রাজবাড়ীর পিটিআই সুপারিনটেনডেন্টকে আত্নসাৎ করা অর্থ সরকারী কোষাগারে ফেরৎ দেবার নির্দেশ –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

রাজবাড়ীর প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) সুপারিনটেনডেন্টের বিরুদ্ধে সরকারী টাকা আত্নসাৎ, এক প্রশিক্ষনার্থী শিক্ষককের সার্ভিস বুক আটকে রাখাসহ নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রশিক্ষনার্থী শিক্ষককের সার্ভিস বুক আটকে রাখার ঘটনার অভিযোগে তদন্ত ইতোমধ্যেই সমাপ্ত হয়েছে। তদন্ত কমিটির কাছে সুপারিনটেনডেন্ট লিখিত ভাবে অফিস পরিচালনা ও কর্তব্যে অবহেলার কথা স্বীকার করেছেন। আর তদন্ত কর্মকর্তা সার্বিক বিষয়ে তদন্ত শেষে সুপারিনটেনডেন্টের বিরুদ্ধে অফিস পরিচালনায় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে বলেও তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন। তবে সরকারী অর্থ আতœসাৎ করার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় তা দ্রুত সময়ের মধ্যে ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে সরকারী কোষাগারের জমা দেবার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের আলাদীপুর গ্রামে অবস্থিত প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (পিটিআই)। ওই কার্যালয়ে প্রশিক্ষক ফজলুল হক বলেন, দুই দিনের ছুটিতে রয়েছেন এ প্রতিষ্ঠানের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিন। ওই সময় তিনি আরো জানান, মোঃ নাছির উদ্দিন রাজবাড়ীর প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে ২০১৮ সালের ১৬ মে যোগদান করেন। তবে তিনি যোগদান করার পর এ দিনের জন্যও পিটিআই ক্যাম্পাসে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা দিয়ে তৈরী করা “সুপার কোয়াটার্স”-এর বসবাস করেননি। তিনি পিটিআই-এর সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় থাকা চার রুম বিশিষ্ঠ ডরমেটরীর একটি রুম দখল করে বসবাস করতেন। যদিও তিনি ডরমেটরী ভাড়া বাবদ মাসিক এক হাজার পাঁচশত টাকা করে প্রদান করেছেন। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে কথা উঠলে তিনি ডরমেটরী ছেড়ে দেন। তবে তিনি “সুপার কোয়াটার্স”-এ না উঠে জেলা শহরের পাবলিক হেলথ্ এলাকার একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। বিগত বছরের নভেম্বর মাস থেকে তিনি ওই ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
রাজবাড়ীর হিসাবরক্ষণ (এজি) কার্যালয়ের কর্মকর্তা মতিউর রহমান বলেন, রাজবাড়ীর পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিন তাদের প্রত্যয়নপত্র দিয়ে জানিয়েছেন “আমি সরকারী বাসায় বাস করি না”। তাছাড়া চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সরকারী বাসায় না থাকতেও পারেন। যে কারণে তার বাসা ভাড়া বাবদ ১৫ হাজার টাকা কাটা হয়নি। তবে যদি সরকারী কোন আদেশপত্র পাওয়া যায় তাহলে তার কাছ থেকে বাসা ভাড়া আদায় করা হবে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছিুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনুপস্থিত প্রশিক্ষককে উপস্থিত দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানে স্বল্প মূল্যের মালামাল প্রদান এবং নিজ কার্যালয়ে লোক দেখানোর চলে স্বল্প পরিমান মালামাল কিনে পুরো অর্থ ও আতœসাত করেছেন রাজবাড়ীর পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিন। তারা উল্লেখিত অভিযোগ গুলো খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবী জানান।
এদিকে, ২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) আবদুর রউফ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়েছে, পিটিআই-এ কর্মরত সুপারিনটেনডেন্ট/চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত সরকারী বাসায় বসবাস করা বাধ্যতামূলক।
অপরদিকে, ২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর নওগাঁ জেলার মহাদেবপুরের ৭৬ নং পাতনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জেরিন মল্লিকা জেসি রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত ভাবে পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে তার সার্ভিস বুক আটকে রাখার অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইসটি ও শিক্ষা) মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেনকে প্রধান করে এ সদস্য বিশিষ্ঠ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত ৩১ জানুয়ারী জেলা প্রশাসকের কাছে প্রদান করা ওই তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজবাড়ী পিটিআই-এর ২০১৭ শিক্ষাবর্ষের সিইন এড প্রশিক্ষানার্থী হিসেবে ১৬৭ জন প্রশিক্ষনার্থী অংশ গ্রহণ করেন। তার মধ্যে জেরিন মল্লিকা জেসি সার্ভস বুক জমা দেন। প্রথমে পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিন ওই সার্ভিস বুক জমা নিতে চাননি। তবে নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার কর্তৃক সার্ভিস বুক পাঠানোই তিনি তা গ্রহণ করেন। যে কারণে তদন্ত কমিটির প্রধান পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিনকে ২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর নোটিশ প্রদান করে। তবে নাছির উদ্দিন উপস্থিত হননি এবং উপস্থিত না থাকার কারনও জানান নি। যে কারণে একই বছরের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটির প্রধান পুনরায় নোটিশ করেন এবং পিটিআইতে যান। সে সময় “সার্ভিস বুক গ্রহণের নীতিমালা/পরিপত্রের নির্দেশনা সম্পর্কে তদন্ত কমিটির প্রধান নাছির উদ্দিনের কাছে জানতে চান। লিখিত জবাবে নাছির উদ্দিন তদন্ত কমিটিকে জানায়, “এ বিষয়ে সরকারী কোন নীতিমালা আছে কিনা তা তার জানা নেই”। সেই সাথে “অফিস পরিচালনায় এবং কর্তব্যে অবহেলা করেছেন বলেও তিনি স্বীকার করেন”। যে কারণে তদন্ত কর্মকর্তা সুপারিনটেনডেন্টের বিরুদ্ধে “অফিস পরিচালনায় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে” বলেও তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক মোঃ শওকত আলী বলেন, গত ১ ফ্রেব্রুয়ারী রাজবাড়ী পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ওই তদন্ত রিপোর্টসহ একটি প্রতিবেদন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন। সেই সাথে সরকারী বাসায় না থেকে বাসা ভাড়া উত্তোলনের বিষয়ে জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
রাজবাড়ীর প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিন জানান, শিক্ষক জেরিন মল্লিকা জেসি-এর অভিযোগের লিখিত উত্তর তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রদান করেছেন এবং শিক্ষক জেরিন মল্লিকা জেসি’র সার্ভিস বুক ইতোমধ্যেই তিনি নওগাঁর মহাদেরপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর বাসা ভাড়ার টাকা আতœসাৎ প্রসঙ্গে বলেন, তার সরকারী বাসায় থাকার বাধ্যবাধকতা নেই।
জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোঃ আজগর আলী জানান, পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ নাছির উদ্দিন মিথ্যা তথ্য দিয়ে তার কার্যালয় থেকে বাসা ভাড়ার সরকারী অর্থ উত্তোলন করে তা আতœসাৎ করেছেন। পরবর্তীতে সরকারী টাকা আতœসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ইতোমধ্যেই তাকে ওই অর্থ দ্রুত সময়ের মধ্যে ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে সরকারী কোষাগারের জমা দেবার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আর ওই অর্থ প্রদান না করা পর্যন্ত নাছির উদ্দিনের বেতন ভাতা প্রদান করা হবে না।

(Visited 126 times, 1 visits today)