ভাঙনের মুখে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ও কয়েকশ পরিবার –

আজু শিকদার, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া পয়েন্টে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। এতেকরে দেশের গুরুত্বপূর্ন দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের দৌলতদিয়ার একাধিক ফেরি ঘাট চরম ভাঙন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এছাড়া ফেরি ঘাট সংলগ্ন দু’টি গ্রামের কয়েকশ পরিবার ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গত বছর পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে দৌলতদিয়ার ৫টি ফেরি ঘাটের সবগুলোই একাধিকবার স্থানান্তর করতে হয়। ভাঙনে প্রায় ১ মাস ধরে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌরুটে যান পারাপার কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এতে চরম দূর্ভোগে পড়েন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার লাখ লাখ মানুষ। সেই সাথে ব্যাহত হয় পন্যদ্রব্য পারাপার। ভাঙনে ফেরিঘাট সংলগ্ন বাহির চর, ছিদ্দিক কাজী পাড়া, শাহাদত মেম্বার পাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের কয়েকশ পরিবারের ভিটে-মাটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় পরিস্থিতি অতটা খারাপ পর্যায়ে যায় বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।
এদিকে এবারও পদ্মায় পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। এরই মধ্যে গত এক সপ্তাহে ভাঙনের কারনে ১০ থেকে ১২ টি বসত ঘর ৩ টি দোকান অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে দুই নম্বর ফেরিঘাট সংলগ্ন সিদ্দিক কাজীর পাড়া ও ৬ নং ফেরি ঘাট সংলগ্ন বাহির চর এলাকার তিন শতাধিক পরিবার। এছাড়া চরম ভাঙনের মুখে রয়েছে ২নং ও ৫নং ফেরিঘাট। অপর ফেরিঘাট গুলোও ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে। ফেরি ঘাটের ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরী ভিত্তিতে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কাজ ধীর গতিতে করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে স্থানীয়রা বরাদ্দকৃত টাকার যথাযথ ব্যবহার ও দ্রুত গতিতে প্রতিরোধ কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটু পর পর ভেঙ্গে পড়ছে নদীর পাড়। এ সময় দেখা যায় ফেরিঘাট রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ট্রলারের মাধ্যমে বস্তা ভর্তি বালু এনে ফেলছে ভাঙ্গন রোধে।
দৌলতদিয়া ২ নম্বর ফেরি ঘাট সংলগ্ন সিদ্দিক কাজীর পাড়া এলাকার বাসিন্দা সেন্টু সরদারের স্ত্রী রুপা বেগম বলেন, ৫ বছর ধরে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে এখানে বসবাস করছেন। এর আগে তাদের ঠিকানা ছিল ঢল্লা পাড়া গ্রামে। সেখানে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে তারা এখানে চলে আসে। তিনি আরো বলেন, ‘স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে যখন ঘুমিয়ে থাকি মনে হয় এই বুঝি বসতবাড়িসহ আমাদের তলিয়ে নিয়ে গেল। এবার ভাড়লে আমাদের আর যাওয়ার কোন যায়গা নাই।’
একই এলাকার বাসিন্দা আক্কাছ প্রামানিক (৬৫) বলেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এই এলাকায় নদীভাঙনের শিকার হয়ে শত শত পরিবার বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়। কেউ আমাদের দিকে তাকায় না। গত বছর ভাঙনের সময় স্থানীয়রা মানববন্ধনসহ একাধিক কর্মসূচী দিয়ে নদী শাসনের দাবি জানিয়ে ছিল। একাধিক মন্ত্রী ভাঙন পরিদর্শন করে নদী শাসনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু শুধু মাত্র ঘাট রক্ষার জন্য কিছু বালির বস্তা ফেলানো ছাড়া নদী শাসন করা হয়নি।
ভাঙন আতঙ্কে থাকা ঝর্না বেগম (৩৫), আব্দুল মান্নান, রহিমা বেগম ও সালাম সরদার জানান, আমরা সরকারের কাছে সাহায্য বা ত্রান সামগ্রী চাই না। আমাদের দাবী এভাবে বালুর বস্তা না ফেলে স্থায়ীভাবে নদী শাসন করা হোক। এরই মধ্যে এক সপ্তাহে এই এলাকার ১০ থেকে ১২ টি বসত বাড়ি এবং ৩ টি মুদি দোকান সরিয়ে নিতে হয়েছে।
দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মন্ডল জানান, ঘাট রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরী ভিত্তিতে ঠিকাদারের মাধ্যমে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। তবে অত্যন্ত ধীর গতিতে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। কাজের গতি বাড়ানো না হলে ঘাট রক্ষার প্রস্তুতি ভেস্তে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যাবস্থাপক (বানিজ্য) সফিকুল ইসলাম জানান, পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে ভাঙনের তীব্রতা আরো বাড়বে। ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত গতিতে পর্যাপ্ত পরিমানে জিও ব্যাগ ফেলানো দরকার।
গোয়ালন্দ উপজেলার নির্বাহী অফিসার আবু নাসার উদ্দিন জানান, দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় ভাঙ্গন রোধে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক মোঃ শওকত আলীর নির্দেশে আমরা একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়েছি। তিনি উপস্থিত থেকে গুনে গুনে বস্তা ফেলছেন।
এ ব্যপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজবাড়ীর প্রকৌশলী প্রকাশ কৃঞ্চ সরকার বলেন, দৌলতদিয়া ঘাটের সবকটি ঘাট সচল রাখতে এবং ঘাট এলাকায় স্থায়ীভাবে নদী শাসনের জন্য দৌলতদিয়া ১ নম্বর ঘাট হতে ৫ নম্বর ঘাট পর্যন্ত এক কিলোমিটার এলাকার জন্য ৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে দ্রুত প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে। তাছাড়া জরুরী ভিত্তিতে নদী ভাঙন প্রতিরোধে আমরা কাজ শুরু করেছি।

(Visited 52 times, 1 visits today)