১৪ দিনে রাজবাড়ীতে ২৬৭ জেলের দন্ড ও ৬৬ মন মাছ জব্দ –

রুবেলুর রহমান, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম : 

চলমান ইলিশ রক্ষা অভিযানের ১৪ দিনে রাজবাড়ীতে ২৬৭ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল-জরিমানা করা হলেও ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে জীবিকার তাগিদে সরকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকারে রাজবাড়ীতে নদীতে নামছে জেলেরা।
অভিযানে আজ সকাল পর্যন্ত ২৬৭ জেলে আটকের পাশাপাশি ২ হাজার ৬৪০ কেজি (৬৬)মন মাছ, ১২ লক্ষ ৮৫ মিটার জাল ও ৪টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। গত সোমবার রাতে অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকৃত প্রত্যেক জেলেকে ৯দিন করে করাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এ অভিযানে ২৫ কেজি মাছ ও ১ লক্ষ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। পড়ে জব্দকৃত মাছ এতিমখানা ও দুঃস্থদের মাঝে বিতরণ এবং জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে মৎস্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একটি সঙ্গবদ্ধ চক্রের সহযোগীতায় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও আইন শৃংঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে দিনে-দুপুরে জেলায় বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর বিভিন্ন অংশে ছোট ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে মাছ ধরছে জেলেরা। প্রতিটি নৌকায় ২ থেকে ৪ জন করে জেলে মাছ ধরায় ব্যাস্ত থাকে এবং আইন শৃংঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা অভিযানে যাবার আগেই জেলেরা সংবাদ পেয়ে যায় এবং তাৎক্ষনিক তাদের জাল গুটিয়ে নৌকা নিয়ে চলে যায় নিরাপদ স্থানে।
এছাড়া রাতেও নদীতে নামেন জেলেরা। ইলিশের প্রজনন মৌমুম হওয়ায় অল্প সময়ে জেলের অনেক মাছ পান। সেই মাছ নদীর পারে আসা ক্রেতাদের কাছে অল্প দামে বিক্রি করা হয়। বড় মাছ সাড়ে ৪শ থেকে সাড়ে ৫শ এবং ছোট মাছ আড়াইশ থেকে ৪শ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া জেলেদের সহযোগীতায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা মাছ নিয়ে বিভিন্ন এলাকার বাড়ীতে রেখে বিক্রি করছেন বলে জানাগেছে।
এদিকে নদীতে প্রশাসনের অভিযান চলমান থাকলেও এরমধ্যেই নদীতে নামছেন জেলেরা। একদিকে চলে প্রশাসনের অভিযান অন্যদিকে চলে জেলেদের মাছ ধরা। অভিযানের সময়ে প্রতিবছর জেলার বিভিন্ন গ্রামে রাত ও ভোরে মাথায় ও ভ্যানে করে মাছ বিক্রি করতে দেখা গেলেও এবার তেমনটি চোখে পড়ছে না। তবে নদীর পারে মিলছে মাছ । অনেকে পালিয়ে পালিয়ে সেখান থেকে মাছ কিনছেন।
জানাগেছে, রাজবাড়ীর পাঁচ উপজেলার চারটি পদ্মা নদীর কোল ঘেসা এবং পাংশা থেকে দৌলতদিয়া পর্যন্ত ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী রয়েছে জেলার অংশে। প্রতিদিন জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, জেলা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগ, নৌ পুলিশ, ২০ আনসার ব্যাটালিয়ানের সদস্যরা ভোর রাত থেকে সকাল এবং বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন অংশে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে মাছ, জাল, নৌকা জব্দসহ জেলেদের আটক করা হয়। পরবর্তীতে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেলেদের বিভিন্ন মেয়াদে জেল ও জরিমানা এবং জব্দকৃত জাল পুড়িয়ে ধ্বংসের পাশাপাশি মাছ গুলো বিভিন্ন এতিমখানা ও দুঃস্থ-গরিবদের মাঝে বিতরণ করা হয়। কালীতলা, নয়নসুখ, অন্তারমোড়, দেবগ্রাম, কাওয়ালজানিসহ বিভিন্নস্থানে জেলে ও ক্রেতাদের অভয়াশ্রুম বলে অনেকে মনে করেন। এসব স্থানে ক্রেতা-বিক্রেতারাও অনেক সময় ভির জমায়। এছাড়া গ্রাম অঞ্চলে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের দেখা মিলছে মাঝে মধ্যে। পরিবার পরিজন নিয়ে ভাল থাকতে জেলেরা মাছ ধরেছেন এবং প্রশাসনের ভয়ে মাছ বিক্রি করছেন কম দামে।
জেলা মৎস্য বিভাগ সুত্রে জানাগেছে, ৯ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত ১৪ দিনে ২৬৭ জন জেলেকে আটকের পর ২৪৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল ও ১৯ জনকে বিভিন্ন অংকের জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমান আদালত। অভিযানে ২ হাজার ৬৪০ কেজি ইলিশ মাছ, ১২ লক্ষ ৮৫ হাজার মিটার জাল ও ৪ টি নৌকা জব্দ করা হয়। এ সময় আটক ১৯ জেলের থেকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং জব্দকৃত ৪ টি নৌকা ৬৫ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়। এছাড়া জব্দকৃত জাল আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস ও মাছ গুলো বিভিন্ন এতিমখানা ও দুঃস্থদের মাঝে বিতরণ করা হয়। আটকৃতদের মধ্যে সদরে ১৪২ জন, পাংশায় ১৪ জন, কালুখালীতে ২৮ ও গোয়ালন্দে ৬৪ জন।
মাছ ক্রেতারা জানান, জেলেদের সাথে যোগাযোগ করে তারা মাছ কিনছেন। এছাড়া অনেক জেলে ও মৌসুমী ব্যবসয়ীরা তাদের বাড়ী গিয়ে মাছ দিয়ে আসে। এখন দাম কম, তাই কিনে রাখছেন। অভিযানের পরে দাম বেড়ে গেলে তাদের মত অনেকের দাম দিয়ে ইলিশ কিনতে পারবে না।
জেলা মৎস্য অফিসার মোহাঃ মজিনুর রহমান জানান, জেলায় ৯ হাজার ১১৯ জন নিবন্ধিত জেলে থাকলেও ইলিশ ধারার সাথে সম্পৃক্ত আছে ৪ হাজার ৬৪০ জন। যাদের প্রত্যেককে অভিযানের শুরুতে ২০ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। আগামীতে ৩০ কেজি করে চাল জেলেরা পায় সে বিষয়ে প্রস্তাবনা দেবেন। ইলিশ রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন। অভিযানে তার দপ্তরসহ জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আসনার ব্যাটালিয়ান, নৌপুলিশ সহযোগীতা করছেন। তিনিও জেনেছেন অভিযানে যাবার আগেই জেলেরা জেনে যায়। একটি চক্র তার অফিস ও গোদারবাজার এলাকায় তাদের উপর নজর রাখে। যখন নদীতে অভিযানে যান, তখন তারা তাদের সতর্ক করে দেন। তবে তার অফিসের কারও জেলেদের সাথে সম্পৃক্ততা নাই। অনেকে চুরি করে বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে মাছ বিক্রি করেছেন বলে জেনেছেন। মাছ বিক্রির বিষয়ে কাউকে ধরতে পারলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম জানান, ইলিশ রক্ষায় নদীতে জেলা প্রশাসান নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে জেল-জরিমানা করছেন। অভিযানের শুরুতেই জেলেদের চাল বিতরণ করা হয়েছে। সে সময় জেলেদের বুঝানো ও সচেতন করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কেন তারা নদীতে নামছে বুঝতে পারছি না। তবে এ ২২ দিন জেলেরা ইলিশ ধরা বন্ধ রাখলে তাদের জনই ভাল। কারণ মাছ গুলো ডিম দিলে নদীতে প্রচুর মাছ হবে এবং জেলেরা আগামীতে বেশি ও বড় বড় মাছ পাবে। এতে তারাই তখন আর্থিক ভাবে লাভবান হবে। সে জন্য এখন তাদের দেশ ও জাতির স্বার্থে মাছ ধরা বন্ধ রাখা উচিত। তবে গত কত কয়েক বছরের তুলনায় এবছর রাজবাড়ীর নদীর পার ও গ্রাম গুলোতে মাছ বিক্রি হচ্ছে এমন সংবাদ তেমন শোনা যাচ্ছে না। মাছ বিক্রি হচ্ছে এমন সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষনিক জেলা প্রশাসনের লোকজনকে পাঠানো হয়। কিন্তু দুরুত্ব ও সময়ে কারণে ওই স্থানে গিয়ে তাদের পাওয়া যায় না। অভিযোগের সত্যতা পেলে জেলা প্রশাসনের দিক থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(Visited 348 times, 1 visits today)