রাজবাড়ীতে স্কুলছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামিসহ গ্রেপ্তার ২ –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

বোরকা পরে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দশম শ্রেণীতে পড়–য়া এক স্কুলছাত্রী (১৬)-এর হাত, পা ও মুখ বেঁধে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই অভিযোগে গত শনিবার সকালে ঘটনার স্বীকার ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে সদর উপজেলার পাচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর মিজির স্ত্রী শিল্পী বেগম (৪০) এবং তার সহযোগি অজ্ঞাত নামা আরো চার জন আসামি করে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
রাজবাড়ী থানার ওসি স্বপন কুমার মজুমদার বলেন, ইতোমধ্যেই প্রধান আসামি শিল্পী বেগম এবং তার এক সহযোগি সেতু (২০) কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে, আজ রবিবার দুপুরে থানার কার্যালয়ে এক ব্রিফিং-এ রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার আসমা সিদ্দিকা মিলি বিপিএম, পিপিএম বলেন, বিষয়টি অত্যান্ত গুরুত্বের সাথে তারা নিয়েছেন। যে কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে তারা প্রধান আসামিসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। ইতোমধ্যেই আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন। সেই সাথে অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।


মামলার বাদী ওই ছাত্রীর বাবা জানান, গত ১২ এপ্রিল দুপুরে তার মেয়ে সদর উপজেলার খানখানাপুর থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির রিকশায় নিজ বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তার রিকশাটি পাশ^বর্তী দেওয়ানপাড়া মোড়ে পৌছলে অজ্ঞাত নামা চার জন ব্যক্তি তার গতিরোধ করে। সেই সাথে ওই ব্যক্তিরা মেয়েকে টেনে হেঁচড়ে পাশের জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে চাকুর ভয় ও মারপিট করে জোরপূর্বক তার অশ্লিল ছবি মোবাইল ফোনে ধারণ করে এবং ওই ছবি আসামি শিল্পীর কাছে পৌছে যায়। পরবর্তীতে আসামি শিল্পী বেগম ওই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে তার মেয়ের কাছে দুই লাখ টাকা দাবী করে। গত ৩ জুন দুপুরে শিল্পী বেগম ও তার আরো দুই জন সহযোগি বসত বাড়ীতে আসে এবং জানালা দিয়ে মেয়েকে ডেকে ঘরের বাইরে আনে। সেই সাথে অশ্লিল ছবি পুনরায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে মেয়েকে তার এক ছেলে বন্ধু (২২)-এর বাড়ীতে নিয়ে যায় এবং ওই ছেলে বন্ধু’র কাছে আসামিরা আড়াই লাখ টাকা দাবী করে মেয়েকে ওই বাড়ীতে রেখে চলে যায়। পরবর্তীতে ওই ছেলে বন্ধু’র পরিবারের সদস্যরা মেয়েকে আসামি শিল্পীর বাড়ীতে নিয়ে আসে এবং তাদের (মেয়ের) পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি অবহিত করে। ওই সময়ই তিনি গিয়ে শিল্পীর বাড়ী থেকে মেয়েকে বাড়ীতে নিয়ে আসেন। গত ৫ জুন সকাল ১০টার দিকে তার মেয়ে বাড়ীর পাশের পুকুরে গোসল করে ফিরছিলো। সে সময় অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তার মেয়ের মাথায় গাবগাছের ডাল দিয়ে আঘাত করে। এতে মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে রাস্তার পাশে পরে যায়। ওই সময়ই মেয়েকে উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এ ঘটনার পর দিন গত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তার মেয়ে নিজ বাড়ীর বারান্দায় বসে জাম খাচ্ছিল। সে সময় ওই বাড়ীতে অজ্ঞাত নামা বোরকা পরিহিত চার জন ব্যক্তি প্রবেশ করে। তারা মেয়ের মুখ চেপে ধরে বাড়ীর পেছনে থাকা একটি পাট ক্ষেতের মধ্যে নিয়ে যায়। তারা মেয়ের ওড়না দিয়ে তার হাত, পা ও মুখ বেঁধে খুন করার উদ্দেশ্যে শরীরের মাঝামাঝি স্থানে থাকা স্যালোয়ার কামিজে ম্যাচ কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে শরীরর সামনের অংশে সামান্য আকাড়ে পোড়া জখম হয়। মেয়ে তখন জীবন রক্ষার্থে মাটিতে গড়াগড়ি করে। মেয়ের গোংড়ানির শব্দে তার স্ত্রীসহ প্রতিবেশিরা এগিয়ে যায় এবং তার শরীরের আগুন নেভায়। পরে তাকে স্থানীয় চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।
প্রতিবেশীরা জানান, ওই মেয়ে ও তার মা’য়ের চিৎকার শুনে তারা এগিয়ে আসেন এবং মেয়েটিকে উদ্ধার করেন। তারা আরো বলেন, শিল্পী বেগম ভালো মানুষ নন। তাকে এলাকার মানুষ ভয় পায়। দিন রাত তার কাছে নানা ধরণের মানুষ আসে। যে কারণে তাকে কেউ কিছু বলার সাহস পায়না।
সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজী আলমগীর জানান, শিল্পী বেগমের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ ভালো নয়। তাছাড়া যে ঘটনা ঘটনানো হয়েছে, তা একটি নেক্কার জনক ঘটনা। অল্পের জন্য মেয়েটা প্রাণে বেঁচেছে। তাই এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাতে এমন ঘটনা আর না ঘাটে।
এদিকে, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়–য়া মেয়েটির ভাই তার ফেসবুকে মেয়েটির সালোয়ার কামিজে আগুন দেবার ছবি দিয়ে প্রচার করে। ফলে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত হয়। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় মেয়েটির ভাইয়ের সাথে। তিনি বলেন, প্রধান আসামি শিল্পী বেগম একজন খারাপ মহিলা। এলাকায় তার নানা রকম অপকর্ম করার রেকর্ড রয়েছে। যে কারণে শিল্পীকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হলে ঘটনার মূল রহস্য ও কারা ঘটনার সাথে জড়িত তাদের নাম ঠিকানা জানা যাবে। তিনি আরো বলেন, ঘটনাটি রাজবাড়ী থানা পুলিশকে জানানোর পর তারা তাদের লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে বলেন। তার বাবা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং এর পর রাজবাড়ীর পুলিশ সুপারসহ জেলা পুলিশের উদ্ধর্তন কর্মকর্তারা তাদের বাড়ীতে এসেছেন। তাদের সাহস যোগানোর পাশাপাশি আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
ওই স্কুলছাত্রী জানান, এক ছেলে আমাকে পছন্দ করতো। এই পছন্দের কথা আসামি শিল্পী বেগম জানতে পেরে তাকে সুকৌশলে বিপদে ফেলে। সেই সাথে আমার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। আমি বিষয়টি পরিবারকে জানাই। আর এ কারণেই শিল্পী আমার হাত-পা বেঁধে জামায় আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে।
অপরদিকে, গত শনিবার দুপুরে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে থাকা আসামি শিল্পীর বাড়ীতে গিয়ে দেখাযায়, ওই বাড়ীতে কেউ নেই। বাড়ীটি বেশ সুরক্ষিত। বাড়ীর চার পাশে টিনের বেড়া। বাড়ীতে প্রবেশ করতে হলে কমপক্ষে তিনটি দরোজা পার হতে হয়। যে সব দরোজাতে রয়েছে লাগানো তালা।

(Visited 872 times, 1 visits today)