১৫ দিনের ট্রেনিং নিয়েই বিশেষজ্ঞ সার্জন ! গোয়ালন্দে ভুল অপারেশনে ধুকছে এক যুবক –

আজু সিকদার,  শামীম শেখ, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

একটি ওষুধ কোম্পানীর সৌজন্যে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সার্জারি বিষয়ে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এসএসসি পাশ আলতাফ হোসেন। এতেই তিনি সার্জারিতে অভিজ্ঞ ডাক্তার বলে নিজেকে জাহির করছেন। দৃষ্টি নন্দন সাইন বোর্ড, আকর্ষনীয় প্যাড, ভিজিটিং কার্ডসহ বিভিন্নভাবে নিজের দক্ষতার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে আকৃষ্ট হয়ে অনেক রোগী তার কাছে আসছেন। সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরো বেশী করে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া বাজারের প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত কথিত এই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বার। সার্জারি ছাড়াও যে কোন জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত রোগী আসলেও তার এখানে সেবা মেলে। চিকিৎসা বিদ্যার প্রাথমিক গন্ডি পার না হলেও তিনি রোগীদের বিভিন্ন উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এন্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ওষুধ লিখে দেন সচরাচর। তার ভুল অপারেশনের শিকার হয়ে প্রায় ১ মাস ধরে ধুঁকছেন আনোয়ার হোসেন (২৮) নামের স্থানীয় এক যুবক। সেই সাথে আলতাফকে দেয়া টাকাসহ ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে অন্তত ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে সে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আসিফ মাহমুদের তত্ত্বাবধানে আছে। আলতাফ হোসেন ছাড়াও গোয়ালন্দের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরণের হাতুরে ডাক্তারের দৌরাত্ম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
আলাপকালে অসুস্থ্য যুবক আনোয়ার হোসেন জানান, প্রায় ১ মাস আগে আমার পেটের ডান দিকের টিউমারের সমস্যা নিয়ে আলতাফ হোসেনের সাথে পরামর্শ করতে যাই। সে সময় তিনি নিজেই এ ধরণের টিউমারের অপারেশন করে থাকেন বলে আমাকে আশ্বস্ত করেন। পরদিন (২৭ আগস্ট) গেলে তিনি তার ফার্মেসির খোলা টেবিলের উপর আমাকে শুইয়ে দিয়ে অজ্ঞান করে টিউমার অপারেশন করে দেন। এ বাবদ তিনি ওষুধ ও অপারেশন চার্জ বাবদ ৩ হাজার ১শ টাকা নেন। কিন্তু কয়েকদিন পর থেকে তার অবস্থা খারাপ হতে থাকে। বিষয়টি তাকে ফোনে জানালেও গুরুত্ব দেননি। পরে সার্জারীতে বিশেষজ্ঞ গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আসিফ মাহমুদের কাছে যাই। বর্তমানে তার তত্ত্বাবধানে আমার চিকিৎসা চলছে। আমি অতিশয় দরিদ্র। চিকিৎসা বাবদ ইতিমধ্যে আমার প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো ব্যায় হয়ে গেছে। এর বেশীর ভাগই ধার-দেনা করে যোগার করা। আমার মতো আরো অনেক রোগী এভাবে তার অপচিকিৎসার শিকার হয়ে ভুগছেন বলে খবর পেয়েছি। আমি তার বিচার ও ক্ষতিপুরণ দাবী করছি।
এ বিষয়ে কথা বলতে আলতাফ হোসেনের ফার্মেসীতে গেলে দেখা যায়, তিনি তার সেখানে বসে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসা রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন এন্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন দামী ওষুধ লিখে নিজের দোকান থেকেই বিক্রি করছেন।
তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বলেন, তিনি এসএসসি পাশ। ২০১১ সালে ঢাকা শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন হতে রেনেটা ওষুধ কোম্পানীর সৌজন্যে ১ বছর মেয়াদী এলএমএএফ (লোকাল মেডিকেল এসিস্টেন্ট ফ্যামিলি প্লানিং) ও আমএমপি (রুরাল মেডিকেল প্রাকটিশনার) কোর্স করেছেন। এ ছাড়া ওই সংস্থা হতেই সার্জারী বিষয়ে (খাৎনা ও ফোঁড়া) ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
মফস্বল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সহায়কের স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্স করে নিজেকে ডাক্তার, সার্জারীতে অভিজ্ঞ এবং উচ্চ মাত্রার ওষুধ লেখার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি অকপটে স্বীকার করেন এগুলো করা তার ঠিক হচ্ছে না। তাছাড়া শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন থেকে কোর্স করে পরিচয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালের নাম ব্যবহার করাকেও তিনি রোগীদের সাথে প্রতারণা বলে মেনে নেন। যুবক আনোয়ার হোসেনকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঝুঁকিপুর্ণভাবে অপারেশন করার ব্যাপারে তিনি বলেন, অনেকদিন ধরেই তো এ ধরণের অপারেশন করি। সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞ সার্জনের কাছে ওই রোগীকে নিয়ে যাই। কিন্তু আনোয়ার পরবর্তীতে তার কাছে আর আসেনি।
এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসিফ মাহমুদ জানান, আনোয়ার হোসেনের টিউমার অপারেশন সম্পূর্ণ ভুল ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে করা হয়েছে। মূলত এ ধরণের রোগীদের গায়ে হাত দেয়ারই অধিকার নেই আলতাফ হোসেনদের মতো স্বল্প মেয়াদী কোর্স করাদের। বিষয়টি এতো সহজ হলে ৪-৫ বছর ধরে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যায় করে কেউ মেডিকেল পড়তো না। আমরা দ্রুত ভুয়া চিকিৎসকদের ব্যাপারে অভিযান পরিচালনা করবো।

(Visited 287 times, 1 visits today)