“গান ছাড়া আর কিছু নাই”- রাজবাড়ীর কৃতিসন্তান কাঙালিনী সুফিয়া –

গান ছাড়া আর কিছু নাই –

কাঙালিনী সুফিয়া। বাউলশিল্পী। ‘কোনবা পথে নিতাইগঞ্জ যাই’, ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘আমার ভাটি গাঙের নাইয়া…’ ইত্যাদি জনপ্রিয় গানের এই শিল্পীর জীবনের গল্প শুনেছেন দৈনিক কালের কণ্ঠের আদীব আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

ডিজি স্যারের কাছে প্রেসিডেন্ট এরশাদ আমার কথা জানতে চাইলেন, ‘সে কেমন বাউল? দেখতে কেমন?’ ডিজি স্যার কইল, ‘স্যার, আমি যারে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি, তার গান শুইনাই নির্বাচন করছি। সে গরিব মানুষ, চির কাঙাল।’ তখন এরশাদ কইলেন, ‘সে তো মহিলা মানুষ। তার নাম কাঙাল হয় ক্যামনে? আজ থাইকা তার নাম হইব কাঙালিনী সুফিয়া’

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে?

জন্মের সাল-তারিখ মনে নাই। যুদ্ধের তিন বছর আগে আমার পুষ্পের জন্ম। ওর জন্মের সময় আমার বয়স হইবে ১৪ বা ১৫ বছর। তাইলে হিসাব করেন, কত হইল? আমার বাবার নাম খোকন হালদার। মা কমলা বালা। গ্রামের মধ্যে একেবারেই গরিব ছিলাম আমরা। গ্রামের নাম রামদিয়া। ফরিদপুর জেলায় পড়ছে। বাবায় জাল বাইয়া মাছ ধরত। জাইলা বাড়ির মাইয়া আমি। দাদা-দাদিরে দেখতে পাইনি। আমরা দুই বইন-এক ভাই ছিলাম। আমি ছিলাম সবার ছোট। বড় বইনের নাম বিমলা হালদার। আর আমার নাম ছিল অনিতা হালদার, ডাকনাম বুচি। ভাই মদন হালদার বাবার সঙ্গে থাকত। সে-ও জাইলা ছিল।

ছোটবেলায় বাবার লগে নৌকায় কইরা মাছ ধরতে যাইতাম। বাবায় ইলিশ মাছ ও আরো কত কত মাছ ধরত। মাঝে মাঝে বড় মাছও ধরা পড়ত। আমি জাল থাইকা মাছ ছাড়াইয়া খালইতে (পাত্র) ভরতাম। বাবায় নৌকায়ই ভাত রাঁধত। চন্দনা নদীতে গোসল করতাম আর মজা কইরা খাইতাম। এইগুলা এখনো ভুলি নাই।

পড়ালেখা করেননি?

মাসখানেক স্কুলে গেছিলাম, সাত-আট বছর বয়সে। বই দিছিল। ক-খ-গ, আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা—এগুলা পড়ছিলাম। মাস্টার একদিন এমন মাইর দিল, ফিট (অজ্ঞান) হইয়া গেছিলাম। কথাটা মার কানে যাইতেই, কান্নাকাটি কইরা স্কুল থাইকা নিল। মা আগের কালের মানুষ ছিল, তাই আর স্কুলে দেয় নাই।

আপনার বিয়ে হয়েছিল কবে?

পুষ্পর বাবা নাম সুধীর হালদার। তার বাড়ি ছিল যশোর জেলায়। সে আমাদের গ্রামে আসছিল আরেক মেয়েকে বিয়ে করতে। সেই মেয়েকে পছন্দ না কইরা তার গার্জিয়ানরা আমারে পছন্দ করছে। সে নিজে পছন্দ করে নাই। তার বাবা ছিল না। মা ও ভাইরা মিলে আমারে নিছে। আমার তখন সাত কি আট বছর বয়স। সেই বয়সেই সংসার করলাম। তবে তখন পুষ্পের বাবার সঙ্গে থাকি নাই। ঘুমাইতাম শাশুড়ির কাছে। স্বামীরে দেখলে ঘোমটা দিয়া থাকতাম। ভয় পাইতাম। সাবালক হওয়ার পর তার কাছে গেলাম। তবে সে আমার প্রতি ভালোবাসা দেখাইত না। কারণ সে তো আমারে বিয়া করতে চায় নাই!

গান গাওয়া শুরু করলেন কখন?

একবার মাইয়ারে মায়ের কাছে থুইয়া আমি দেশান্তরি হইলাম। আমার মাইয়া বড় হইছে তার মামির দুধ খাইয়া। আমার মা আমারে সোনাপুরের মাঝবাড়ি আশ্রমে, আমার গুরুর কাছে দিয়া আসলো। গুরুর নাম গৌর মোহন্ত। উনি আমারে ‘বেদ’ দিয়ে দিল। বৈষ্ঠম বানাইল। মুসলমান ধর্মে হইল ফকির, আর হিন্দুর ধর্মে বৈষ্ঠম। তখন বয়স ১৫ কি ১৬ হইব। আমরা তখন পাঁচ-সাতজন বৈষ্ঠম মিলে গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করতাম। আমি বেশি ভিক্ষা করতে যাই নাই। সাত কি আটবার গেছিলাম। এই নিয়মের মধ্যে গান শিখতে মেলা দিন লাগছে।

দেশান্তরি হয়েছিলেন কেন?

পুষ্পর বাবার স্বভাব-চরিত্র ভালো ছিল না। পরনারীর প্রতি লোভী ছিল। আমারে দেখতে পারত না, মাইর-ধইর করত। বড় বড় চিংড়ি নিয়া আরেক বাড়ি খাওয়াইত! সেইটা হাতেনাতে ধরছিলাম বলে আমারে একদিন অনেক মারছে। পুষ্পরে আট মাসের পেটে নিয়া আমি বাপের বাড়ি চইলা আসছি।

তিনি আর আপনাকে ফিরিয়ে নিতে আসেননি?

আমার সন্তান হইছে আমার বাপের বাড়ি। এক মাস উঠানে ছিলাম, শুচিঘরে। তার পর মাথা কামান দিয়া আমার মা আমারে ঘরে তুলছে। পুষ্পের বাবা দেখতে আসছিল; কিন্তু এমন হারামি ছিল, মেয়েরে সে কোলেও নেয় নাই! আমার সন্তানরে অস্বীকার কইরা চলে গেছে। কইছে, ‘এই সন্তান আমার না!’ কোর্টে ওর আর পুষ্পর রক্ত নিয়া মেশিনের মধ্যে দিয়া পরীক্ষা করছে। রক্ত মিলা যাওয়ায় দুই মাসের জেল খাটছে বেটায়। পরে চিঠি দিছে, ‘আমি ভাত-কাপড় দিব, আমারে মাফ কইরে দেন।’ এই বলে জেল থিকা ছাড়া পাইছে। এরপর আমি ননদের বাড়ি ছিলাম মাসখানেক; কিন্তু স্বামী আর আমারে ঘরে তুলে নেয় নাই। আমার মা-বাপ এই খবর পাইয়া আমারে রামদিয়া নিয়া আইলো। তারপর দেখি সে তালাকের কাগজ পাঠাইয়া দিয়া অন্য জায়গায় বিয়া করছে। আমিও সংসারের লোভ ছেড়ে পাড়ি দিছি গানের দুনিয়ায়। প্রথম তালিম নিছি গুরু গৌর মোহন্তের কাছে, তার পর গুরু ধরছি দেবেন খ্যাপারে।

দেবেন খ্যাপার সঙ্গে কিভাবে পরিচয়?

গৌর মোহন্তের শিষ্যা থাকার সময় দেবেন খ্যাপার সঙ্গে পরিচয় হইল। যুদ্ধের আগেই তার শিষ্যত্ব নিছি। গৌর মোহন্ত তালিম দিয়া একদিন কইল, ‘তুমি শিক্ষার ঘরে যাও।’ তখন আমি দেবেন খ্যাপার কাছে আসি। আমার মা-ই আমাকে নিয়া গেছিল। মায়ের দোয়া আমার সঙ্গে সব সময়ই আছে। সে জন্যই যেখানে যাই, অমূল্য রতন পাই। আর দেবেনের কাছ থাইকাই সবচেয়ে বেশি দীক্ষা নিছি আমি। সে-ই আমার হাতে একতারা তুইলা দিছে। ভোজন, সাধন—সব কর্ম তার কাছ থাইকা শিখছি। গানের রাস্তাই পাইছি তার কাছে। তার সঙ্গে শ্মশান মঠের আশ্রমে থাকতাম। ফকিরি জীবনযাপন করতাম। মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে ভিক্ষা করতাম। সেটা দিয়েই দুজনের চলে যাইত। তার শিষ্যরা মাঝে মাঝে খাবার দিয়া যাইত। যখন প্রথম তার কাছে যাই, অনেকে বলছিল—‘মাইয়া মানুষ আপনার সম্মান রাখতে পারবে না!’ কিন্তু আমার ওপর ভরসা ছিল গুরুর।

আপনার জীবনে কার অবদান বেশি—গৌর মোহন্ত নাকি দেবেন খ্যাপা?

দুজনেরই সমান সমান হইলেও গৌর মোহন্তর কাছে শুরু কইরাছি, আর দেবেন খ্যাপার কাছে পাইছি সম্পূর্ণতা। গৌর মোহন্তের কাছে বৈষ্ঠম হইছি। আর দেবেন খ্যাপার কাছে আমি পাঁচ দিনে শিখছি একতারা বাজানো। তিন দিন খালি তারই ছিঁড়ছে। পরের দুই দিনের মাথায় একতারা বাজনা আমার শিখা অইলো। তার নিকটই গান শিখলাম। পরে নিজে নিজে গান বানাইয়া গাইতাম। এরপর যুদ্ধের সময় তার সঙ্গেই দেশ ছাইড়া ভারত পাড়ি দিছি।

যুদ্ধের সময়টা কেমন ছিল?

দেশ ছাইড়া পালাইয়া যাওয়ার কথা মনে হইলে আজও মনটা কান্দে। চোখের সামনে কত মানুষের লাশ দেখলাম। চারদিকে মরা মানুষের গন্ধ। অনেক কষ্ট কইরা নদী, জঙ্গল পার হইছি। খ্যাপার সঙ্গে ইছা নদীর পাড়ে, নন্দীপুর আশ্রমে ছিলাম কিছুদিন। নদীটায় সব সময় জোয়ার থাকত। ওইদিক ছিল হিন্দুপাড়া। সপ্তাহে একদিন ঘুরছি। চাল, ডাল, লবণ জোগার কইরা নিয়ে আসতাম। তা দিয়া পুরো সপ্তাহ চলে যেত। এরপর যুদ্ধের সময় ট্রাকে ট্রাকে গান গাইছি। ক্যাম্পে ক্যাম্পে গান গাইতাম। তাতে কিছু পয়সা পাইতাম। পেট চইলা যাইত। মুর্শিদাবাদ, বহরমপুর, লাল ঘোলা, ভবনখোলা ও রানাঘাট ক্যাম্পে গান গাইতাম। গান গাইতে গাইতে এক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আলাপ হইল। নাম মান্দার ফকির। তার সঙ্গে ভাব জমে গেল। তাই যুদ্ধের পর তার সঙ্গেই দেশে ফিরছি। এরপর তারে নিয়া যাই রাজবাড়ীর বেলগাছিতে, দেবেন খ্যাপার আশ্রমে। সেখানে কিছুদিন থাইকা দুজনে চলে যাই সিরাজগঞ্জ। কিছুদিন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়, আবার কিছুদিন ফরিদপুরের নগরকান্দায়ও থাকছি। যুদ্ধের পরপরই মান্দার ফকির নাম বদলাইয়া ফেলল। আনন্দ খ্যাপা নাম নিয়া আমার সঙ্গে সে গান-বাজনা করত। মুসলমান পরিচয় গোপন রাখত গান গাওয়ার জন্য। আমরা একসঙ্গে পালাগান ও বাউলগান করতাম। মাঝেমধ্যে হিন্দুদের কীর্তনও গাইতাম। এক-দেড় শ টাকা দিত। শীতের সময়টায়ই গান গাইতাম বেশি। পুরা বর্ষাকালে বেকার থাকতে হইত।

ধর্মান্তরিত হলেন কবে?

যুদ্ধের তিন বছর পর মান্দার ফকির নিজে কমান্ডারদের কাছে অস্ত্র জমা দিল। এরপর ওনার হাত ধইরা গেলাম ফরিদপুর কোর্টে। এই বেটাই আমারে মুসলমান করছিল। নিজের নাম নিজেই রাখলাম—সুফিয়া। তার সঙ্গে ম্যালা দিন ছিলাম। সে তিন বছর আগে মারা গেছে। সে আমারে ‘পাগলী’ বলে ডাকত। এখন আর কেউ সেই নামে ডাকে না।

মেয়েকে নিজের কাছে আনলেন কখন?

জিয়ার আমলে (১৯৭৭-১৯৮১) আমার মা মারা যায়। তার পর পুষ্পরে নিজের কাছে নিয়া আসি। মেয়ে তখন আমারে চিনত না। মেয়ের যখন একটু বুদ্ধি-সুদ্ধি হইল, তখন থাইকা চিনতে পারল।

ঢাকার হাইকোর্ট মাজারে কবে এলেন?

একবার মান্দার ফকিরের ওপর রাগ কইরা ঢাকায় চলে আসি। মহাখালীর আমতলীতে ১৫০ টাকা দিয়া এক রুমের বাসা ভাড়া নিছিলাম। ভাত রান্দার একটা কড়াই, একটা স্টোভ, থাল, তোশক কিনে থাকা শুরু করলাম। কিছুদিন একাই ছিলাম। মাস তিনেক পরে সে খোঁজ করতে করতে মাজারে চইলা আসে। তারপর মেয়েকেও ঢাকায় নিয়া আসি। ঢাকায় আসার পর ভাগ্য পরিবর্তন হইছে আমার।

তখন কী ধরনের গান গাইতেন?

বিচারগানই বেশি গাইতাম, লোকে যারে বাউলগান কয়। মাটিতে বইসা গান করতাম। ভক্তরাও মাটিতে বইসাই শুনত। গান শুইনা বকশিশ দিত। দিনে ৫০০-৭০০ টাকা উঠত। সংসার চইলা যেত। মাজারে বিস্যুদবার ছিল গুরুবার। এই দিন আসর খুব জইমা উঠত।

তখনকার কোনো বাউলশিল্পীর কথা মনে আছে?

আরিফ দেওয়ান, আব্দুর রহমান বয়াতি, সুরুজ বয়াতির কথা খুব মনে পড়ে। তাদের গান আমিও শুনতাম। তাদের গান অনেক ভালো লাগত। তারা অনেক বড় মাপের শিল্পী। গান নিয়া তারা সাধনা করত। আবার সাধক-বাউলদের লেখা গানই তারা গাইত। রশিদ সরকার, মাতাল রাজ্জাক দেওয়ান, পাগলা বাচ্চু—এরাও তখন গান করত। তারাও বিচারগান করত। তাদের লগে আমি গান গাই নাই। আমার গান ছিল আলাদা। গানের সঙ্গে নাচ ছিল। সঙ্গে বাজাইতাম প্রেমজুড়ি।

রেডিওতে গাইতে শুরু করলেন কবে?

হাইকোর্ট মাজারে গান করায় একটু নামডাক হইল। অনেক ভালো ভালো মানুষ গান শুনতে আসত এইখানে। এক দিন বেতারের পরিচালক ফজল-এ-খোদা এলো। আমার গান তার পছন্দ হইল। আমারে বলল, বেতারে গিয়া অডিশন দিতে। প্রথম দিনেই অডিশন পাস করলাম। আমার ২৫টা গান রেকর্ড করল। আমি তো মহাখুশি। আমার সঙ্গে মান্দার ফকিরও অডিশন দিছিল, কিন্তু সে পাস করে নাই!

টেলিভিশনে কবে গাইলেন?

মাজারেই বিটিভির ডিজি কাজী আবু জাফর সিদ্দিকীর সঙ্গে পরিচয়। সে আমারে একদিন সুযোগ কইরা দিল। প্রথমে একটা অনুষ্ঠানে গান গাওয়াইল। এরপর কইল, ‘মারে, তুই তো একদিন মাত্র গান করলি। কিন্তু টেলিভিশনে গান করতে অইলে অডিশন দেওয়া লাগব।’ এরপর অডিশন দিয়া পাস করলাম। এই সময়ে আমারে নাম লেখা শিখাইল কুদ্দুস হাবিলদার।

শিল্পকলার সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা মনোয়ারের সঙ্গে কিভাবে পরিচয়?

শিল্পকলা একাডেমিতে বহু প্রগ্রাম করছি। প্রথম অডিশন দিতে গিয়াই ডিজি স্যারের সঙ্গে পরিচয়। সে-ই আমার জীবন ঘুরাইয়া দিল। সে আমারে প্রথম সরকারিভাবে বিদেশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। তখন ডিজি স্যারের কাছে প্রেসিডেন্ট এরশাদ আমার কথা জানতে চাইলেন, ‘সে কেমন বাউল? দেখতে কেমন?’ ডিজি স্যার কইল, ‘স্যার, আমি যারে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি, তার গান শুইনাই নির্বাচন করছি। সে গরিব মানুষ, চির কাঙাল।’ তখন এরশাদ কইলেন, ‘সে তো মহিলা মানুষ। তার নাম কাঙাল হয় ক্যামনে? আজ থাইকা তার নাম হইব কাঙালিনী সুফিয়া।’ এরশাদ সাহেবই মোস্তফা মনোয়ার স্যারের মাধ্যমে আমার নাম কাঙালিনী কইরা দিলেন। সেই থাইকা কাঙালিনী নামেই পরিচিত হইলাম। এরশাদ আমার গানের ভক্ত ছিলেন। ক্ষমতা থাইকা সরার পরও আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করছিলাম। বলছেন, ‘কাঙালিনী, এখন তো আর আমার ক্ষমতা নাই, কিছু টাকা নাও।’ তখন আমারে ছয় হাজার টাকা আর তাঁর একটা কবিতার বই দিছিলেন।

সেটিই প্রথম বিদেশ যাওয়া?

না। এর আগেই গেছিলাম। একবার সিলেট গেছিলাম রেডিওতে গান করতে। সেইখানে বিচ্ছেদিশিল্পী মনির সরকার আমারে বায়না করে নিয়ে গেল লন্ডন। অন্য এক মহিলার পাসপোর্ট নিয়া লন্ডন গিয়া সেইবার দেড় মাস ছিলাম। বার্মিংহাম, লন্ডন—এসব জায়গায় গান গাইলাম। বাউলগানই করলাম। নিজের লেখা গানও করলাম। বাঙালি দর্শকই বেশি ছিল। দেড় মাসে আমারে মাত্র ২০ হাজার টাকা দিছিল। এরপর লন্ডন গেছি সাত-আটবার। তার বাইরে সাইদুর রহমান বয়াতির সঙ্গে কাতারে এক সপ্তাহ ছিলাম। ইতালি গেছি দুইবার। চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, কোরিয়া—কত দেশ গেলাম! ১৯৯৭ সালে আমেরিকাও গেছিলাম। সবচেয়ে বেশি গেছি ভারতে। দিল্লিতে, কলকাতায় বহুবার গান গাইছি। আবদুর রহমান বয়াতির লগে শান্তিনিকেতনেও গান করছি।

শোনা যায় মাঝখানে আবদুল হালিম বয়াতির কাছেও গান শিখেছিলেন?

উনি থাকতেন শরীয়তপুরের নাওডুবি। মাঝে মাঝে মাজারে আসতেন। তখন ওনার কাছে গান শিখতাম। ওনার কয়েকটা গানও গাইছি। তিনি জিন্দা থাকতে আমারে বলছেন, ‘আমার গান যখন গাও, বড় নৌকার সঙ্গে একটা গিলাফ বাঁধো।’ আমি বুঝলাম, লালন সাঁইজির কথাই বলতে চাইছেন তিনি।

তার পর থেকেই লালনে মজলেন?

লালনের গান আগে থাইকাই গাইতাম। তয় ১৯৯০ সালের দিকে তার গানের প্রতি আমার আলাদা টান সৃষ্টি হয়। তাই ঢাকা ছাইড়া কুষ্টিয়ায় একটি বাড়ি ভাড়া নেই। সব মাল-সামানা আর মাইয়ারে নিয়া লালন সাঁইজির মাজারে গেলাম। মাজারের সামনেই হুরু মিয়ার বাড়িতে ভাড়া উঠলাম। মাসে ১০০ টাকা ভাড়া। তখন মাজারে থাকতাম আর গুরুর গান গাইতাম। অনেকে বলত, আমার উচ্চারণ ঠিক নাই। তাই উচ্চারণও ভালো করতে লাগলাম। সেইখানে আমার সঙ্গে বাউল সেকম নামের একজন দোতারা বাজাইত। ওর সঙ্গে প্রেম হলো। কোর্টে গিয়া আমরা দুজন বিয়াও করলাম। তয় কয়েক বছর পর সে-ও আমারে ছাইড়া চইলা যায়।

গান লিখা শুরু করেছেন কবে?

যখন বিভিন্ন গ্রামে গান গাইতাম, মনে মনেই পয়ার ঠিক কইরা ফেলতাম। চোখ বুঝলেই গানের পয়ার মনে পড়ত। নিজেই সুর কইরা গাইতাম। কখনো লেখা হইত না। এরপর অনেকের কথায় লেখা শুরু করলাম। নিজে তো লিখতে জানি না, কাউরে পাশে পাইলে কই, ‘আমার এই গানটা লিইখা দাও।’ চায়ের দোকানে থাকলে অন্যরে বলি, আর বাসায় থাকলে বলি আমার নাতনিদের। ডাকলে মাঝে মাঝে তারা বিরক্তও হয়। আমি আবার পয়ার ভুইলা যাই। মনে পড়লে আবার ডাইকা লেইখা নিই। আমার লেখা গানের মধ্যে একটা গান মানুষের মনে বেশি ধরছে—‘আমি ঘুমাইয়া ছিলাম, ছিলাম ভালো,/ জাইগা দেখি বেলা নাই, বেলা নাই,/ কোনবা পথে নিতাইগঞ্জ যাই।’

কত গান লিখেছেন?

পাঁচ শর ওপরে গান লিখেছিলাম। এখানে খাতায় কিছু আছে। আর বিভিন্ন মানুষের কাছেও কিছু আছে। আমার বিভিন্ন গান বেতার-টেলিভিশনে রেকর্ডিং করা আছে। গানের অ্যালবাম করা আছে কিছু। সাত বছর আগে একবার মিরপুরে অটোতে যাওয়ার সময় ৩০০ গানের একটা পাণ্ডুলিপি ভুলে ফালাইয়া গেছিলাম। পরে খোঁজ নিয়া আর পাই নাই।

কী কী বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারেন?

আমি তো সব সময় একতারা আর প্রেমজুড়ি দিয়াই গান করি। দোতরা, ঢোল, তবলাও বাজাইতে পারি।

সিনেমায় গাইলেন কিভাবে?

‘বুকের ভিতর আগুন’ ছবিতে অভিনয় কইরা গান করলাম। আমার গান দিয়াই ছবির শুরু। এর জন্য পরিচালক ছটকু আহমেদ আমারে পাঁচ হাজার টাকা দিছিল। এরপর আরো পাঁচটি ছবিতে অভিনয় কইরা গান করছি।

সারা জীবন গান গেয়েছেন, টাকা-পয়সাও পেয়েছেন। তবু অভাব কাটেনি কেন?

আমি কখনো টাকার ধান্দা করি নাই। মানুষ আমারে নিয়া ব্যবসা করছে। বিদেশ নিয়া যাইত; আমারে কিছু দিয়া বাকি টাকা তারা নিত। আমার লেখা গান ও সুর নিয়া অ্যালবাম কইরা আমাকে টাকা তেমন দিত না। যখন রেডিও-টেলিভিশনে গান শুরু করি, তখন গানের জন্য দিত ৬০ টাকা, ১২০ টাকা—এ রকম। নারী হইয়া গান কইরা চারটা সংসার চালাই। মাইয়া আমার কাছে থাকে। বড় নাতনিরে বিয়া দিলেও তারে দেখন লাগে। আরো দুই নাতনি ঘরে। ওরা বড় অইছে। দুজনই স্কুলে পড়ে। নুন আনতে পানতা ফুরায়, এ তো অনেক আগে থাইকাই।

সংসার চলে কিভাবে?

২০০৯ সাল থাইকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার খরচ বাবদ মাসে ১০ হাজার টাকা কইরা দেন। সেই টাকা আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আসে। আবার সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থাইকা শিল্পীভাতা হিসেবে বছরে পাই ৩২ হাজার টাকা। এর মধ্যে মাথা গোঁজার জন্য সাভারের রেডিও কলোনিতে এই জায়গাটি কিনেছি ২০০৮ সালে, ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকায়। জমির পরিমাণ তিন শতক। ২০১৩ সালে এইখানে ঘর তুলছি। এখন জমির দাম আছে ২৩ লাখ টাকা! এইখানে আমার সঙ্গে আমার মেয়ে পুষ্প আর পুষ্পর তিন মেয়ে শিল্পী আক্তার, রাবিয়া চুমকি ও দোলা থাকে। মেয়ের জামাই মাঝে মাঝে আসে, তার মেয়েদের কিছু খরচপাতি দেয়। আমি শাশুড়ি আম্মা, তাই আমারেও দুই-একটা কাপড়চোপড় দেয়। এদিকে আমি শিল্পী মানুষ, ঠিকমতো ঘরবাড়ি করার সামর্থ্য নাই। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থাইকা দয়া হইছে। তাই সরকার রাজবাড়ী শহরের পাশেই এক গ্রামে ২০ শতক জমি কিনা দিছে। জেলা প্রশাসন দুই লাখ টাকা অনুদান দিয়া বাড়ি কইরা দিছে।

শরীর কেমন এখন?

অনেক দিন অসুখে ভুগছি। শরীর এখন মোটামুটি ভালো। মুখে ব্যথা আছে। দাঁত নাই, তাই ভাত চিবায়া খাইতে পারি না। গলিয়ে খাওয়া লাগে। কানে সমস্যা ছিল। পুঁজ বের হইত। হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। এখন ভালো হইছে। তয় ভালো কইরা শুনতে পাই না। প্রেসারের জন্য মাঝেমধ্যে মাথা ঘুরায়। শরীর দুর্বল থাকে। তাই ভিটামিন খাইতে হয়।

শরীর ভালো না থাকলে তো গান গাইতে অসুবিধা হওয়ার কথা।

অসুখ হইলেও গান গাই। যদি কোথাও গান গাওয়ার জবান দেই, তাইলে অসুস্থ হইলেও হাজির হই। জবানের দাম আমার কাছে অনেক বেশি। মরলে যেন স্টেজেই মরি। কারণ আমার জীবনে গান ছাড়া আর কিছু নাই।

(১০ মে ২০১৮; রেডিও কলোনি, সাভার, ঢাকা)

সৌজন্যে- দৈনিক কালের কণ্ঠ।

(Visited 237 times, 1 visits today)