যন্ত আমরা জাস্ট ফেন্ড্র ছিলাম। মোরশেদ একটু লাজুক টাইপের ছিল। ২০০২ সালে আমার জন্মদিনে ওর কিছু বন্ধুকে দিয়ে কার্ড আর একটা ফুলের তোড়া পাঠাল। ওইদিন বলতে পারেন আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের একসাথে চলার গল্প শুরু। তখনই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থেকে আমরা ডমেস্টিক সম্পর্কে আসি (হাসি)। ডিপার্টমেন্টের সবাই আমাদের সম্পর্কের কথা জানতো। ২০০৮ সালের মার্চ মাসে বিয়ের মাধ্যমে আমাদের ভালোবাসার সফল পরিণতি লাভ করে।
মোরশেদ বর্তমানে ইউকেভিত্তিক এনজিও প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের ফান্ড রাইজিং সেক্টরের ম্যানেজার। এর আগে ও ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালে লাইবেরিয়ায়, ওয়াটার এইডে কাজ করেছে। এছাড়া ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে ওর কাজের অভিজ্ঞতা অনেক। আমাদের দুই সন্তান। এক ছেলে এক মেয়ে।
ইউএনএইচসিআরে যা নিয়ে কাজ –
বিশ্বের শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করি। এটা জাতিসংঘের গ্লোবাল ম্যান্ডেট। বিশ্বে এ মুহূর্তে ৭২.৮ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত। তার মধ্যে ২৫ মিলিয়ন শরণার্থী আর ১০ মিলিয়ন রাষ্ট্রহীন। আমরা তাদের জীবন নিয়ে চিন্তা করি। তারা সবচেয়ে অসহায়। তারা নিজের রাষ্ট্রের কাছে সুরক্ষা না পেয়ে বাধ্য হয়ে আরেক রাষ্ট্রে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের সুরক্ষার সুযোগ নিশ্চিত ও প্রশস্ত করা নিয়ে কাজ করি। এখানে না ঢুকলে আমার বোঝার ক্ষমতাই ছিল না আসলে বিষয়টা কি। আমি খুবই হ্যাপী যে আমি এই সেক্টরে কাজ করি।
আইন পড়ে আইনজীবী হওয়ার ধারণা পাল্টাতে হবে –
আমি তো বলব, আমি যে আইন পড়েছি এটা আমার লাইফের বেস্ট ডিসিশন ছিল। আইন পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, আমার জগৎ শুধু প্র্যাকটিসে সীমাবদ্ধ নয়। অনেকেই মনে করেন, আইন পড়াশোনা মানে প্র্যাকটিসে যাব অথবা আমি বিচারক হব। আসলে মোটেই তা নয়। আইন পড়লে আসলে কাজের জায়গা অনেক বেশি। যেমন আমি এখন কি করছি। আমার প্রতিদিনের কাজে কিন্তু আইন লাগছে। আমি একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। আমি বলব আইন পড়ুয়াদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের সুযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের সুযোগ কীভাবে –
যদি কারো লক্ষ্য থাকে আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করতে, তাহলে তাকে সেভাবে প্রস্তুত হতে হবে। আমি মাঝে মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়াতে যাই। ওখানে স্টুডেন্টরা প্রায়ই জিঞ্জেস করে কীভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের সুযোগ পাব। আমি বলব, আমার নিজের ক্ষেত্রে আমি যে প্রথম বর্ষ থেকেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে এসেছি। এটা খুব কাজে দিয়েছিল। যেকোনো জায়গায় ঢুকতে গেলে চাইবে অভিজ্ঞতা ওই অভিজ্ঞতার জায়গাটা তৈরি করতে হবে। শুরুতে যত জায়গা তৈরি হবে ততই রাস্তা প্রশ্বস্ত হবে। সেটা মনে হয় স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই শুরু করা উচিত। আমার চাকরি জীবনে প্রথম বেতন ছিল তিনশ টাকা। ছোটভাবেই কাজ শুরু করতে হয়।
আরেকটি পরামর্শ, আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করতে গেলে অবশ্যই ইংরেজি ভাষার দক্ষতা লাগবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
তরুণদের জন্য ম্যাসেজ –
একটা ম্যাসেজ দিতে চাই। আন্তর্জাতিক সংস্থাতে ঢুকতে বিশেষ করে জাতিসংঘে আমি সবাইকে ইনকারেজ করবো। জাতিসংঘে কাজ করা শুধু কিন্তু নিজের জন্য চাকরি করা না। ‘ুড়ঁ নবপড়সব ধ মষড়নধষ পরঃরুবহ’। একইসাথে আপনি নিজের দেশকেও প্রতিনিধিত্ব করছেন। বর্তমানে খুব কমসংখ্যক নারী পাবেন যারা জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ে আছে। এজন্য আমি মনে করি আমাদের দেশের মেয়েদের আরো অনেক এগিয়ে আসতে হবে। বাঁধা বিপত্তি তো থাকবেই, সেগুলো পার করে নিজেকে যোগ্য জায়গায় পৌঁছাতে হবে।

(Visited 675 times, 1 visits today)