পল্লীকবি জসীম উদ্দীন ও কবি নজরুল প্রসঙ্গ – লেখক বাবু মল্লিক –

॥ বাবু মল্লিক ॥  রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সাথে কবি নজরুলের প্রথম পরিচয় হয় কলকাতায়, একবারে লেখক জীবনের সূচনায়। তখন চারদিকে ব্রিটিশ বিরোধী অসহযোগ-আন্দোলনের ধুম। ছাত্ররা স্কুল-কলেজ ছেড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেমে পড়েছে। নবম শ্রেণীর ছাত্র জসীম উদ্দীন বাড়ির সাথেকার পদ্মানদী তীরে বসে কবিতা গান গল্প লিখেন। ব্রিটিশ বিরোধী সেই ডামাডঙ্কার সময়ে লেখা প্রকাশের জন্য কবির মনে কলকাতা গমনের ভাবনা জাগে। কিন্তু সেখানে কোন আত্মীয় পরিচিত কেউ নেই। লেখালেখির কারণে পরীক্ষার ফল ভাল না হওয়ায় তাঁর স্কুল মাস্টার পিতাও রাজী ছিলেন না । কবি দমলেন না এতে। অতপর ‘একটা বিশেষ সাহিত্যিক খ্যাতি লাভ’ করার অভিপ্রায়ে দুর-সম্পর্কের এক বোনের কলকাতার সংসারে গিয়ে উঠলেন জসীম উদ্দীন। তবে কলকাতায় যাওয়ার নেপথ্যে অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান এবং জসীম উদ্দীনের বাড়ি পালানোর কথাও জানা যায়। তিনি নিজেই কবুল করছেনÑ‘নেতাদের কথায় গোলামখানা ছাড়িয়া চলিয়া আসিয়াছি’। অতপর রাস্তায় রাস্তায় পত্রিকা বিক্রির উপার্জন দিয়ে সেই বোনের সংসারে থেকে কবি হওয়ার প্রচেষ্ঠায় সফলতালাভের আশায় রইলেন। কবি লিখেছেনÑ
“ ‘বসুমতী’ অফিসে চার পাঁচ দিন আগে টাকা জমা দেওয়ার সঙ্গতিও আমার ছিল না। সুতরাং পঁচিশখানা নায়ক কিনিয়া .. ..রাস্তার ধারে দাঁড়াইয়া নায়ক নায়ক বলিয়া চিৎকার করিয়া ফিরিতে লাগিলাম। ….পঁচিশখানা কাগজ বিক্রয় করিয়া আমার চৌদ্দ পয়সা উপার্জন হইল। …. তাহারা ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়া আমার বক্তৃতা শুনিত। কিন্তু কাগজ কিনিত না।’
কলকাতার প্রথম জীবনে, সেই অনিশ্চয়তার সময়ে জসীম উদ্দীনের ‘কার্তিক দাদার সঙ্গে পরিচয় হইল। বিক্রমপুরের কোন গ্রামে তাঁহার বাড়ি।’ নন-কো অপারেশন করে তখনকার দিনে ভদ্রঘরেরও বহু ছেলে খবরের কাগজ বিক্রি করতে আরম্ভ করে। খবরের কাগজের হকারি কাজের ‘ওস্তাদ’ আই.এ. পর্যন্ত পড়–য়া ‘কার্তিকদাদা’ও নন-কোঅপারেশন করে কলকাতায় খবরের কাগজ বিক্রি করে খরচ চালাতেন। ওই ‘কার্তিক দাদা’ সগর্বে তাঁকে সকলের কাছে ‘কবি বলিয়া পরিচয় করাইয়া দিতেন।’
কবি মোজাম্মেল তখন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক’। জসীম উদ্দীনের ছেলেবেলায় সাহিত্য প্রচেষ্টার উৎসাহ দাতা ফরিদপুরের তরুণ উকিল তমিজ উদ্দীন খানও ইতোমধ্যে কলকাতায় অবস্থান নিয়েছিলেন। তমিজউদ্দীন খান হাসিমুখে তাঁকে ‘একটি টাকা’ আর্থিক সহযোগিতা এবং সাথে একটা পরামর্শও দিলেনÑ “ ভোলার কবি মোজাম্মেল হক সাহেবের সঙ্গে আমি তোমার বিষয়ে আলাপ করেছি। তুমি যদি তাঁর সঙ্গে দেখা কর, তিনি তোমাকে উৎসাহ দেবেন। এমন কি তোমার দু-একটি লেখা ছাপিয়েও দিতে পারেন। তমিজউদ্দীনের এই পরামর্শই জসীম উদ্দীনকে কলকাতায় কবি পরিচিতি দিয়েছিল। কবি মোজাম্মেল হক জসীম উদ্দীনের কবিতায় আকৃষ্ট হলেন কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গেও দেখা করার পরামর্শ দিলেন। বললেন তিনি Ñ
বৎসরের প্রথম মাসে আমার পত্রিকায় কোনো নুতন লেখকের লেখা ছাপি না। কিন্তু আপনার লেখা আমি বৎসরের প্রথম সংখ্যাতেই ছাপাব। ….আপনি অবশ্য অবশ্য হাবিলদার কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে দেখা করবেন। তিনি আপনার লেখার আদর করবেন। আপনার লেখার সঙ্গে তার লেখার কিছু সাদৃশ্য আছে।
কবি নজরুল ইতোমধ্যে বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে এসে কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য-সমিতির অফিসে থিতু হয়েছেন। জসীম উদ্দীন সাহিত্য-সমিতির অফিসে গিয়ে একদিন দেখেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম বারান্দায় বসে লিখছেন। জসীম উদ্দীন এর বাঙময় বর্ণনা রয়েছে সে ঘটনারÑ
অল্প সময়ের মধ্যেই কবি তাহার লেখা শেষ করিয়া আমার নিকট চলিয়া আসিলেন। আমি অনুরোধ করিলাম। কী লিখেছেন আগে আমাকে পড়ে শোনান।
কবি পড়িতে লাগিলেন ঃ
হার-মানা হার পরাই তোমার গলে…… ইত্যাদি-
….কবিকে আমি আমার কবিতার খাতাখানি পড়িতে দিলাম। কবি দুই-একটি কবিতা পড়িয়াই খুব উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিলেন।
….. কবি আমাকে বলিলেন, ‘আপনার কবিতার খাতা রেখে যান। আমি দুপুরের মধ্যে সমস্ত পড়ে শেষ করব। আপনি চারটার সময় আসবেন।’….চারিটা না বাজিতেই কবির নিকট যাইয়া উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, কবি আমারই কবিতার খাতাখানা লইয়া অতি মনোযোগের সঙ্গে পড়িতেছেন। .. .. ..অতি মধুর স্নেহে বলিলেন, “তোমার কবিতার মধ্যে যেগুলি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, আমি দাগ দিয়ে রেখেছি। এগুলি নকল করে তুমি আমাকে পাঠিয়ে দিও।”….কবি হাবিলদারের পোশাক পরিতে পরিতে গান গাহিয়া উচ্চ হাস্যধ্বনি করিয়া লাফাইয়া ঝাঁপাইয়া নিজের প্রাণ-চাঞ্চল্যের প্রকাশ করিতে লাগিলেন।
দেশে ফিরে এসে দেখেন মা ‘চিন্তা করিয়া শুকাইয়া গিয়াছেন। পিতা নানাস্থানে .. ..সন্ধান না পাইয়া খোজখবর লইয়া অস্থির’। .. .. তিনি জানিতেন চৌদ্দ-পনর বৎসরের ছেলেরা এমনি করিয়া বাড়ি হইতে পলাইয়া যায়। আবার ফিরিয়া আসে’। কলকাতা থেকে ফিরে আবার ইস্কুলে যাতায়াত এবং কবি নজরুল ইসলামের সাথে পত্র যোগাযোগ চলতে থাকল। তাঁকে শিশুকবি বলে সম্মোধন করে ‘কবির নিকট হইতে কবিতার মতোই সুন্দর উত্তর আসিল।’ জসীম উদ্দীনকে কবি নজরুল লিখলেন-
“ভাই শিশুকবি, তোমার কবিতা পেয়ে সুখী হলুম। আমি দখিন হাওয়া। ফুল ফুটিয়ে যাওয়া আমার কাজ। তোমাদের মত শিশু কুসুমগুলিকে যদি আমি উৎসাহ দিয়ে, আদর দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারি, সেই হবে আমার বড় কাজ। তারপর আমি বিদায় নিয়ে চলে যাব আমার হিমগিরির গহন বিবরে।”
তাঁর প্রচেষ্টায় ‘কিছুদিন পরে মোসলেম ভারতে যে সংখ্যায় কবির বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশিত হইয়াছিল, সেই সংখ্যায় মিলন গান’ নামে জসীম উদ্দীনের একটি কবিতা ছাপা হল কবি নজরুলের প্রচেষ্টায়। কলকাতায় পরিচয় এবং পরে পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে বিদ্রোহী কবি নজরুল এবং পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল। ফলে উভয়ের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়। ফরিদপুরের অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার নরেন্দ্র রায় মহাশয়ের এক নাতি ছিলেন জসীম উদ্দীনের সহপাঠী। তার মাকে জসীম উদ্দীন মাসিমা বলে ডাকতেন। আর মাসির বড় বোন বিরজাসুন্দরী দেবীকে নজরুল মা বলে ডাকতেন। বিরাজাসুন্দরী দেবীর নিকট থেকে তিনি ‘নিয়মিত পত্র পাইতেন’। নজরুল বিরজাসুন্দরী দেবীর খোঁজখবর লিখে পাঠাতে বললেন। নজরুল কাব্য-প্রতিভার যবনিকার অন্তরালে ‘এই মাসিমা এবং তাঁর বোনদের স্নেহসুধার দান যে কতখানি, তাহা কেহ কোনোদিন জানিতে পারিবে না।…..মাসিমাকে কবি একখানা সুন্দর শাড়ি উপহার দিয়াছিলেন। মৃত্যুর আগে মাসিমা বলিয়া গিয়াছিলেন, তাহাকে শ্মশানে লইয়া যাইবার সময় যেন তাঁর মৃতদেহ সেই শাড়িখানা দিয়া আবৃত করা হয়। মাসিমার বড় বোন বিরজাসুন্দরী দেবী অশ্র“সজল নয়নে …. বলিয়াছিলেন, “তোমার মাসিমার সেই শেষ ইচ্ছা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছিল।”
বিদ্রোহী কবি ‘ধুমকেতু’ বের করে তার গ্রাহক সংগ্রহ করতে বললেন জসীমকে। ফরিদপুরের সুফি মোতাহার হোসেন তখন কবি খ্যাতিসম্পন্ন; জেলা ইস্কুলের বোর্ডিং-এ থেকে পড়াশুনা করতেন। জসীম উদ্দীনের অনুরোধে তিনি ধুমকেতুর গ্রাহক হলেন। ধুমকেতুতে প্রকাশিত একটি কবিতার জন্য কবির জেল হল। ..কবি অনশন আরম্ভ করিলেন।….চল্লিশ দিন অনশনের পর কবি অন্ন গ্রহণ করিলেন।’ জসীম উদ্দীন তখন আই এ ক্লাসের ছাত্র, পল্লীজীবনের সুখ দুঃখ নিয়ে সাহিত্য রচনায় প্রবৃত্ত হলেন। তিনি লিখেছেনÑ
আমার কবিতার রচনারীতি পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। ….কাগজের সম্পাদকেরা আমার লেখা পাওয়া মাত্র ফেরত পাঠাইয়া দিতেন। ….সেই সময়ে আমার কেবলই মনে হইত, একবার যদি কবি নজরুলের সঙ্গে দেখা করিতে পারি, নিশ্চয় তিনি আমার কবিতা পছন্দ করিবেন।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এবং বিদ্রোহীকবি নজরুলÑ উভয়ের জীবনের প্রথমলগ্নে ভারতীয় কংগ্রেসের সংশ্রব ঘটে। কবি নজরুল ১৯২৫ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের সমর্থনে ভারতীয় পার্লামেন্টের সদস্য পদে নির্বাচন করেন। আর জসীম উদ্দীন নজরুলের সংগে দেখা করতে গিয়ে কংগ্রেস অফিসের সাময়িক স্বেচ্ছাসেবক হয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে করতে কলিকাতা গিয়ে উপস্থিত হন। কিন্তু খেয়ালি কবির শশব্যস্ততার মধ্যে সেবারে জসীম উদ্দীনের মনোবাঞ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়। তিনি লিখেছেনÑ
অল্পক্ষনেই মধ্যেই ঝড়ের বেগে কবি আসিয়া উপস্থিত হইলেন।…..‘কই জসীম উদ্দীন?’ বলিয়া কবি এদিক ওদিক চাহিলেন।….আমি কবিকে সালাম করিলাম। কবি আমাকে দেখিয়া বলিলেন, ‘কই তোমার লেখা কোথাও তো দেখিনে?’ আমি কবির নিকট আমার কবিতার খাতাখানা আগাইয়া দিতে গেলাম। কিন্তু কবি তাহার গুণগ্রাহীদের দ্বারা এমনই পরিবৃত হইলেন যে, আমি তার ব্যূহভেদ করিয়া নিকটে পৌঁছিতে পারিলাম না। অল্প পরেই কবি ঘড়ি দেখিয়া বলিলেন, ‘আমাকে এখন হুগলি যেতে হবে। আগাইয়া গিয়া বলিলাম, আমি বহুদুর থেকে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’ ……
কবি কহিলেন, ‘বলো বলো, তোমার কি কথা ?’ আমি আর কি উত্তর করিব! …. কবি তাড়াতাড়ি ট্র্যাক্সি হইতে নামিয়া রেলগাড়িতে গিয়া উপবেশন করিলেন। রাশি রাশি ধুম উদগিরণ করিয়া শোঁ শোঁ শব্দ করিয়া গাড়ি চলিয়া গেল। আমি স্তব্ধ হইয়া প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াইয়া রহিলাম। গাড়ির চাকা যেন আমার বুকের উপর কঠিন আঘাত করিতে করিতে চলিয়া গেল।.. .. কংগ্রেসের জন্য সংগৃহীত টাকার বাক্সটি রাখিয়া ফুটপাতের উপর শুইয়া পড়িলাম। তখন আমি এত ক্লান্ত যে সারাদিনের অনাহারের পরে খাওয়ার কথা একেবারেই ভুলিয়া গেলাম।
১৯২৫ সালে ফরিদপুর টেপাকোলা মাঠে অনুষ্ঠিত অল বেঙ্গল কংগ্রেস কনফারেন্স, অল বেঙ্গল স্টুডেন্ট কংগ্রেস কনফারেন্স এবং অল বেঙ্গল মুসলিম কংগ্রেস কনফারেন্স গিয়ে কবি নজরুল বামপন্থী পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের বাড়িতে ওঠেন। সম্মেলন তিনটিতে উভয় বাংলার নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহন করেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেখানে তাঁর বিখ্যাত গান ও কবিতা পরিবেশন করেন। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এতে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সম্মেলন শেষে কবি আবার জসীম উদ্দীনের বাড়িতে বসেই একটি বই লেখার মনস্কামনা ব্যক্ত করেছিলেন। নজরুলের ফরিদপুর ভ্রমনের প্রথম বারের স্মৃতি লিখেছেন কবি জসীম উদ্দীনÑ
একদিন আশ্চর্য হইয়া দেখিলাম, কবি নজরুল কয়েকজন শিষ্যসহ আমাদের বাড়িতে উঠিবার ইচ্ছা করিলেন। কবির সঙ্গে কমিউনিস্ট কর্মী আব্দুল হালিম, গায়ক মণীন্দ্র মুখোপাধ্যয় ও আরো একজন যুবক ছিলেন। আমি কবিকে আনন্দে আমাদের বাড়ি লইয়া আসিলাম। .. .. ..
কনফারেন্স শেষ হইলে কবি আবার আমার বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কবি স্থির করিলেন, তিনি এখানে বসিয়া ‘বালুচর’ নামে একখানা বই লিখিবেন। কিছুদিন কবির সঙ্গে কাটাইতে পারিব, এই আশায় মন পুলকিত হইয়া উঠিল।”
জসীম উদ্দীন নজরুলকে বেশ কিছুদিন ধরে রাখার বুদ্ধি আঁটলেন মনে মনে। নৈশ বিদ্যালয় দেখাতে একদিন নিয়ে গেলেন চরে। সেখানে বিভিন্ন এলাকার নামকরা ফকিরের দল এসে কবিকে গান শুনাল। কবি সে গানের তারিফ করলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর চায়ের তেষ্টা পেলে কবি নজরুলের সেই তেষ্টা কি প্রকারে নিবারন করা হয়েছিল তা কবিও মনে রেখেছিলেন বহুদিন। সে বিবরণ পাওয়া যায় জসীম উদ্দীনেরই লেখায়Ñ
সন্ধ্যাবেলা নৌকা করিয়া কবিকে নদীর ওপারের চরে লইয়া গেলাম। সেখানে আমি একটি ইস্কুলে খুলিয়াছিলাম। গ্রামের লোকেরা রাত্রিকালে আসিয়া সেই ইস্কুলে লেখাপড়া করিত। তারপর সকলে মিলিয়া গান গাহিত। .. .. ..কবি সে গানের খুব তারিফ করিলেন। .. ..
চা না পাইয়া কবি অস্থির হইয়া উঠিলেন।….অনেক খোঁজাখুজির পর আলিম মাতব্বরের বাড়ি হইতে কয়েকটা চায়ের পাতা বাহির হইল। তিনি একবার কলিকাতা গিয়া চা খাওয়া শিখিয়া আসিয়াছিলেন।… তিনি অতি গর্বের সহিত তাহার কলিকাতা ভ্রমনের আশ্চর্য কাহিনী বলিতে বলিতে সেই চা-পাতা আনিয়া কবিকে উপটৌকন দিলেন। চা-পাতা দেখিয়া কবির তখন কী আনন্দ!
এই মহামূল্য চা এখন কে জ্বাল দিবে? এ বাড়ির বড়বৌ, ও বাড়ির ছোটবৌ- সকলে মিলিয়া পরামর্শ করিয়া যাহার যত রন্ধনবিদ্যা জানা ছিল সমস্ত উজাড় করিয়া সেই অপূর্ব চা রন্ধন পর্ব সমাধা করিল। অবশেষে চা বদনায় ভরতি হইয়া বৈঠকখানায় আগমন করিল।
এরপর জসীম উদ্দীন কলকাতা গিয়ে দেখেন সদ্য সংসার পেতেছেন কবি নলিনী সরকার মহাশয়ের বাসায়। কবির আর্থিক অবস্থা তখন খুবই খারাপ কিনতু কবিপতœীর ব্যবহারেও ‘তাঁদের গৃহখানি’ পল্লী কবির কাছে আপন বলেই মনে হল। এরপর থেকে বিদ্রোহী কবির সাথে পল্লীকবির পারিবারিক সম্পর্ক পাকাপাকি হয়ে যায়। আর ‘কবির ছন্নছাড়া নোঙরহীন জীবনের অন্তঃপুরে স্নেহ-মমতায় মধুর হইয়া চিরকাল তিনি কবির কাব্যসাধনাকে জয়যুক্ত করিয়াছিলেন।’
‘ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা’ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে আবার ১৯২৬ সালে ফরিদপুরে জসীম উদ্দীনের বাড়িতে ওঠেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নির্বাচনী এলাকা ঢাকার (ঢাকা-ফরিদপুর-বরিশাল-ময়মনসিংহ) আওতায় ‘স্বরাজ পার্টি’র প্রার্থী হয়েছিলেন। গোঁড়া মুসলিম ও প্রতিক্রিয়াশীলদের দেওয়া ‘কাফের’ ফতোয়া কাঁধে নিয়েই, পির বাদশা মিয়ার সমর্থন চিঠি হাতে পেয়ে কবি নজরুল ছুটে এসেছিলেন ফরিদপুরে। পল্লীকবির সেই স্মৃতিকথাÑ
কবি তখন তাঁর সুটকেস হইতে এক বান্ডিল কাগজ বাহির করিয়া আমার হাতে দিয়া বলিলেন, ‘এই দেখ, পির বাদশা মিয়া আমাকে সমর্থন দিয়া ফতোয়া দিয়েছেন। পূর্ববঙ্গের এতবড় বিখ্যাত পির যা বলবেন, মুসলিম সমাজ তা মাথা নত করে মেনে নেবে। জসীম, তুমি ভেবো না। নিশ্চয় সবাই আমাকে ভোট দেবে। ঢাকায় আমি শতকরা নিরানব্বইটি ভোট পাব। তোমাদের ফরিদপুরের ভোট যদি কিছু আমি পাই তা হলেই কেল্লা ফতে।
তারা দুইজনে ফরিদপুরে ভোটের সহযোগিতা চাইতে গেলে তমিজউদ্দিনের খানের সমর্থকদের মধ্য থেকেই কবি নজরুলকে ‘কাফের’ আখ্যা দেয়া হয়। তমিজ উদ্দীন সাহেব আইন-সভার নিম্ন পরিষদের সভ্য পদের প্রার্থী ছিলেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ফরিদপুরের তরুণ জমিদার বন্ধুবর লালমিঞা সাহেব। জসীম উদ্দিীনকে সাথে নিয়ে কবি যখন “তাঁহার ভোট অভিযানের কথা বলিলেন, তখন তমিজ উদ্দীন সাহেবের একজন সভাসদ বলিয়া উঠিলেন,‘তুমিতো কাফের। তোমাকে কোন মুসলমান ভোট দিবে না’। জসীম উদ্ িদীন লিখেছেনÑ
তিনি হাসিয়া বলিলেন, ‘আপনারা আমাকে কাফের বলছেন, এরচেয়েও কঠিন কথা আমাকে শুনতে হয়। আমার গায়ের চামড়া এত পুরু যে, আপনাদের তীক্ষè কথার বাণ তা ভেদ করতে পারে না। তবে আমি বড়ই সুখী হব, আপনারা যদি আমার রচিত দু-একটি কবিতা শোনেন।’ .. ..
কবি যখন তাঁহার ‘মহরম’ কবিতাটি আবৃত্তি করিলেন, তখন যে ভদ্রলোকটি কবিকে কাফের বলিয়াছিলেন তাঁরই চোখে সকলের আগে অশ্র“ধারা দেখা দিল।
কবি জসীম উদ্দীনের বর্ণনায় সেই মর্মবাণীই প্রতিধ্বণিত হয়েছেÑ
তমিজ উদ্দীন সাহেব চালাক লোক। ….কবিকে তিনি আড়ালে ডাকিয়া লইয়া গেলেন। …. ভিতর হইতে একটি লোকও বলিল না, এত বেলায় আপনি কোথায় যাইবেন, আমাদের এখান হইতে খাইয়া যান। আমার নিজের জেলা ফরিদপুরের এই কলঙ্ক-কথা বলিতে লজ্জায় আমার মাথা নত হইয়া পড়িতেছে।
জসীম উদ্দীন রাগে দুঃখে অপমানে অভিমানে ফরিদপুর শহরে সেই মাছি ভনভন, তেলচিটচিটে বালিশ নির্গত পুঁতিগন্ধময় পরিবেশ অতিক্রম করে অবশেষে কবিকে নিয়ে বারন্ত বেলায় মধ্যাহ্ন আহারপর্ব সমাধা করেন। কবি নজরুল প্রবন্ধে জসিম উদ্দীন লিখেছেনÑ
‘পথে আসিতে আসিতে কবিকে জিজ্ঞাসা করিলাম,
তমিজউদ্দীন সাহেবের দল আমাদের সমর্থন করবেন। এবার তবে কেল্লা ফতে!’
কবি উত্তর করিলেন, ‘না হে, ওঁরা বাইরে ডেকে নিয়ে আগেই আমাকে বলে দিয়েছেন, আমাকে সমর্থন দিবেন না। ওঁরা সমর্থন করিবেন বরিশালের ইসমাইল সাহেবকে।’ তখন আমার রাগে দুঃখে কাঁদিতে ইচ্ছা হইতেছিল। রাগ করিয়াই কবিকে বলিলাম,‘আচ্ছা কবিভাই! এই যদি আপনি জানিলেন, তবে ওঁদের কবিতা শুনিয়ে সারাটা দিন নষ্ট করলেন কেন?’
কবি হাসিয়া কহিলেন, ‘ওঁরা শুনতে চাইলে, শুনিয়ে দিলুম।’
ভেবে চিন্তে কবি অবশেষে জামানতের টাকা রক্ষার তাগিদে ঢাকার দিকে চলে যানÑ
…..প্রথম ভোটের দিন কবিকে ভোট গ্রাহক অফিসারের সামনে বসাইয়া দিলাম। কবির সামনে গিয়া ভোটাররা ভোট দিবেন। ….পরদিন সকালে….কবি আমাকে বলিলেন,“দেখ জসীম, ভেবে দেখেছি, এই ভোটযুদ্ধে আমার জয় হবে না। আমি ঢাকা চলে যাই। দেখি, অন্ততপক্ষে জামানতের টাকাটা যাতে মারা না যায়।
ভারতীয় আইন পরিষদের ১৯২৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী তমিজ উদ্দিন খান প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ননা করেছেন। নির্বাচনী প্রচারণার কাজ শেষে কবি ২৩শে নভেম্বর কৃষ্ণনগর চলে যান, ২৯ শে নভেম্বর ফলাফল প্রকাশিত হয়। ফলাফলে দেখা যায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি বরিশালের জমিদার মুহম্মদ ইসমাইল চৌধুরী বিজয়ী হন। নিম্ন-আইন পরিষদে জয়লাভ করেন তমিজউদ্দিন খান।

ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্রাবস্থায় সকল ছাত্ররা মিলে কবিকে রাজেন্দ্র কলেজে এনে অভিনন্দন জানানোর উদ্যোগ গ্রহন করেন। প্রিন্সিপাল জসীম উদ্দীনকে জানিয়ে দিলেনÑ “নজরুলকে লইয়া কলেজে যে সভা করার অনুমতি দিয়েছিলাম, তা প্রত্যাহার করলাম।”
‘কেরোসিনের টিন বাজাইতে বাজাইতে সমস্ত শহর ভরিয়া কবির বক্তৃতা দেওয়ার কথা’ প্রচার করা হল, সন্ধ্যাবেলা অম্বিকা হলের ময়দানে লোকে লোকারণ্য। জসীম উদ্দীনের লেখা থেকেই জানা যায়, বিদ্রোহী কবি এবং পল্লীকবি সেদিন একত্রে এক সভায় মিলিতভাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক হিসেবেই ফরিদপুরের পূণ্যভূমিতে সেদিন আবির্ভূত হয়েছিলেন। পল্লীকবি লিখেছেনÑ
সেই সভায় আমি বলিয়াছিলাম, ইনি আমাদের কবি, ইহার অন্তর হইতে যে বাণী বাহির হইতেছে, সেই বাণীর সঙ্গে আমাদের যুগযুগান্তরের দুঃখ বেদনা ও কান্না মিশ্রিত হইয়া আছে; শত জালিমের অত্যাচারে শত শোষকের পীড়নে আমাদের অন্তরে যে অগ্নিময় হাহাকার শত লেলিহান জিহবা মেলিয়া যুগযুগান্তরের অপমানের গ্লানিতে তাপ সঞ্চয় করিতেছিল, এই কবির বাণীতে আজ তারা রূপ পাইল। .. ..
আমি কলেজের প্রিন্সিপাল মহাশয়ের কঠোর সমালোচনা করিয়াছিলাম। পরদিন তিনি আমাকে ডাকাইয়া তাহার জন্য কৈফিয়ত চাহিলেন। .. ..
ইহার পরে আরও একবার কবি আমার বাড়িতে আসিয়াছিলেন। …. ফরিদপুরের তরুণ জমিদার বন্ধুবর লাল মিঞা সাহেব মোটর হাঁকাইয়া আসিয়া একদিন কবিকে শহরে লইয়া আসিলেন।….আমার নদী তীরের কুটিরে কবির এই শেষ আগমন।
তো, বন্ধুবর লাল মিঞার বাড়িতেই এক রাত্রে তিন-চার জন কবির সঙ্গে গল্পে রত হলেন। ‘অপূর্ব সুরঝঙ্কার বাহির হইতেছে। কবি বলিয়া যাইতে লাগিলেন তাহার সমস্ত জীবনের প্রেমের কাহিনী। .. দুই চোখ অশ্র“-ভারাক্রান্ত করিয়া তুলিতেছেন, আবার কখনও .. .. হাসাইয়া প্রায় দম বন্ধ করিবার উপক্রম করিয়া তুলিতেছেন। সে সব গল্পের কথা আজও বলিবার সময় আসে নাই।’ বিদ্রোহী কবির সঙ্গে ব্যক্তিগত সঙ্গ-অনুসঙ্গের এরকম আরও অনেক অম্ল-মধুর স্মৃতিতে পল্লীকবির জীবন ভরপুর। তার মধ্যেকার আরো কয়েকটি উল্লেখ করা যায়Ñ
‘কবিকে আর একটি সভায় খুব গল্পমুখর দেখিয়াছিলাম। কবির এক গানের শিষ্যা পুষ্পলতা দে’র জন্মদিনে। সেই সভায় জাহানারা বেগম, তাহার মা, কবির শ্বাশুড়ি এবং কবি-পতœী উপস্থিত ছিলেন। আমরা সকলে খাইতে বসিয়াছি। ছোট ছোট মাটির পাত্রে করিয়া নানা রকম খাদ্যবস্তু আমাদের সামনে আনিয়া দেওয়া হইতেছে। কবি তার এক একটি দেখাইয়া বলিতেছেন-এটি খুড়িমা, এটি পিসিমা, এটি মাসিমা।
আমি কবিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আচ্ছা কবিভাই! সবাইকে দেখালেন-আমার ভাবি কোনটি তাকে তো দেখালেন না?
কবি একটুও চিন্তা না করিয়া পানির গেলাসটি দেখাইয়া বলিয়া উঠিলেন, “এইটি তোমাদের ভাবি। যেহেতু আমি তাঁহার পাণি-গ্রহণ করেছি।”
চারিদিকে হাসির তুফান উঠিল। ভাবি হাসিয়া কুটিকুটি হইলেন। কোনো রকমে হাসি থামাইয়া আমরা আবার আহারে মনোনিবেশ করিয়াছি অমনি কবি গম্ভীর হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “জসীম, তুমি লুচি খেও না।”
.. .. কবি বলিয়া উঠিলেন, “যেহেতু আমরা বেলুচিস্তান হতে এসেছি, সুতরাং লুচি খেতে পারব না।”
চারিদিকে আবার হাসির তুফান উঠিল। সেদিন কবি আমাদিগকে এত হাসাইয়াছিলেন যে, হাসির চোটে অনেকেরই খাদ্যবস্তু গলায় আটকাইয়া যাইতেছিল। .. ..
পল্লীকবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাবস্থায় বিদ্রোহী কবির সাথে সুস্থ অবস্থায় শেষবারের মত দেখা হয়। মুসলিম হলে কবি আসিলেন বেলা দশটায়। জসীমউদ্দীনকে দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরূপে দেখে কবি খুবই সুখী হলেন। পল্লীকবির কানে কানে বললেন,“মায়েরা ছেলেদের প্রতি যে স্নেহ-মমতা ধারণ করে, তোমার চোখে-মুখে সমস্ত অবয়বে সেই স্নেহ-মমতার ছাপ দেখতে পেলাম।”

আমার ভাবি সাহেবার কথা আর কি বলিব। কত সীমাহীন দুঃখের সাগরেই না তিনি ভাসিয়া চলিয়াছেন। অর্ধাঙ্গ হইয়া তিনি বিছানা হইতে উঠিতে পারেন না। তবে মুখের সেই মধুর হাসিটি-যে হাসি সেই প্রথম বধূজীবনে তাহার মুখে দেখিয়াছিলাম, যে হাসিটি দিয়া ছন্নছাড়া কবিকে গৃহের লতা-শৃঙ্খলে বাঁধিয়াছিলেন, .. ..হায় রে, কবির অতীত জীবননাট্যের বিস্মৃত পাতাগুলি আর কি কোনোদিন অর্থপূর্ণ হইয়া উঠিবে?
সহায়ক গ্রন্থ ঃ
১. যাঁদের দেখেছি ঃ জসীম উদ্দীন
২. সাময়িকপত্রে সাহিত্যিক প্রসঙ্গ ঃ মোহাম্মদ আব্দুল আইয়ুম, বাংলা একাডেমি, প্রথম প্রকাশ-জুলাই’১৯৯০
৩. কালের পরীক্ষা ও আমার জীবনের দিনগুলি ঃ তমিজ উদ্দিন খান, বাংলা একাডেমি, জুন-১৯৯৩।
৪. স্মৃতিপথে পাংশা ঃ সৈয়দ মাহমুদ, অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি
৫. দৈনিক প্রথম আলো-সাহিত্য সাময়িকী, ৩১ শে আগস্ট’ ২০০১।
৬. কাজী আব্দুল ওদুদের শ্রেষ্ট প্রবন্ধ ঃ সম্পা-আবুল কাসেম ফজলুল হক, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্র“য়ারি’৮৯।
৭. নজরুল প্রেমসম্ভার ঃ আব্দুল আজিজ আল-আমান-হরফ প্রকাশনী, এ-১২৬ কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা।
৮. নজরুল নামা ঃ সৈয়দ আব্দুর রব, গেরদা প্রকাশনী-ফরিদপুর, মার্চ ১৯৮২।

লেখক পরিচিতি ঃ
বাবু মল্লিক- সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক। সম্পাদক-সাপ্তাহিক অনুসন্ধান।
ই-মেইল – mallik.babu6@gmail.com

 

 

 

(Visited 88 times, 1 visits today)