প্রশাসনের হস্তক্ষেপে গোয়ালন্দে চার মাসে বন্ধ করা হয়েছে ৩০ বাল্যবিয়ে –

গণেশ পাল, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম : 

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বাল্যবিয়ে। গত চার মাসে গোয়ালন্দ পৌরসভাসহ উপজেলার উজানচর, দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম ও ছোটভাকলা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে শতাধিক বাল্যবিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দেশের প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে নিকটাত্মীয়ের বাইরে কাউকে কিছু না জানিয়ে বর-কনে উভয় পক্ষের অভিভাবক মিলে বাল্যবিয়েগুলো ঠিক করেন। এ ক্ষেত্রে কখনো জানাজানি হয়ে গেলে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ বিয়েবাড়িতে গিয়ে বর-কনের অভিভাবকদের বোঝান। প্রাপ্ত বয়স না হওয়া পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদের বিয়ে না দেওয়ার জন্য উভয় পক্ষের অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকারনামা নিয়ে বাল্যবিয়ে ভণ্ডুল করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দরিদ্রতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, প্রাচীন রীতি-নীতি, বাল্যপ্রেম ও দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর কারণে গোয়ালন্দ উপজেলায় বাল্যবিয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
দরিদ্রতা : পদ্মাপারের গোয়ালন্দ উপজেলা নদীভাঙন এলাকা। মোট জনসংখ্যার অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। প্রতিবছর নদীভাঙনের শিকার হয়ে সর্বহারা হন শত শত মানুষ। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ না থাকায় দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকরা তাদের মেয়ে সন্তানের বিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন।
সামাজিক নিরাপত্তার অভাব : লেখাপড়া করে মেয়ে একদিন বড় হবে, স্বাবলম্বী হয়ে বাবা-মায়ের আশা পূরণ করবে—এমন চিন্তা মাথায় রেখে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠান এলাকার অনেক অভিভাবক। কিন্তু প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার পথে মেয়েরা ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়। এলাকার বখাটেরা কখনো কখনো ছাত্রীদের পথরোধ করে তাদের লাঞ্ছিত করে। অনেক সময় বখাটেদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। এতে ছাত্রীসহ তাদের অভিভাবকদের মনে অজানা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে অনেক অভিভাবক তাদের স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ করে বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হন।
অসচেতনতা : গোয়ালন্দের প্রত্যন্ত চর এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই অসচেতন। বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। বাল্যবিয়ে আইনত নিষিদ্ধ তাও তাঁরা জানেন না। আর এসব বিষয় না জানার কারণে খুব ঠাণ্ডা মাথায়ই তাঁরা ছেলে-মেয়েদের বাল্য বিয়ের ব্যবস্থা করেন। আর দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানকার কোনো খবর উপজেলা প্রশাসনের কাছেও সহসা পৌঁছায় না।
বাল্যপ্রেম : বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ এলাকার অপ্রাপ্তবয়সী অনেক ছেলে-মেয়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়। পরে সুযোগ বুঝে পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে তারা ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাদের অনেকে রাজবাড়ীর নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে গিয়ে প্রকৃত বয়স লুকিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক উল্লেখ করে হলফনামায় স্বাক্ষর করে কথিত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে এলাকার সাধারণ মানুষ নোটারি পাবলিকের ওই হলফনামাকে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ হিসেবে মনে করেন।
যৌনপল্লীর অবস্থান : দেশের সবচেয়ে বড় পতিতাপল্লী এ এলাকায়। ওই পল্লীতে জন্মগ্রহণ করা বিভিন্ন যৌনকর্মীর কয়েক শ সন্তান রয়েছে। তাদের অনেকে স্থানীয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সেখানে যৌনকর্মীর সন্তান ও সামাজিক পরিবারের সন্তানরা একসঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। এর ফলে সামাজিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে একটা বিরূপ প্রভাব পড়ে।
গোয়ালন্দ উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আব্দুস সালাম সিদ্দিকী বলেন, ‘উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নে বাল্যবিয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে গত চার মাসে গোয়ালন্দের বিভিন্ন গ্রামে ৩০টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছে উপজেলা প্রশাসন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবায়েত হায়াত শিপলু বলেন, বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক সজাগ রয়েছে।

(Visited 19 times, 1 visits today)