মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিলেন রাজবাড়ীর চরশ্যামনগর মাদ্রাসার সুপার ! –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

দীর্ঘ দিন ধরে ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য সেবন, পতিতাপল্লীতে গমন, অর্থ আতœসাৎ, ছুটি নিয়ে ফিরে এসে আবেদনপত্র ছিড়ে ফেলে ফের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর প্রদান, বিনা অনুমতিতে প্রতিষ্ঠানে না আসাসহ বহুবিধ অভিযোগ পাওয়া গেছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের চরশ্যামনগর দাখিল মাদ্রাসার সুপার মোঃ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। ওই সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে এলাকায় পোষ্টারিং করার পাশাপাশি গতকাল শনিবার সকালে সুপার কামরুজ্জামানের বহিস্কারের দাবীতে এই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।
বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী নবম শ্রেণীর ছাত্র আহসান আলী মোল্লা ও পপি আক্তার, নবম শ্রেণীর ছাত্র মোঃ নাজমুল হাসান ও মোঃ ফয়সাল জানায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা মাদক গ্রহণ না করার জন্য শিক্ষার্থীদেও পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তবে তাদের প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ উল্টা। সয়ং তাদের মাদ্রাসার সুপার মাদ্রক সেবন করে এবং নিষিধ্যপল্লীতেও (পতিতা পল্লী) গমন করেন। ঠিক মত আসেন না তিনি মাদ্রসায়। মাঝে মধ্যে খাতায় হাজিরা দেবার জন্য তিনি আসেন। তবে অল্প সময় অবস্থান করে নিজের ইচ্ছামত চলে যান। নেন না কোন ক্লাস। তার মাদক গ্রহণ এবং পতিতাপল্লী গমনের বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে গেছে। ফলে লোকেরা তাদের (শিক্ষার্থীদের) দেখলে বাজে মন্তব্য করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা লজ্জায় পড়ে যাচ্ছে। যে কারণে তারা আর ওই শিক্ষককে এ প্রতিষ্ঠানে চান না। তাই তারা এই প্রতিষ্ঠান থেকে সুপার কামরুজ্জামানের বহিস্কার করার দাবী জানান।
বিষয়টি নিয়ে ওই মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম, জালাল উদ্দিন, আব্দুল করিম, আলমগীর হোসেনের সাথে কথা হয়। সে সময় ওই সব শিক্ষকরা বলেন, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তৎকালিন কর্তৃপক্ষ দু’দফা সুপার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অনভিজ্ঞ কামরুজ্জামানকে এই মাদ্রাসার সুপার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। তবে অভিজ্ঞতা না থাকায় টানা দশ বছর চাকুরীর পর সুপারের ভাতা গ্রহণ করতে শুরু করেন কামরুজ্জামান। এরই মাঝে বেড়িয়ে আসতে শুরু করে তার আসল রুপ। ১ লাখ ৪০ হাজার ৪শত ৬২ টাকা আতœসাৎ করাসহ নানা ধরণের অভিযোগের কারণে ২০১৫ সালে ম্যানেজিং কমিটির তৎকালিন সভাপতি জালাল উদ্দিন সুপার কামরুজ্জামানকে সাময়িকভাবে বরখান্ত করেন। যদিও সে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরৎ দেন তবে আজ অবধি ৪ শত ৬২ টাক ফেরৎ দেননি।
তারা আরো বলেন, নানা ধরণে কাজ, নিয়োগ প্রদান এবং হাওলাত গ্রহণের কথা বলে সহকারী প্রধান শিক্ষককের কাছ থেকে ২৯ হাজার টাকা, সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের কাছ থেকে দুই লক্ষাধিক টাকা,জালাল উদ্দিনের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা, আব্দুল করিমের কাছ থেকে সাড়ে ৩লাখ টাকা, আলমগীর হোসেনের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা, মোঃ হারুনের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বেশিরভাগ টাকাই সে নিয়ে চেক জমা রেখে। অথচ বছরের পর বছর পার হলেও তাদের টাকা ফেরতো দিচ্ছেই না বরং আরো টাকা হাওলাত চায়।
তারা বলেন, সুপার কামরুজ্জামান দীর্ঘ দিন ধরে ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য সেবন, পতিতাপল্লীতে গমন, অর্থ আতœসাৎ, ছুটি নিয়ে ফিরে এসে আবেদনপত্র ছিড়ে ফেলে ফের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর প্রদান, বিনা অনুমতিতে প্রতিষ্ঠানে না আসাসহ নানা ধরণের অনিয়ম করে আসছে। তার এহেন কর্মকান্ডের কারণে এলাকায় হয়েছে পোষ্টারিং। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছ থেকে নানা ধরণে লজ্জাসকর কথাবার্তা শুনতে হচ্ছে। তারা মনে করেন, মাদ্রাসার শিক্ষককরা সমাজের সম্মানীত ব্যক্তি। অথচ এই সুপারের কারণে তারা চরম মানসিক অশান্তির মধ্যে রয়েছে।
সহকারী সুপার আব্দুল মতিন বলেন, সুপার ছুটি নিয়ে ফিরে এসে আবেদনপত্র ছিড়ে ফেলে ফের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর প্রদান করে থাকেন। সেই সাথে বিনা অনুমতিতে প্রতিষ্ঠানে না আসা এবং আসলেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে খেয়াল খুশিমত চলে যান। হাজিরা খাতায় থাকা হিসেব মতে চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে গতকাল পর্যন্ত সুপার ৪৪ দিন মাদ্রাসায় হাজির হয়েছেন। তাছাড়া বিগত ২০১৭ সালে সুপার মাত্র ৬৩ দিন হাজির ছিলেন। সুপারের কারণে মাদ্রাসার শিক্ষারমন উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তার পরও তাদের অন্যান্য শিক্ষকদের আন্তরিকতায় পাঠ দান সচল রাখা হয়েছে। মাদ্রাসায় থাকা ৩১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী ফলাফলও করছেন সন্তোষ জনক। বিগত বছরের দাখিল পরীক্ষায় ২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৪ জন পাস করেছেন।
সে সময় হাজিরা খাতা নিরিক্ষা করে দেখাযায়, গত আগষ্ট মাসের ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ তারিখ সুপার সিএল ছুটি গ্রহণ করেন। তবে ছুটি থেকে ফিরে এসে তিনি ১১ আগষ্ট বাদ রেখে ওভার রাইটিং করে অন্য তারিখ গুলোতে স্বাক্ষর করেছেন।
এদিকে, রাজবাড়ী জেলা শহরের পশ্চিম ভবানীপুরে অবস্থিত জাগরণ মাদকানক্তি নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে জানাযায়, কামরুজ্জামান ওই কেন্দ্রে গত ১৭ আগষ্ট তিনি চিকিৎসা গ্রহণের জন্য ভর্তি হন এবং গত ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি চিকিৎসা নিয়ে বাড়ী ফিরে যান।
ওই নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক রেজাউল করিম টিবলু বলেন, কামরুজ্জামানের যে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে তাতে তার কিছুটা উন্নতি হলেও পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব হয়নি। কমপক্ষে তার চার মাস এখানে ভর্তি থাকা প্রয়োজন ছিলো। গত ৩০ আগষ্ট কামরুজ্জামান এই নিরাময় কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় নিজের দাঁড়ি কর্তন করেছে। কামরুজ্জামানকে তার স্ত্রী ফারজানা আফরোজ এখানে ভর্তি করে। তবে যেহেতু তিনি মাদ্রাসার সুপার তাই তার অফিসিয়াল সমস্যা থেকে বাঁচানোর স্বার্থে এখান থেকে রিলিজ করা হয়েছে। তাকে পতিতাপল্লী থেকে ধরে এনে এখনে ভর্তি করা হয়েছে কি না তা তিনি জানাতে চাননি।
ওই মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সুলতানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মিয়া বলেন, একজন মাদ্রাসার সুপারের এমন অধপতন হওয়া উচিৎ নয়। কয়েকদিন আগে কামরুজ্জামানের ছেলে এসে তাকে একটা ছুটির আবেদন দিয়ে গেছে। ওই আবেদনে কামরুজ্জামান বলেছেন, তিনি শাররীক ভাবে অসুস্থ্য যে কারণে তার আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছুটি প্রয়োজন। তবে সুপারকে নিয়ে তারা নানা ধরণের অভিযোগ পেয়েছেন, যে কারণে খুব শিঘ্রই পরিচালনা কমিটির সভা আহবান করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
এবিষয়ে জানতে সুপার কামরুজ্জামানের একাধিক মুঠোফোনে কল দেয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পারমিস সুলতানা জানান, সুপাররা সাধারণত ওই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতির কাছে আবেদন পত্র দিয়ে ছুটি গ্রহণ করেন এবং সেটা তাদের অবহিত করেন। তবে কামরুজ্জামানের ছুটি গ্রহণের কোন অবহিত করণে পত্র তারা পাননি। তবে বিষিয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান।
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক মোঃ শওকত আলী বলেন, কোন লিখিত অভিযোগ তিনি পাননি। অভিযোগ পেলে সুপার কামরুজ্জানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

(Visited 774 times, 1 visits today)