রাজবাড়ীর ৩টি রেল ইঞ্জিন থেকে রহস্যজনকভাবে ১২ ইলেক্ট্রনিক কার্ড চুরি, তদন্ত কমিটি গঠন –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

 

যথা সময়ে যাত্রীসহ ইঞ্জিন চলা শুরু করতে না করতেই তা বন্ধ করে দেয়া হয়। কারণ খুজতে গিয়ে দেখাযায় চালকের কেবিনের ভেতরে থাকা দু’টি ইলেক্ট্রনিক কার্ড হাওয়া। কেন কার্ড নেই এর কারণ খুজতে গিয়ে দেখা গেল রেলষ্টেশনে পাকিং করে রাখা আরো দু’টা ইঞ্জিন থেকেও পৃথক ভাবে খুলে নেয়া হয়েছে ১০টি কার্ড। খোয়া যাওয়া মোট ১২টি কার্ডের অভাবে প্রায় ৩৫ মিনিট লেট করে ছাড়া হয় ট্রেন। আজ সোমবার সকালে এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে রাজবাড়ী রেলষ্টেশনে। এ ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে তদন্ত কমিটি। শুরু হয়েছে প্রাথমিক তদন্তও।
রাজবাড়ী রেলষ্টেশন মাষ্টার কামরুজ্জামান জানান, পোড়াদাহ থেকে রাতে রাজবাড়ী ষ্টেশনে আসে সার্টল ট্রেন। এর আগে থেকেই সেখানে পার্কিং করে রাখা ছিলো রাজবাড়ী-ফরিদপুর ট্রেন এবং মধুমতি ট্রেনের ইঞ্জিন। গতকাল সকাল ৬ টায় রাজবাড়ী রেলষ্টেশন থেকে গোয়ালন্দের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবার জন্য চালু করা হয় সার্টল ট্রেনের ইঞ্জিন। তবে চালক ট্রেন নিয়ে চালানোর চেষ্টা করতে না করতেই তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং জানান তার ইঞ্জিন কেবিনের ভেতরে থাকা দু’টি ইলেক্ট্রনিক কার্ড নেই। আর ওই কার্ড ছাড়া চালানো যাবে না ট্রেন। ওই সময়ই বিষয়টি ইঞ্জিন রক্ষনাবেক্ষণের কাজে জড়িত লোক ফোরম্যানকে খবর দেয়া হয়। লোক ফোরম্যানসহ সংশ্লিষ্ঠারা ওই সময়ই ষ্টেশনে আসেন এবং তারা দেখেন সেখানে পাকিং করা অপর দু’টি ট্রেনের ইঞ্জিন থেকেও পৃথক ৫টি করে ইলেক্ট্রনিক কার্ড খুলে ফেলা হয়েছে। যে কারণে সার্টল ট্রেনটি ৩৫ মিনিট দেড়িতে তার গন্তেব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। একই ভাবে রাজবাড়ী-ফরিদপুর ট্রেনটিও ৭.৫০ এর স্থলে ৮.২০ মিনিটে রাজবাড়ী রেলষ্টেশন ত্যাগ করে।
রাজবাড়ীর সিনিয়র সাব এসিটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার (লোক ফোরম্যান) আব্দুল খালেক বলেন, তার দপ্তরের এসএস ইলেক্ট্রিশিয়ান মোঃ আব্দুল ওহাব আলী দীর্ঘ ২০ বছর ধরে রাজবাড়ী জেলায় কর্মরত বয়েছেন। আর তিনি এসেছেন রাজবাড়ীতে ৩ বছর। তিনি রাজবাড়ীতে যোগ দেবার পর থেকেই দেখতে পান ওহাব ঠিকমত কাজ করেন না। তার নির্দেশনাও মানেন না। সেই সাথে অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে করেন অসাদাচারণ। যে কারণে বিষয় গুলো উল্লেখ করে রেলওয়ে পাকশী কার্যালয়কে অবহিত করেন। যার প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ গত ১১ সেপ্টেম্বর ওহাবকে ইশ^রদীতে বদলী করেন। আর এর পরই শুরু হয় ওহাবের অত্যাচার। তাকে মুঠোফোনে হুমকী দেবার পাশাপাশি দু’দফায় সর্বহারাদের নাম উল্লেখ করে ডাকযোগে চিঠির মাধ্যমে তাকে হত্যার হুমকী প্রদান করে। যে কারণে তিনি গত ২৭ সেপ্টেম্বর ওহাবের বিরুদ্ধে রাজবাড়ী রেলওয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়রীর আবেদন করেন। সেই সাথে তিনি গত রবিবার ওহাবকে অবমুক্ত করণ (বদলীর ছাড়পত্র) করেন। এতে ওহাব তার ও লোকসেডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর উপর আরো ক্ষুব্দ হন। যে কারণে গত রবিবার রাতের কোন এক সময় কৌশলে রাজবাড়ী রেলষ্টেশনে প্রবেশে করেন এবং ষ্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনিটি ইঞ্জনের চালকের কেবিন থেকে ১২টি ইলেক্ট্রনিক কার্ড খুলে নেন।
তিনি আরো বলেন, খবর পেয়ে তিনি রাজবাড়ী রেলষ্টেশনে আসেন এবং অন্য দু’টি ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে ইলেক্ট্রনিক কার্ড সংগ্রহ করে প্রথমে সার্টেল ট্রেন এবং ফরিদপুর থেকে আসা মালগাড়ীর ইঞ্জিন থেকে একই ভাবে ওই কার্ড সংগ্রহণ করে রাজবাড়ী-ফরিদপুর ট্রেন গন্তেব্য পাঠান। অপর দিকে, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার পর রাজশাহী থেকে আসা মধুমতি ট্রেনে আনা ইলেক্ট্রনিক কার্ড দিয়ে পরবর্তী ইঞ্জিনটি সচল করা হয়। সেই সাথে নিয়ম অনুযায়ী রাজশাহী থেকে আসা মধুমতি ট্রেনের ইঞ্জিনটি রাজবাড়ী ষ্টেশনে রেখে ইলেক্ট্রনিক কার্ড দিয়ে সচল করা ইঞ্জিনটি দিয়ে মধুমতি ট্রেন গোয়ালন্দ পাঠানো হয়।
রাজবাড়ীর সাব লোক মাস্টার সরোয়ার আলম বলেন, ওহাব দীর্ঘ দিন রাজবাড়ীতে কর্মরত থাকায় নানা রকম অপকর্মে জড়িয়ে পরে। তার বিরুদ্ধে অফিসের কেউ কথা বলার সাহস পর্যন্ত পায় না। তার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে লোক ফোরম্যান ওহাবকে বদলী করার জন্য পত্র লেখেন। আর বদলীর অর্ডার হাতে পাবার পর পরই ওহাব লোক ফোরম্যানসহ এ দপ্তরের সকলের ক্ষতি করতেই উঠে পরে লাগে। তারা সবাই যে ফাঁসে সে কারণে ইঞ্জিনের এই ইলেক্ট্রনিক কার্ড চুরি করে। তিনি আরো বলেন, এই ইলেক্ট্রনিক কার্ড রেলইঞ্জিন চালানো ছাড়া কোন কাজে আসে না। তাছাড়া চোররাতো যানেনা এই কার্ড কোথায় থাকে এবং কি কাজেই বা ব্যবহার করা হয়। ওহাব ছাড়া এই কাজ আর কারও করার কথা না।
সার্টেল ট্রেনের চালক বিপ্লব কুমার সরকার জানান, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ট্রেনটি বিলম্বিত হয়। তবে তারা যথা সময়ে গন্তব্যে যাওয়া এবং ফিরে আসতে পেরেছেন।
এসএস ইলেক্ট্রিশিয়ান মোঃ আব্দুল ওহাব আলী রাজবাড়ীতে ২০ বছর অবস্থান করার কথা স্বীকার করে জানান, তাকে অন্যায় ভাবে বদলী করা হয়েছে। তিনি কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করেন না। তাকে বদলী করায় তিনি গতকাল সকালে ইশ^রদীর নতুন কর্মস্থলে যোগ দান করার জন্য রওনা হলেও সকালেই তিনি ইঞ্জিন থেকে ইলেক্ট্রনিক কার্ড চুরির ঘটনা শুনে বাড়ীতে অবস্থান করছেন। তবে ওই কার্ড চুরির ঘটনার সাথে তার কোন সংশ্লিষ্ঠতা নেই বলেও তিনি দাবী করেন।
এদিকে, গতকাল দুপুরে রাজবাড়ীর রেলওয়ে বাংলোতে অবস্থানরত পাকশী লোকসেডের ওপি এন্ড এফ (অপারেশন ফুয়েল) শাহিনুল হক অপু বলেন, ইলেক্ট্রনিক কার্ড চুরির বিষয়টি তাৎক্ষণিক প্রাথমিক তদন্ত করতে তিনি রাজবাড়ীতে এসেছেন। ইতোমধ্যে রেলস্টশনের কর্মকর্তা ও রেলওয়ে পুলিশের সাথে কথা বলেছেন। সেই সাথে তিনিটি ট্রেনের ইঞ্জিনের সাথে সংশ্লিষ্ঠদের ছয় জনের কাছ থেকে লিখিত প্রতিবেদন চেয়েছেন। একই সাথে কর্তৃপক্ষ তাকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ঠ পৃথক একটি তদন্ত কমিটির তৈরী করেছে। এই কমিটির তদন্তের পর দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো বলেন, রাজবাড়ী রেলষ্টেশনের ১ নং প্লাট ফর্মে রয়েছে রেলওয়ে থানা ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বিহিনীর কার্যালয়ে। অথচ চোরেরা তিনটি ইঞ্জিন থেকে ইলেক্ট্রনিক কার্ড গুলো চুরি হলো আর তারা কেউ কিছুই জানলোনা। এ বিষয়টিও প্রশ্নবৃদ্ধ।
রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার ওসি সলেমান মোল্লা জানান, রাজবাড়ীর লোক ফোরম্যান আব্দুল খালেক হুমকী-ধামকীর ব্যপারে তার কাছে এসএস ইলেক্ট্রিশিয়ান মোঃ আব্দুল ওহাব আলীর বিরুদ্ধে অভিযাগ প্রদান করেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্ধর্তন কতৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি পেলে তা জিডি আকারে গ্রহণ করা হবে। তবে গতকাল বিকাল পর্যন্ত ইলেক্ট্রনিক কার্ড চুরির ব্যাপারে কোন অভিযোগ করা হয়নি।

(Visited 269 times, 1 visits today)