এসপি’র চেষ্টায় পাল্টে গেছে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর চিত্রপট, চক্রের হোতারা আত্নগোপনে –

জাহাঙ্গীর হোসেন, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

দেশের বৃহত্তর পতিতা পল্লীটির অবস্থান রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায়। পল্লীটি দেশের অন্যতম ক্রাইম জোন হিসেবেও পরিচিত। এখানে যৌনকর্মী ও আগতদের নির্যাতন যেন নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার। তারা ছিলো শক্তিশালী চক্রের হাতে জিম্মি। তবে পাল্টেছে এখন সে চিত্র। পুলিশি তৎপরতায় দালাল, চাঁদাবাজ, নারী পাচারকারী এবং অসহায় যৌনকর্মী ও আগতদের নির্যাতনকারী চক্রের হোতারা এখন কোনঠাসা। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা রয়েছেন আতœগোপনে। আর এই শৃঙ্খলা আনতে রাজবাড়ীর নবাগত পুলিশ সুপার দেননি ছাড়। হোতাদের সাথে সম্পর্ক ও মাদক বিক্রির দায়ে এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার পাশাপাশি চার পুলিশ কর্মকর্তাকে করেছেন ক্লোজ। সেই সাথে পল্লীর চার পাশে থাকা ৭টি দরোজা করেছেন তালাবদ্ধ এবং মূল গেটের সামনে বসিয়েছেন পুলিশ বক্স। এতে করে পল্লীর বাসিন্দা হয়েছেন আনন্দিত। তারা এখন অপতৎপরতাকারীদের নির্যাতন থেকে হয়েছেন মুক্ত। তারা বলেন, আগামীতে আর যেন কোন নির্যাতন নেমে না আসে, জেলা পুলিশ এভাবেই তাদের পাশে থাকবে।
সংশ্লিষ্ঠদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, দৌলতদিয়া পতিতাপল্লী কেন্দ্রীক গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী চক্র। যে চক্রের সদস্যরা ওই পল্লীতে ক্যাসিনো চালানো, নারীদের অশ্লীল নৃত্য পরিচালনা করা, মাদক দ্রব্যের ব্যবসা পরিচালনা করা, নারী পাচার, কিশোরী ও নারীদের জোরপূর্বক আটকে রেখে দেহ ব্যবসা করানো, কথিত বাড়ীওয়ালীদের পক্ষ নিয়ে যৌনকর্মীদের মানসিক ও শাররীক নির্যাতন করা এবং পতিতাপল্লীতে প্রবেশকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৪০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে আসছিলো। বাঁধা দানকারী বলতেও ছিলো না কেউ। আর বাঁধা দিলে ঘটতো উল্টো ঘটনা, বাঁধাদানকারীকেই বিভিন্ন কৌশলে মারপিট ও নানা রকম নির্যাতন করার পাশাপাশি তুলে দেয়া হতো পুলিশের হাতে। ওই সব চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে কোন আইনানুগ পদক্ষেপই গ্রহণকরা সম্ভব হচ্ছিলনা। এমনি এক টালমাটাল অবস্থার পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে দালাল, চাঁদার টাকা উত্তোলনকারী, নারী পাচারকারীদের করা হয়েছে বিতারিত। এক কেন্দ্রীক করা হয়েছে পল্লীর প্রবেশ পথ। আর প্রধান প্রবেশ পথের বাইরে বসানো হয়েছে পুলিশ বক্স। যেখানে সার্বক্ষণিক পোশাক পরিহিত পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করছে। সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য পল্লীর ভেতরে প্রবেশও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পতিতাপল্লীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে যৌনকর্মীদের নির্যাতন ছিলো নিত্যদিন। কারও সাহস ছিলোনা চক্রের সদস্য ও কথিত কিছু বাড়ীওয়ালীর উপর কথা বলার। চক্রের সদস্য ও কথিত কিছু বাড়ীওয়ালীরা যেভাবে বলতেন তাদের সেভাবে চলতে হতো। অর্থ উপার্যনের সিংহভাগই চক্রের সদস্য ও কথিত বাড়ীওয়ালী বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতো। বাঁধা দিলেই পোহাতে হতো অমানবিক নির্যাতন। তবে বর্তমানে তারা আছেন অনেকটাই শান্তিতে। সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধ হয়েছে নির্যাতন। কেউ আর তাদেরকে হয়রানি করতে পারছে না। যে কারণে তারা আনন্দিত।
দৌলতদিয়ার একাধিক ব্যক্তির সাথে আলাপ করে জানাগেছে, সদ্য পদ থেকে বহিস্কৃত রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মন্ডল এবং গোয়ালন্দ উপজেলার যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মন্ডল ও তাদের সহযোগিদের একছত্র আধিপদ্য ছিলো দৌলতদিয়ায় এলাকায়। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন গত ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই নির্বাচনে গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মন্ডল চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দীতা করে পরাজিত হন। এর পর থেকেই নুরুল ইসলাম মন্ডল এবং তার সহযোগিরা রয়েছেন অনেকটাই আতœগোপনে। অপরদিকে দেবগ্রাম ইউনিয়নের নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষে একজন নিহত হয়। ওই হত্যার ঘটনার প্রধান আসামি করা হয় গোয়ালন্দ উপজেলার যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম মন্ডলকে। সে মামলার আসামি হিসেবে নজরুল ইসলাম মন্ডল এখনো রয়েছেন কারাগারে। তার গ্রুপের লোকজনও রয়েছেন আত্নগোপনে। যে কারণে বর্তমানে দুষ্টু চক্রের উপদ্রব নেই বললেই চলে। যার ফলে ওই এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন জেলা পুলিশের হাতে। রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান পিপিএম -এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ওই এলাকায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজী, মাদক নিয়ন্ত্রকসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যদের বিভিন্ন মামলায় করা হয়েছে গ্রেপ্তার, দেয়া হয়েছে একের পর এক মামলা। একই সেই সাথে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের এবং চার জন পুলিশ কর্মকর্তাকে পল্লীর হোতাদের সাথে সম্পর্ক রাখা ও অনৈতিক ভাবে অর্থ আদায়সহ নানা রকম অপরাধে পুলিশ লাইনে করা হয়েছে ক্লোজ। সেই সাথে সাম্প্রতিক সময়ে গোয়ালন্দ থানার ওসি রবিউল ইসলামকেও সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গোয়ালন্দ থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুল্লাহ আল তায়েবীর জানান, রাজবাড়ীর পুলিশ সুপারের সাহসী পদক্ষেপের কারণে দৌলতদিয়া পতিতা পল্লীর পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন থানা পুলিশের হাতে চলে এসেছে। আর পুলিশি নিয়ন্ত্রল প্রতিষ্ঠা হবার কারণে পতিতা পল্লীর অমানবিক নির্যাতনের স্বীকার যৌনকর্মীরা এখন মুক্ত। তারা স্বাধীনমত করছেন চলা ফেরা। যে পল্লী কেন্দ্রীক প্রায় নিয়মিত ছিলো হত্যা, যৌনকর্মী ও আহতদের উপর নির্যাতন, চাঁদাবাজী, লুন্ঠনের মত হাজারো অন্যায় কর্মকান্ড। সেখানে বহিরাগত চক্রের সদস্যদের এখন এলাকা ছাড়া। যারা পুলিশের কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের অনেককেই করা হয়েছে গ্রেপ্তার। তিনি আরো বলেন, এমন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ এতোপূর্বে কখনোই কোন পুলিশ সুপার গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে পুলিশের এই কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখা সম্ভব হলে দৌলতদিয়া পতিতাপল্লী কেন্দ্রিক আর কোন চক্র দাঁড়ানোর সাহস পাবে না।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান পিপিএম বলেন, তিনি ছিলেন রংপুর জেলার পুলিশ সুপার। সেখান থেকে ১৭ জুলাই তিনি রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার হিসেবে বদলী হয়ে আসেন। রাজবাড়ী যোগদানের পর পরই তিনি বুঝতে পারেন। দৌলতদিয়া পতিতাপল্লীতে যৌনকর্মীদের উপর কিভাবে চালানো হচ্ছে নির্যাতন। পতিতা পল্লীতে নারীরা উপার্যনের অন্য কোন বৈধ পেশা না পেয়ে আশ্রয় নেন। আর অবহেলিত অসহায় ওই সব নারীদের কষ্টে উপার্জিত অর্থে ভাগ বসায় শকুনেরা। ফলে তিনি নিতে শুরু করেন নানা ধরণের পদক্ষেপ। যার অংশ হিসেবে দৌলতদিয়া ইউপি নির্বাচনের ডামাডোলকে তিনি বেছে নেন এবং নির্বাচনের পর দিনই পুলিশের তত্ববধানে নিতে সক্ষম হন এ যৌন পল্লী। এখন পল্লীর ভেতরে সৃষ্টি হচ্ছে না কোন অরাজক পরিবেশ। মাস্তান, চাঁদাবাজ, আর নির্যাতনকারী মুক্ত এখন পুরো পল্লী। মুলত দুষ্টু চক্রের সদস্যরা পল্লীর ভেতর অপকর্ম চালিয়ে চার পাশে থাকা গেট গুলো দিয়ে নিবিঘেœ পালিয়ে যেতো। ফলে শুরুতেই তিনি প্রধান গেট ছাড়া অন্যান্য ৭টি গেটে দিয়েছেন তালা। প্রবেশকারীদের কাছ থেকে নেয়া হতো জনপ্রতি ৪০টাকা চাঁদা। তাও করেছেন বন্ধ। এর পর ক্যাসিনো চালানো, নারীদের অশ্লীল নৃত্য পরিচালনা করা, মাদক দ্রব্যের ব্যবসা পরিচালনা করা, নারী পাচার, কিশোরী ও নারীদের জোরপূর্বক আটকে রেখে দেহ ব্যবসা করানো, কথিত বাড়ীওয়ালীদের পক্ষ নিয়ে যৌনকর্মীদের মানসিক ও শাররীক নির্যাতন বন্ধ করেছেন। প্রধান গেটে পোশাক পরিহিত পুলিশ সদস্যদের দিয়ে করেছেন পুলিশ বক্স। এখন তিনি পল্লীর ভেতরে হেলফ ডেক্স করার পরিকল্পনা করেছেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নারী পুলিশ সদস্যদের দিয়ে ওই হেলফ ডেক্স পরিচালনায় করা হবে। আর হেলফ ডেক্স হলে বাড়ীওয়ালী কর্তৃক নারী নির্যাতন বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন কোন কিশোরী ও নারীকে জোরপূর্বক আটকে রেখে দেহ ব্যবসা করানোর প্রথাও বিলুপ্ত হবে। আগতরাও যে কোন অভিযোগের সুরাহা পাবেন। তিনি আসা করছেন, এই সব পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে ক্রাইম জোন হিসেবে পরিচিত দৌলতদিয়া পতিতা পল্লীর পরিবেশ থাকবে সুন্দর।

(Visited 5,052 times, 1 visits today)