রাজবাড়ীর শাইলকাঠি গ্রামের জমিতে ইটভাটা করার উপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

রাজবাড়ী সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের শাইলকাঠি গ্রামের জমিতে ইটভাটা করার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সাথে ওই জমি এক না তিন ফসলি তা তদন্ত করে আগামী ১২ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দিতে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসককে নির্দেশও প্রদান করেছে। গত মঙ্গলবার দুপুরে বিচারক নাজমুল হাসান এবং বিচারক কামরুল কাদের-এর আদালত এ নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন রীট কারীর আইনজীবিরা।
রীটকারী আইনজীবি মশিউর রহমান জানান, গত ১২ নভেম্বর রাজবাড়ী সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের শাইলকাঠি গ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিম শেখ হাইকোর্টে রীট নং-১২২৩১ দাখিল করেন। যার শুনানী ছিলো গতকাল। এ দিন গত ২১ নভেম্বর দৈনিক কালের কণ্ঠের ১৯ পাতায় “কর্তার ভুলে কৃষির ক্ষতি রাজবাড়ীতে তিন ফসলি জমিকে অকৃষি হিসেবে ছাড়পত্র, গড়ে উঠছে ইটভাটা” শিরোনামে নির্মানাধিন কেআরডি ব্রিকস ভাটার প্রকাশিত নিউজের পেপার কার্টিংসহ অন্যান্য প্রমানাদিও উপস্থাপন করা হয়। যার ভিত্তিতে হাইকোর্টের বিচারক দ্বয় এ নির্দেশ প্রদান করেন।
জানাগেছে, রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. বাহাউদ্দিন শেখ তিনফসলি জমিকে অনাবাদি দেখিয়ে ছাড়পত্র দিয়েছেন। এখন সেই জমিতে গড়ে উঠছে একটি ইটভাটা। অথচ পাশেই জমির ধান পেকে ক্রমে সোনালি রং ধারণ করছে।
কেআরডি ব্রিকস স্থাপন করা হচ্ছে সুলতানপুর ইউনিয়নের শাইলকাঠি গ্রামের তিনফসলি মাঠে। যদিও ভাটা মালিকরা মানছেন না পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা। স্থানীয়দের দাবি, কৃষি কর্মকর্তা ছাড়পত্র দেওয়ার কারণে ভাটা নির্মাণকারী উৎসাহিত হয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ। মাঠের বেশির ভাগ অংশে বাতাসে নাচছে আধাপাকা ধান। তার পরও মাঠের একপাশে স্থাপন করা হচ্ছে ভাটা। আর এই ভাটায় তৈরি করা হচ্ছে ইট পোড়ানোর চিমনি। সেই সঙ্গে পুরোদমে তৈরি করা হচ্ছে মাটির ইট। যা তৈরির পর রোদেও শুকানো হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানায়, এই মাঠে প্রায় সারা বছর বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ হয়। অথচ কোনো রকম আইন না মেনে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ওই ফসলি জমিকে অকৃষি উল্লেখ করে ইটভাটা তৈরি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম শেখ জানান, ভাটার এক প্লট পরেই তাঁর এক একর ১০ শতাংশ জমি রয়েছে। সে জমিতে তিনি প্রতিবছর তিনটি ফসল আবাদ করছেন। ফলে তাঁরা এখানে ভাটা তৈরি না করতে অনুরোধ করলেও শুনছে না প্রভাবশালীরা। এখানে ভাটা স্থাপন করা হলে তাঁর জমিসহ পাশের শত শত একর জমির উর্বরতাশক্তি হ্রাস পাবে। যে কারণে তাঁরা পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে এই ভাটা স্থাপন না করার জন্য অভিযোগ করেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে এই ইটভাটা তৈরি না করতে বলো হয়েছে। তবে কারো কথাই শুনছে না ভাটা তৈরিকারীরা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তিনি এই মাঠে তিনফসলি জমি থাকার পরও তা অনাবাদি দেখিয়ে অর্থের বিনিময়ে ছাড়পত্র দিয়েছেন। ফলে ভাটা স্থাপনকারীরা প্রাথমিকভাবে ওই ছাড়পত্র পেয়ে উৎসাহিত হয়েছেন। যদি কৃষি কর্মকর্তা ছাড়পত্র না দিতেন তাহলে এখানে আর ভাটা স্থাপন করা হতো না। সেই সঙ্গ আমাদের ফসল উৎপাদন নিয়ে চিন্তার মধ্যে পড়তে হতো না।’
কেআরডি ব্রিকসের পরিচালক জিয়াউর রহমান শেখ জানান, তাঁরা এরই মধ্যে ইটভাটা নির্মাণের লক্ষ্যে সদর উপজেলা কৃষি অফিসের ছাড়পত্র পেয়েছেন। তবে এখনো পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন পাননি। কৃষিজমিকে অকৃষি উল্লেখ করে কৃষি কর্মকর্তা যে ছাড়পত্র দিয়েছেন তাতে কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘না, কোনো টাকা দিতে হয়নি। দুই একর তিন শতাংশ জমি সম্প্রতি চাষাবাদ করা হচ্ছিল না। এ কারণে ১০ জন মিলে সেখানে ইটভাটা তৈরি করছি। আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে ভাটা স্থাপনের জন্য আবেদন করেছি। এরই মধ্যে পরিবেশ অধিপ্তরের লোকজন ভাটাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে এখনো অনুমোদন পাইনি।’
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. বাহাউদ্দিন শেখ বলেন, ‘কোনো অর্থের বিনিময়ে নয়। সরজমিনে দেখে ওই জমি অকৃষি উল্লেখ করে ছাড়পত্র দিয়েছি।’
পরিবেশ অধিদপ্তর ফরিদপুর কার্যালয়ে উপপরিচালক আসাদুর রহমান জানান, কেআরডি ব্রিকসের পরিচালক জিয়াউর রহমান শেখকে এরই মধ্যে ভাটা স্থাপন না করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে এই কার্যক্রম বন্ধ করা না হলে জেল ও জরিমানা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ শাখা-১-এর জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আফরোজা বেগম পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, সুলতানপুরের শাইলকাঠিতে জিয়া শেখ, মোজা শেখ, সাঈদ মোল্লাসহ অন্য লোকজন সরকারের নিয়মনীতি ভঙ্গ করে তিনফসলি কৃষিজমি নষ্ট করে বেআইনিভাবে ইটভাটা স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রণালয়কে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

(Visited 357 times, 1 visits today)