পাংশায় বাবাকে হত্যার পর লাশ বস্তাবন্দি করে নদীতে ফেলার দায়ে ছেলের যাবজ্জীবন –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

রাজবাড়ীতে বাবাকে হত্যার দায়ে ছেলের যাবজ্জীবন ও সহযোগির এক বছরের কারাদন্ড প্রদান করেছে আদালত। আজ সোমবার দুপুরে রাজবাড়ীর দায়রা জজ নিলুফার সুলতানার আদালত এ রায় প্রদান করেন।
জানাগেছে, ২০১৪ সালে ৫ অক্টোবর জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের শাহমিরপুর গ্রামে পূর্ব বিরোধের জের ধরে আলিম প্রামাণিক বাড়ীর অদূরের পদ্মা নদীতে মাছ শিকারের কথা বলে তার বাবা টিউবওয়েল মিস্ত্রী আইয়ুব আলী প্রামাণিক কে নিয়ে যায়। সেখানে তার বাবাকে সে হত্যার পর লাশ বস্তা বন্দি করে নদীর পানিতে ফেলে দেয়। ওই ঘটনার ২৫ দিন পর একই বছরের ১ নভেম্বর বস্তা বন্দি অর্ধগলিত আইয়ুব প্রামানিকের লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আইয়ুবের ভাই চাঁদ আলী প্রামাণিক আলিম প্রমাণিক তার মা আলেয়া খাতুন ও আলিমের সহযোগি ও শাহাদৎ প্রামাণিকের ছেলে ফিরোজ প্রামাণিককে আসামী করে পাংশা থানায় একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলার দীর্ঘ স্বাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ শেষে গতকাল আদালত মা আলেয়া খাতুন (৪৫) কে বেকুসুর খালাশ প্রদান, আলিম প্রামাণিক (২৫) কে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরো ৬ মাসের সশ্রম কারাদন্ড এবং ফিরোজ প্রামাণিক (৩৫) কে এক বছরের কারাদন্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরো তিন মাস সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন।
জানাগেছে, আলিম প্রামানিক ও তার মা আলেয়া খাতুনের সাথে নিহত টিউবওয়েল মিস্ত্রী আইয়ুব প্রামানিকের পারিবারিক সম্পর্ক ভাল ছিল না। আলিম কৃষি কাজ করার পাশাপাশি অন্যদের সাথে টিউবওয়েল মিস্ত্রীর কাজ করতে। সে কয়েক বছর পূর্বে পাংশার হাবাসপুর ইউনিয়নের চর ঝিকুরি গ্রামের সালমা খাতুন নামে এক কিশোরীকে বিয়ে করে। তার সংসারে এক বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তানও রয়েছে। তবে আলিমের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ ভাল না থাকায় দেড় বছর পূর্বে তার স্ত্রী সালমা খাতুন বাড়ী থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে যায়। এ ঘটনার পর আলিম তার স্ত্রীকে পুনরায় বাড়ীতে ফিরিয়ে আনতে বাঁধা দেয়। সে সময় মুখ্য ভুমিকা পালন করেন পিতা আইয়ুব আলী। তিনি সালমার পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে তাকে বাড়ীতে ফিরিয়ে আনেন। এতে আলিম তার পিতার প্রতি ক্ষুব্দ হয়। যদিও ৭ মাস পূর্বে সালমা আবারও বাড়ি থেকে চলে যায়। সালমাকে ফিরিয়ে আনতে এবং এলাকাবাসীর চাপের মুখে আইয়ুব তাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়। তাছাড়া আইয়ুবের হাতে থাকা প্রায় লক্ষাধিক টাকা আলিম হাতিয়ে নেবার চেষ্টা করে। টাকা দিতে আইয়ুব রাজি না হওয়ায় আলিম তার পিতাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। ২০১৪ সালের ৪ অক্টোবর (ঈদ উল আযহা’র দু’দিন আগে) আইয়ুব পাবনা জেলার সূজানগর এলাকায় কয়েকটি টিউবওলের মিস্ত্রীর কাজ করে বাড়ীতে ফিরে আসেন। এর পর দিন সন্ধ্যায় আলিম তার পিতাকে কৌশলে পদ্মা নদীর তীরে ডেকে নিয়ে যায়। সে সময় তার অপর তিন সহযোগীকে নিয়ে আইয়ুবকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। একই সাথে লাশটি গুম করার লক্ষে ছালার বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে এবং তার মাজার সাথে বালু ভর্তি আরো দু’টি বস্তা বেঁধে নদীর পানিতে ফেলে দেয়। তবে এ ঘটনার পর থেকেই সে তার পিতার বাড়ীতে অবস্থান করে।
অপর দিকে আলিম তার পিতা হত্যার লোমহর্ষক ওই বর্ণনা ১৬৪ ধারায় রাজবাড়ীর আদালতেও প্রদান করেছে। আলিমের মা আলেয়া খাতুন’কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে আলেয়ার দেয়া তথ্য গুলো ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই সব তথ্যে যাচাই-বাছাই করার পরই বলা সম্ভব হবে আলিমের মা আলেয়া খাতুন এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিল কি না।
মামলার বাদী ও নিহত আইয়ুবের ছোট ভাই চাঁদ আলী প্রামাণিক জানান, তাদের বাড়ী রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের শাহমিরপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মৃত সাকেন আলী প্রামাণিক। আইয়ুবের ২ মেয়ে ও ২ ছেলে সন্তান রয়েছে। কয়েক বছর ধরে আইয়ুবের স্ত্রী আলেয়া খাতুন ও সন্তানদের সাথে তার পারিবারিক বিরোধ চলে আসছিল।ঘটনার ৩ মাস পূর্বে ওই বিরোধের মিমাংশা করেন স্থানীয় মুকুল মেম্বার। এরই মাঝে দরিদ্র আইয়ুব টিউবওয়েলের মিস্ত্রীর কাজ করে বহু কষ্টে লক্ষাধিক টাকা জমায়। ওই টাকা নিজেদের হেফাজতে নেয়ার জন্য ঈদ উল আযহা’র ৭ দিন পূর্বে পুনরায় তাদের মধ্যে ঝগড়া হয় এবং বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। ২০১৪ সালের ৫ অক্টোবর রাতে আইয়ুব পাবনায় একটি টিউবওয়েলের কাজ সেরে বাড়ীতে ফিরে আসে। এর পর থেকেই নিখোঁজ হয় সে। নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে আইয়ুবের স্ত্রী ও ছেলে আব্দুল আলিম প্রমাণিকের কথাবার্তা ছিল অগছালো। যে কারণে প্রথম থেকেই তারা আলোয়া এবং আব্দুল আলিমকে সন্দেহের তালিকায় রাখে। একই সাথে তারা নিকট স্বজন এবং পাবনাসহ পরিচিত জনদের কাছে খোজ খবর নিতে শুরু করে। এলাকার কিছু লোক বাড়ীর অদুরে থাকা পদ্মা নদীর শাহমিরপুর চরে বন কাটতে যায়। তারা চরের হাটু পানির মধ্যে একটি বস্তা দেখতে পায় এবং ওই বস্তা থেকে মৃত মানুষের পচা গন্ধ পেয়ে তাদের খবর দেয়। পরে তারা এলাকার লোকজনসহ ঘটনাস্থলে যায় এবং লাশ সনাক্ত করে। তিনি আরো জানান, ঘাতকরা পরিকল্পিত ভাবে আইয়ুবকে হত্যার পর চটের বস্তায় ভরে এবং লাশের মাজার সাথে আরো দু’টি বস্তায় বালু ভর্তি করে তা পদ্মা নদীতে ফেলে দেয়। তবে নদীতে পানি কমে যাওয়ায় বালু চরের মধ্যে বস্তাটি ভেসে ওঠে।

(Visited 561 times, 1 visits today)