‘দেখে না কেউ হাসি শেষে নীরবতা…’ ওরা এখন দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর বাসিন্দা –

আজু শিকদার, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

ববি, শিখা, লাবনী, চাঁদনী ওরা দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর বাসিন্দা। যদিও ওদের নির্দিষ্ট কোন নাম নেই। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ওদের নামও পরিবর্তন হয়। ভাগ্যই এদের করেছে নাম-ঠিকানা বিহীন। জীবন-যৌবন সম্পর্কে জানার আগেই ওরা হয়ে গেছে যৌনকর্মী। জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহনের বয়স হওয়ার আগেই পরিবেশ ওদের বাধ্য করেছে এ পেশায় আসতে। এ রকম হাজারো গল্প দেশের বৃহত্তম গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর বাসিন্দাদের।
এ পথে আসার পেছনে প্রত্যেকের জীবনেই থাকে কষ্টের দীর্ঘ ইতিহাস। জীবিকার প্রয়োজনে কৃত্রিম আনন্দের মধ্যে তা লুকিয়ে রাখতে হয়। প্রতিদিন যৌনপল্লীর বিভিন্ন গলিতে হাসিমুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় খদ্দের ধরতে। কারণ হাসি মুখ না দেখলে খদ্দের পাবে না। এক পৃথিবী কষ্ট বুকে চেপে কৃত্রিম হাসি মুখে খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকে ওরা। কাউকে বুঝতে বা জানতে দেয় না তারা।
এই অভিশপ্ত জীবন কাটানো দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর বাসিন্দা রুপা (১৮)। ময়মনসিং শহরে তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই সাজু-গুজুর প্রতি ছিল তার দারুন আগ্রহ। এ আগ্রহই তার জীবনের কাল হয়েছে। সু-শ্রী চেহারার সাথে কথা বলার বাচনভঙ্গিতে সহজেও ফুটে ওঠে আভিজাত্য। আলাপকালে সে জানায়, বাবা ছোট-খাটো একজন ব্যবসায়ী। বছর তিনেক আগের কথা। তাদের বাড়িতে ভাড়া থাকত বিউটিপার্লারে কাজ করা বৃষ্টি নামের এক নারী। লেখাপড়ায় তার তেমন আগ্রহ ছিল না। বৃষ্টি তাকে বিউটি পার্লারের কাজ শোখার কথা বলে ফুঁসলিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে আসে টাঙ্গাইলে। সেখানে একটি বাসায় তাকে আটকে রেখে হনন করা হয় তার জীবনের অমূল্য সম্পদ। প্রায় এক মাস সেখানে তাকে লিপ্ত করে যৌন পেশায়। এসময় তাকে দিয়ে তার পরিবারকে জানায় ‘আমি নিজের পছন্দে বিয়ে করে নিয়েছি, আমাকে আর খোঁজাখুঁজি করো না। মাসখানেক পর সেখান থেকে বৃষ্টি তাকে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে এনে বিক্রি করে দেয়। সে হয়ে যায় তালিকাভুক্ত যৌনকর্মী। সে আরো জানায়, প্রথম দিকে তাকে একজন পাহাড়াদার সব সময় পাহাড়া দিয়ে রাখত। এরই মাঝে একদিন সুযোগ বুঝে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর কথিত পাহাড়াদার বাহিনীর সহযোগিতা চায়। কিন্তু তাকে সহযোগিতা করার বিনিময়ে ওই বাহিনীর কর্তা ব্যাক্তিরা দাবি করে ২০ হাজার টাকা। ওই টাকা দেয়ার সামর্থ না থাকায় তাদের কোন সহযোগিতা তো সে পায়ই নাই বরং এ অপরাধে তার উপর নেমে আসে পল্লীর সর্দার্নীর হাতে শারীরিক নির্যাতন। এরপর থেকে সে এ পেশায় নিজেকে অনেকটা মানিয়ে নিয়েছে। এখনো পরিবারের সাথে যোগাযোগ আছে। কিন্তু তারা জানে না তার এই অভিশপ্ত জীবন সম্পর্কে। সে বলে, ‘আমাকে এই পল্লীতে আসা একটি ছেলে ভালোবাসে। সে আমাকে বিয়ে করার আশ্বাস দিয়েছে। ও আমাকে ভরনপোষন না করলেও যদি শুধু স্বীকৃতি দেয় ওর পরিচয়েই আমি ফিরে যাব আমার পরিবারের কাছে।’
এ পল্লীর আরেক বাসিন্দা রানী (৩৫)। মানিকগঞ্জে উচ্চ বর্ণের এক হিন্দু পরিবারে তার জন্ম। জীবন সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝে ওঠার আগে কিশোরী বয়সেই সে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এক মুসলিম ছেলের সাথে। তার হাত ধরে সেই বয়সেই রানী ঘর ছাড়ে। কিন্তু তার সেই প্রেমিক মুলত ছিল একজন প্রতারক। তাকে নিয়ে বিক্রি করে দেয় তৎকালীন নারায়নগঞ্জ যৌনপল্লীতে। চোখের পানি মুছতে মুছতে রানী জানায়, এরপর থেকে শুরু হয় তার অন্ধকারে পথচলা। নারায়নগঞ্জ থেকে উদচ্ছেদ হলে চলে আসে দৌলতদিয়া। এখানে তার গর্ভে জন্ম হয় তিনজন ছেলে-মেয়ের। এই পেশা থেকে আয় করা টাকা দিয়ে ছেলেকে সেভ হোমে এবং মেয়েকে পল্লীর বাইরে একটি বাড়িতে মাসিক খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মানুষ হলে তার মুক্তি মিলবে এই অভশপ্ত জীবন থেকে এই আসায়।
জন্মটাই যেন আজন্মের পাপ মৌসুমির। এই যৌনপল্লীতেই তার জন্ম। বাবা কে তা না জানলেও মায়ের পেশা খুব কাছ থেকে দেখেছে সে। ৫ বছর বয়সে তাকে তার মা একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে ভর্তি করে দেন। সারাদিন সেখানে থেকে পড়াশুনা করে সে। কিন্তু দিন শেষে থাকতে হয় মায়ের ঘরে। সেখানে মায়ের অভিশপ্ত পেশা উপলগ্ধি করতে তার খুব বেশী সময় লাগেনি। শিশু মনে এই অভিশপ্ত পেশার প্রভাব না পড়ার কোন কারণ নেই। এক সময় যৌবন কি তা বুঝে ওঠার আগেই তার কাছে তা হয়ে ওঠে জীবিকার মাধ্যম। তার শুরু হয় অভিশপ্ত জীবনে পথ চলা।
চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা উপজেলার নীলা (৩৬)। ছোট ছোট তিন বোনকে রেখে বাবা-মা দু’জনই মারা যান তার। তখন এক রকম না খেয়েই চলে তাদে জীবন। এ পরিস্থিতিতে তার বড় বোন বাড়ি থেকে বের হন কাজে সন্ধানে। কি কাজ করতেন তারা তা জানতেন না। সেই বোনের টাকায়ই জোটে তাদের এক বেলার খাবার। একদিন বড় বোন ওই কাজের জন্য তাকেও নিয়ে আসে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে। গত বিশ বছর ধরে তিনি এখানেই আছেন। তিনি আবেগ ভরা কণ্ঠে বলেন, ‘ এ অভিশপ্ত পথে আর ভালো লাগে না। এখন ভালো কিছু করতে চাই।’ তবে তা কি ভাবে সম্ভব তা সে নিজেও জানে না।
পল্লীর আরেক বাসিন্দা নুপুর (১৮)। তার বাড়ি যশোর জেলায়। কথা হয় তার সাথে সে জানায়, তার বাবার ছোট একটা মুদি দোকান আছে। কিন্তু ঘরে সৎ মা’র নির্যাতন সইতে না পেরে তার বড় বোনের সাথে কাজের সন্ধানে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দৌলতদিয়া ঘাটে এসে সে তার বোনকে হারিয়ে ফেলে। এলোমেলো ভাবে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় সে ঢুকে পড়ে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে আটকা পড়ে যায় পল্লীর এক সর্দানীর কাছে। এরপর এক বছর তাকে দিয়ে ওই সর্দার্নী যৌন ব্যাবসা চালিয়ে তাকে মুক্ত করে দেয়। কিন্তু সে যে স্বাভাবিক জীবনের পথ অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে। তাই পল্লীতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানেই থাকে। এই সমাজের ওপর অনেক অভিমান তার। কলঙ্কিত এই জীবন নিয়ে আর কোনোদিন সে ফিরে যেতে চায় না স্বাভাবিক জীবনে। কেন জানতে চাইলে তার সোজা উত্তর, এ সমাজ আমাকে আর কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেবে না, মেনে নেবে না। বাকি জীবনটা রাস্তায় কাটাতে হবে।
প্রায় ৫ ফুট উচ্চতার ছিপছিপে গড়নের শ্যামলা মেয়ে বৃষ্টি (১৮)। ছোট বেলায় অনেক স্বপ্ন দেখত সে। এখন সে আর কোন স্বপ্ন দেখে না। জীবন যুদ্ধে সে হারিয়ে ফেলেছে তার স্বপ্ন। কুড়িগ্রাম জেলার দরিদ্র এক পরিবারের মেয়ে বৃষ্টি। দরিদ্র পরিবারে একটু স্বচ্ছলতা দিতে স্থানীয় পরিচিত এক ব্যাক্তির হাত ধরে রাজধানীতে আসে গার্মেন্টসে কাজের সন্ধানে। সামান্য বেতনে কিছুদিন কাজও করে। কিন্তু তা দিয়ে তার চলছিল না। একদিন এক সহকর্মী আরো ভালো বেতনে কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রলভোন দেখিয়ে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেয়। প্রথম দিকে প্রাণপন চেষ্টা করেছে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তির। কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হয়েছে। এ ভাবে একটা সময় সে গাঁ ভাসিয়ে দিয়েছে যৌনপল্লীর স্রোতে। শরীরের দামে কেনা জীবিকায় আষ্ঠে-পৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যায় তার জীবন। এখন মাঝে মধ্যেই বাড়িতে টাকা পাঠায় বৃষ্টি। তবে চাকরি করে নয়, নিজেকে বিক্রি করে। এখন আর সে পিছে ফিরতে চায় না। কারণ ফিরে কি হবে? জীবন তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তার বিশ্বাস নিজের পরিবারও আর তাকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহন করবে না। তাই যেমন চলছে তেমনই চলুক না বলে জানায় সে।
দৌলতদিয়া যৌনপল্লী সংলগ্ন একটি এনজিও অফিসে কথা হয় পাপিয়া (৩৫) নামের এক নারীর সাথে। বেশভুশায় ফুটে উঠেছে আভিজাত্যের ছাপ। তিনি মহা উদ্বিঘœ তার জাতীয় পরিচয় পত্রে স্বামীর নাম সংশোধন নিয়ে। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি সহযোগিতা চেয়ে জানালেন, তিনি এক সময় দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে থাকতেন। তখন জাতীয় পরিচয় পত্রের তথ্য সংগ্রহ চলছিল। তথ্য সংগ্রহকারী তার স্বামীর নাম জানতে চাইলে তিনি তার কাছে মাঝে মধ্যে আসা এক ব্যাক্তির নাম বলে। সে অনুযায়ী তার জাতীয় পরিচয় পত্র হয়ে যায়। কিন্তু এর কিছুদিন পর তাকে ভালোবেসে বিয়ে করেন এক ব্যবসায়ী। বর্তমানে সেখানে তিনি সংসার করছেন। একটি কন্যা সন্তানও হয়েছে তাদের ঘরে। এখন কন্যার বাবার পরিচয় সহ বিভিন্ন কাজে তাকে দারুন সমস্যার সন্মুখীন হতে হচ্ছে। স্বামীর নাম পরিবর্তন করতে হলে নিয়ম অনুযায়ী তালাকনামা প্রয়োজন হয়। কিন্তু তারতো বিয়েই হয়নি। তালাকনামা পাবে কোথায়। কি ভাবে তিনি যৌনপল্লীতে এসেছিলেন জানতে চাইলে তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, চার বোন ও মাকে রেখে বাবার মৃত্যু হয়। বড় বোন অভাবের তাড়নায় কাজের খোঁজে ঢাকায় গিয়ে ঠিকানা হয় নারায়নগঞ্জের যৌনপল্লী। সেই প্রিয় বোন বাড়িতে গিয়ে আমাকে বলেছিল, ‘তোর দুলাভাই বিদেশে থাকে, আমি একা থাকি, তুই আমার কাছে থাকবি।’ তার কথা বিশ্বাস করে তার সাথে আসলে সেই বোন আমাকে জোর করে এই অভিশপ্ত জীবন যাপনে বাধ্য করে।
দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে অন্তত দুই হাজার যৌনকর্মীর বসবাস। এদের বেশীর ভাগই ফিরতে চায় স্বাভাবিক জীবনে। পাল্টে নিতে চায় তাদের জীবনের গতিপথ। কিন্তু তাদের গন্তব্য জানা নেই। কারণ, কে বাড়াবে সহযোগিতার হাত? কে দেখাবে সহানুভূতি? সূত্র মতে, দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে এর বাইরেও শত শত শিশু-কিশোরী যৌনকর্মী রয়েছে। এসব শিশু যৌনকর্মী অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছে। তাদের ওপর নির্যাতনের চিত্র আরো ভয়াবহ। এদের অনেকেই যৌনকর্মীদের মেয়ে বা পরিবারের দারিদ্রতার কারণে চাকরির জন্য ঢাকায় এসে দালালের খপ্পরে পড়ে বিক্রি হয়ে যায়। এরপর তাদের ঠিকানা হয় দেশের বিভিন্ন যৌনপল্লী। আর এ পথ থেকে ফিরে যেতে পারে না স্বাভাবিক জীবনে।
এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, যৌনকর্মীদের অস্তিত্ব বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আর যাদের অস্তিত্ব স্বীকৃত নয়, তাদের কর্মসংস্থান দিয়ে পুনর্বাসনের মত তেমন কোন প্রকল্প সমাজ সেবা অধিদপ্তরে নেই। তবে যৌনকর্মীদেরকে সামাজিক প্রতিবন্ধি হিসেবে গণ্য করে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের সীমিত আকারে সামাজিক প্রতিবন্ধি পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক উদ্ধার হওয়া নারীদের ওই সকল কেন্দ্রে পাঠানো হয়ে থাকে। এছাড়া যৌনপল্লীতে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার সাথে সমন্বয় করে যৌনকর্মী ও তাদের সন্তানদের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে স্থানীয় সমাজ সেবা অধিদপ্ত। (এ প্রতিবেদনে প্রতিটি নাম ব্যবহার করা হয়েছে ছদ্মনাম হিসেবে)

(Visited 266 times, 1 visits today)