একজন রিক্সাওয়ালা বাঁচিয়েছে আমার প্রাণ- সংসদে খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন, এমপি –

জাহাঙ্গীর হোসেন, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

গত ৩০ জানুয়ারী ২০১৯ জাতীয় সংসদে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ও রাজবাড়ীর কৃতি সন্তান এ্যাডঃ খোদেজা নাসরিন আক্তার হোসেন গত ৪ মার্চ একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম সংসদ অধিবেশনে বক্তৃতা করেছেন।
তিনি তার বক্তৃতা বলেছেন, আমাদের কাছে এখন আগুন মানেই খালেদা-তারেক-জামাত। জাতি আজ জানতে চায় ২০১৩ এর অগ্নি সন্ত্রাস কি ৭১ এর অপারেশন সার্চ লাইটের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ?
আমি নিজেও বিএনপি জামাতের ঐ নৃশংশ অগ্নি-সন্ত্রাস ও তান্ডবলীলার একজন ভিকটিম। ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বরের সেই ভয়াল সন্ধ্যার দুর্বিসহ স্মৃতি আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কী দোষ করেছিলাম আমি ও আমার মত অগ্নিদগ্ধ হওয়া হতভাগ্যরা ? জীবন্ত পুড়ে মরা নিস্পাপ মানুষেরা ? স্বাধীন রাষ্ট্রে জীবিকা নির্বাহ করা, অবাধে চলাচল করা কী আমাদের পাপ ?
মুলতঃ এই আগুন, সন্ত্রাস, হত্যা, লুন্ঠন, একটি একই সূতোয় বাধা পুরোনো ছকের এক ঠাস বুননের গল্প, আমাদের সকলেরই মনে আছে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার অবিসংবাদী নেতৃত্বে পরিচালিত গনতান্ত্রিক আন্দোলনের ফসল হিসাবে জাতি ২০০৮ সালে দেড় কোটি ভূয়া ভোটার বর্জিত একটি স্বচ্ছ ও সঠিক ভোটার তালিকা পায়। অতঃপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্টতা নিয়ে মানবতার মাতা বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। জনগণের কাছে তাঁর অঙ্গীকার ছিল দিন বদলের। ডিজিটাল বাংলাদেশের। বিদ্যুৎ, খাদ্যে-স্বয়ং সস্পূর্নতা আনায়ন করার। জাতীয় অর্থনীতির বহমানতা অবারিত করতে। সকল অবকাঠামোর উন্নয়ন সাধোনকরা। জ্ঞানে-মেধায় সাজিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় রুপান্তরিত করার। আর এই সোনার বাংলা গড়ার জন্যই দরকার ছিল সোনার বাংলার শত্রু রাজাকার-আলবদর আর ১৫ আগষ্টের খুনীদের বিচার করা। ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখী করে যথাযথ শাস্তি দানের মাধ্যমে আইনের শাসন নিশ্চিত করার। এই সব অঙ্গিকারকে বাস্তবে প্রতিফলন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যুদ্ধপরাধীদের বিচার চলমান রইলো। যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদন্ডের রায় কর্যকর হতে লাগলো। কিন্তু পাপীস্তানের বশম্বদ রাজাকার আলবদরেরা বাংলাদেশে তাদের “ট্রয়ের ঘোড়া” বিএনপি কে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে চাইলো। লক্ষ ছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানো।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তাদের ডাকে সাড়া দিলনা। তাই ৭১ ও ৭৫ এর খুনীদের ১৮ রকমের সন্ত্রাসীদের জোট খালেদা-তারেক জামাতের নেতৃত্বে বাংলার মানুষের উপর চরম প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লো। ২০১৩ তে যেন ৭১ নেমে এল। বাংলাদেশ পুনঃ দেখলো সেই ‘পোড়া মাটি’ নীতি। রেল, লঞ্চ, বাস, রিক্সা, সি,এন,জি গরীবের টং ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হল। জ্বালিয়ে দেয়া হল স্কুল-আদালত, রেল-স্টেশন। মানুষ বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে প্রতিরোধে দাড়িয়ে গেল। যে মানুষ একদিন আওয়ামীলীগের ডাকে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হরতাল করেছিল তারাই খালেদা- জামাতের অগ্নিসন্ত্রাস হরতাল রুখে দাড়ালো। তারা খালেদা- নিজমি- তারেকের ডাক ঘৃনা ভরে প্রত্যাখান করে হাটে মাঠে, ঘাটে অফিস আদালতে কল কারখানায় উৎপাদন কর্মে নিয়োজিত হল। সব কিছুরই সচলতা অব্যাহত রইল। বাংলার মানুষের এই প্রতিরোধ ভেঙ্গে দিতেই ওরা রাস্তাঘাটে নারী শিশু যুবক বৃদ্ধ সকলকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে শুরু করলো।
২৫ নভেম্বর ২০১৩ আমাদের শত বর্ষের পুরোনো ঢাকা বার, জরাজীর্ণ ভবন, যা সদ্য ২০ কোটি টাকা দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নতুন ভাবে নির্মাণ করে উদ্বোধন করেছিলেন। ২৮ শে নভেম্বর ছিল তার শোকরানা আদায়ের জন্য মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠান।
মিলাদে অংশগ্রহনের পর আমি অন্যান্য যাত্রীদের সাথে বিহঙ্গ বাসে উঠে ছিলাম। কিন্তু শাহবাগের মোড়ে পৌঁছাতেই খালেদা-নিজামীর খুনী বাহিনী যমদূতের মত এগিয়ে এসে বাসের ভিতর আগুন ছড়িয়ে দিল। আগুনের লেলিহান শিখায় বাসের ভিতর সকল যাত্রী মরন যন্ত্রনায় চিৎকার করছিল। পাশের যাত্রী বোন সহ আমার সারা মুখ হাত শরীর দাউ দাউ আগুনে পুড়ছিল, আমরা চলন্ত বাস হতে লাফ দিলাম শুধু মনে আছে পথে সব ভয়ার্ত মানুষ পালাচ্ছে…. মর্মঘাতী চিৎকার করতে করতে…. একজন রিক্সাওয়ালা এগিয়ে এল।
আর কিছুই মনে নেই………….। ২৩ দিন পর আইসিইউ হতে কেবিনে নিয়ে এলে আস্তে আস্তে সব কিছু জানতে শুরু করলাম। মাননীয় স্পিকার আমার পাশের সিটে নাহিদ নামে এক কিশোর ছিল, সে ঢাকায় এসেছিল শীত বস্ত্র কিনতে। কিন্তু খালেদা-নিজামী-তারেক চক্র তাকে শ্মসানের আগুনে জ্বালিয়েছে আমার পাশের সিটে ছিলেন রুপালী ব্যাংকের অফিসার, উভয়েই নরক যন্ত্রনা সয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।
আমার স্বামী বললেন, ভয় পেয়না, আমাদের সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আছেন। তার নির্দেশে প্রতিদিন একজন এসে আমাদের সকলের খোজ নিচ্ছেন। তার পর হাসপাতালে আরও তিন মাস।
আমার ছোট ছেলে আমাকে দেখে বলেছে আমার মায়ের এই বিভৎস্য রুপ কে দিয়েছে ? এই ????? দেখুন মাননীয় স্পিকার ?????? ক্ষত বিক্ষত। এই দেখুন আমার আগুনে পোড়ায় আরো ছবি এ তার পরের ছবি।
এই ছবি আমাকে আমার মত আগুন সন্ত্রাসের শিকার তথা গোটা বাংলাদেশকে সর্বদা মনে করিয়ে দিচ্ছে ৭১ এর খুনীদের প্রিয় সখি খালেদা ও তার খুনী বাহিনীর কথা। আজ এই মহান সংসদে দাড়িয়ে আমি আগুন সন্ত্রাসের রানী খালেদা-তারেক জামাত গং এর প্রচলিত আইনের অধীনেই বিচার চাই। আমরা জানি সারা জীবন আমরা ২০১৩ এর ভয়াবহ স্মৃতি হতে বের হতে পারবো না। কিন্তু ঐ খুনী সন্ত্রাসীদের হুকুমদাতা সহ সকলের বিচার হলে বাংলাদেশে শান্তি আসবে।
অনেকেই বলেন, খালেদা তো আপনার বাসে পেট্রোল বোমা মারে নাই’। তাদের কে বলি তিনিতো সুপ্রীম হুকুমদাতা। এদেশের বিভিন্ন জায়গায় খালেদা-তারেক-জামাতের বহুলোক একই দিনে বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল বোমা মেরেছে। তাদের সকলেরই হুকুমদাতা খালেদা জিয়া। সে নিবৃত্ত হলেই সব অপতৎপরতা বন্ধ হয়। দেখুন এতিমের টাকা চুরি করে দুনীতির দায়ে সাজা প্রাপ্তিÍর আগে তিনি বলেছেন আমার জন্য আন্দোলন করেন। কিন্তু মারামারি সন্ত্রাস করবেন না। শান্তিপুর্ণ থাকবেন। বিএনপি জামাত এখন তার জন্য আন্দোলন করছে। আপাতত ওদের আন্দেলোন আছে তবে আগুন ও সন্ত্রাস দেখো যাচ্ছে না। এই নির্দেশনা খালেদা জিয়া যদি ২০১৩ তে দিত মাননীয় স্পিকার, আমি ও আমার মত হাজারো মানুষ ভয়াবহ আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করতো না, পঙ্গু হতোনা, আগুনের ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকতো না।

(Visited 483 times, 1 visits today)