‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ ও এয়াকুব আলী চৌধুরী-লেখক ও গবেষক, সাংবাদিক-বাবু মল্লিক-

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

91

 

বাবু মল্লিক, সাংবাদিক,  লেখক ও গবেষক : সম্পাদক সাপ্তাহিক অনুসন্ধান :-

 

পাংশার নারায়নপুর গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে খুবই মিষ্টি নামের ছোট্ট একটা নদী, চন্দনা। তাঁর জন্মের মাত্র কিছুকাল আগে গ্রামের দক্ষিণে বয়ে যাওয়া নদীর বুক চিরে তৈরী হয়েছে চন্দনা ব্রিজ সেই ১৮৬৭ সালের দিকে। তার ওপর দিয়ে ঝমঝম করে রেললাইন এসেছে নারায়নরপুর গ্রাম ঘেঁষে। গ্রামে চাষী ছিল, কামার ছিল, কুমোরও ছিল, হাসি-কান্নায় সে গ্রামের সারা অঙ্গন থাকত চঞ্চল হয়ে। গাঁয়ের গাছে গাছে ছিল পাখি, শাখায় শাখায় আম, জাম, লিচু, পেয়ারার গুচ্ছ। বোশেখের দুপুরে মুন্সীবাড়ির পুকুরে আর শীতের সকালে শ্যামা বামনীর পিঠের মজা, আর গ্রামের সেই মনভোলানো, আবেগঘন স্মৃতি তাঁর অন্তর জুড়ে ছিল আজীবন। রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার নারায়নপুর গ্রামের নানাবাড়ির ওই মনোমুগ্ধকর স্মৃতির বিবরণ দিয়েছেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই। ‘চন্দনা নদীর বুকে নৌকা বাইচ, পদ্মার চরে পাখি শিকার অথবা তিলমাদিয়ার ঘাটে জেলেদের ইলিশ ধরার স্মৃতি, পাংশা জর্জ হাইস্কুলের প্রতিটি কামরার সঙ্গে জড়িত ছিল তার অনেক কথা আর কাহিনী। পাংশার সেই মনোমুগ্ধকর নারায়নপুর গ্রামেই ১৮৮৮ সালের ২৫ অক্টোবর (১৮ কার্তিক, ১২৯৫) জন্মগ্রহন করেছিলেন উনিশ শতকের ভারতবর্ষখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও প্রখ্যাত সাময়িকী সম্পাদক এয়াকুব আলী চৌধুরী (২৫.১০.১৮৮৮Ñ১৫.১২.১৯৪০)।
দুই.
এয়াকুব আলী চৌধুরীর পিতা এনায়েতুল্লা চৌধুরী ছিলেন পুলিশের কর্মকর্তা এবং মা সুন্নাতুন্নেসা গৃহসেবী। ৪ ভাইবোনের মধ্যে এয়াকুব আলী ছিলেন তৃতীয়। বড়ভাই রওশন আলী চৌধুরী ও মেজভাই আওলাদ আলী চৌধুরীও ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সামিয়িকী সম্পাদক। একমাত্র বোন জিন্নাতুন্নেসা ছিলেন তার ছোট। শৈশবেই পিতার মৃত্যুর পর এয়াকুব আলী চৌধুরী বড়ভাই রওশন আলী চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া করেন নিজের বাড়িতেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। স্থানীয় থানা সংলগ্ন ‘পাংশা মাইনর স্কুলে’ ভর্তি হন উনিশ শতকের শেষ দশকের প্রারম্ভে (১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘মাইনর’ স্কুলটি ‘পাংশা মিডল ইংলিশ স্কুল’-এম.ই তে এ পরিনত হয় ১৯১২ সালে)। গ্রামের ওই মধুমাখা স্মৃতি অবগাহন করে মাইনর স্কুলের পড়ালেখা শেষে তিনি মহকুমার সবচেয়ে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্টান রাজবাড়ী সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। এখান থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স (প্রবেশিকা) পাশ করে কলকাতায়, প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ ক্লাসে পাঠরত অবস্থায় তার বড়ভাই রওশন আলী চৌধুরী অসুস্থ্য হয়ে পড়েন, তাঁর সম্পাদিত প্রখ্যাত ‘কোহিনুর’ পত্রিকাটি তখন বন্ধ হয়ে যায়। কোহিনুর সম্পাদনা ও পরিচালনার ভার এসে পড়ে এয়াকুব আলী চৌধুরীর ওপর। কলকাতা শহরে অবস্থান নিয়ে ওই সময় তিনি বৃটিশের শোষণ-শাসণের বিরুদ্ধে স্ব-সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। ভাগ্য তার অপ্রসন্ন! পারিবারিক অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে কোহিনুর চালানোর গুরু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরীর চোখের অসুখ ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়। প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ চতুর্থ বর্ষের পাঠ ইতোমধ্যেই চুকিয়ে চুকিয়ে ফেলতে হয় এয়াকুব আলী চৌধুরীকে।
তিন.
কলকাতার আন্তনি বাগান লেন থেকে ১৩১৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে (১৯১১ সালের এপ্রিল) কোহিনুর পত্রিকা পুনরায় চালু করেন এয়াকুব আলী চৌধুরী। অগ্রজ মোহাম্মদ রওশন আলী চৌধুরীর সম্পাদনায় বাংলা ১৩০৫ সালের আষাঢ় মাসে (১৮৯৮ সালের জুন) পাংশা থেকে বিখ্যাত মাসিকপত্র কোহিনুর প্রকাশনা শুরু করেছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯০৩ সালে এটি গোয়ালন্দ মহকুমার মফস্বল শহর পাংশা, তার নিজ এলাকা থেকেই চালু হয়েছিল। হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জল দৃষ্টান্ত রেখে তৎকালীন প্রগতিশীল মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটিয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরীর সম্পাদনায় শেষপর্বে কোহিনুর পত্রিকাটি তখন ইতিহাসে নবপর্যায়ে স্থান করে নেয়। কবি কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’ কবিতা, ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’সহ মীর মশাররফ হোসেনের উল্লেখযোগ্য বেশকিছু রচনা প্রকাশ হয়েছিল ‘কোহিনুর’-এ। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল, ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ‘কোহিনুর’এ ‘পরার্থে আত্মদান’ ও ‘মহতের মান’ কথিকা দুটি প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্য সাময়িকপত্রে এয়াকুব আলী চৌধুরীর অভিষেক ঘটে। ‘মোহাম্মদী’তে প্রকাশিত ‘বঙ্গসাহিত্যে মুসলমান লেখক’ প্রবন্ধ প্রকাশের (পরিবর্ধিতভাবে ‘কোহিনুর’ এ পূণঃপ্রকাশ- আষাঢ়, ১৩১৮) পর এয়াকুব আলী চৌধুরী সুধীবৃন্দের দৃষ্টিতে আসেন।
চার.
বিংশ শতাব্দির প্রথম দশকের শেষদিকে এয়াকুব আলী চৌধুরী কলকাতায় অবস্থানকালে সাহিত্য রচনায় নিবিষ্ট হন এবং কলকাতার ‘সাহিত্য সমাজ’র সঙ্গে যুক্ত হন। ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাঙালির প্রথম নিখিলবঙ্গ সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ’। পরিষদের মূখপত্র ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ-পত্রিকা’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে এবং কলকাতা লোয়ার সার্কুলার রোডে এর একটি বিরাট দ্বিতল ভবন তৈরী হয় ১৯০০ সালে। কলকাতায় বাঙালি মুসলমান সমাজের অনেকেই তখন সাহিত্য চর্চায় রত ছিলেন। ‘বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ’ এর অসাম্প্রদায়িক পরিচিতি সত্তেও এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালকদের সকলেই হিন্দু হওয়ায় মুসলমান লেখক সাহিত্যিকদের আকৃষ্ট করা যায় নাই বা তাদের মধ্যে বেশ অনীহাও ছিল। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’ গঠনের পূর্ব পর্যন্ত ‘বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদ’ এ সদস্য সংখ্যা সহস্র ছাড়িয়ে গিয়েছিল কিন্তু মুসলমান সদস্য ছিলেন মাত্র ৬ জনÑ মুহম্মদ শহূদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), মোজাম্মেল হক (ভোলা), আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩), ডাঃ আব্দুল গফুর সিদ্দিকী, মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৮-১৯৪০) ও মৌলভী আহমদ আলী। ফলে পশ্চাদপদ স্ব-সমাজের আত্মবিকাশের তাগিদে ১৯১১ সালে মুসলমান লেখকদের নিজস্ব সংগঠন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য -সমিতি’ গঠন হয়। ১৯১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সকাল ১০ টায় ৯ নং অ্যান্টনিবাগান লেনে,‘করিমবক্স ব্রাদার্স’ এর দপ্তরীখানায় শতাধিক সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সাহিত্যানুরাগীর উপস্থিতিতে এক সভায় ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি’ গঠন হয়। সমিতি গঠনকল্পে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত প্রদানকারিদের অন্যতম ছিলেন পাংশার এয়াকুব আলী চৌধুরী। সমিতির প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ এবং মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদক নির্বাচিত হন।.চৌধুরী ভ্রাতৃদ্বয়ের জ্যেষ্ঠ রওশন আলী চৌধুরীও ছিলেন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা কমিটির অন্যতম সদস্য। সমিতির উদ্দেশ্যÑ
১. বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যিকদিগের ও বাঙ্গালী মোসলেম জাতির ভাষা, সভ্যতা ও কৃষ্টি রক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে একটি শক্তিশালী নিখিল বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হউক।
২. বঙ্গবাসী মোসলেমদিগের সাহিত্যসমালোচনা ও সাহিত্য চর্চার জন্য ‘বঙ্গীয় মোসলমান সহিত্য-সমিতি’ নামে উক্ত প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হউক। [বাঙালির জাগরণ, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি ঃ ড. রবিউল হোসেন, পৃঃ ১৫]
এয়াকুব আলী চৌধুরীর অসামান্য কীর্তি ‘নূরনবী’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯১৩ সালে (১৩২০ বঙ্গাব্দ), প্রথম প্রকাশের সময় জানা যায় না। এরপর ১৯১৪ সালে ‘ধর্মের কাহিনী’ প্রথম প্রকাশিত হয়। সরল ও সহজ ভাষার লেখা শিশুতোষগ্রন্থ ‘নুরনবী’ সমকালে পাঠকমহলে ব্যপক আলোড়ন তোলে। এন্ট্রান্স শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় কিশোর বয়সে লেখা ‘নুরনবী’ পাঠ করে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এয়াকুব আলী চৌধুরীকে এক পত্রে লিখেছিলেনÑ ‘নূরনবী পাঠ করিয়া আনন্দিত হইলাম। ইহার ভাষা সরল ও সুন্দর এবং ইহার বিষয় ও রচনা-প্রণালী শিশু পাঠকদের পক্ষে মনোরম। এইরূপ সহজ বাংলাভাষায় লেখা কঠিন কাজ, আপনি তাহাতে সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন।’
পাঁচ.
১৯১৪ সালেই তিনি চট্টগ্রামের জোরওয়ারগঞ্জ উচ্চ ইংরেজি স্কুলের শিক্ষকতায় যোগ দেন। এখানে তখন শিক্ষকতায় যুক্ত আরেক বিখ্যাত সাহিত্যিক ডা. লুৎফর রহমানের সাথে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। অবশ্য ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’র সম্পাদক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবও ওই বছরের শুরুতে বিএল পাস করে সীতাকুন্ডু হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে যোগ দিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে অবস্থান করেও এয়াকুব আলী চৌধুরী কলকাতা থেকে কোহিনুর প্রকাশনা অব্যহত রাখেন এবং ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’র সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। কিছুকাল পরে ১৯১৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে চলে আসেন এবং নিজের হাইস্কুল রাজবাড়ীর ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন’ (আর.এস.কে হাইস্কুল) এর শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সুদূর ”ট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় যোগাযোগ রক্ষা করা অসুবিধাজনক হলেও রাজবাড়ীর কর্মস্থল থেকে তা ছিল খুবই সহজসাধ্য ব্যাপার, দু’তিনটি ট্রেন তখন গোয়ালন্দ ঘাট থেকে কলকাতায় যাতায়াত করত। রাজবাড়ী কিংবা পাংশা থেকে কলকাতায় গিয়ে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিল। নেতৃবৃন্দ কলকাতার বাইরে অবস্থান করায় মুসলিম সাহিত্য সমিতির কাজ ঢিলেঢালা পরিলক্ষিত হলেও রাজবাড়ীর কর্মস্থল থেকে এয়াকুব আলী চৌধুরী কলকাতায় গিয়ে কোহিনুর প্রকাশনার কাজ ভালভাবেই সম্পন্ন করতে পারছিলেন। এয়াকুব আলী চৌধুরী সম্পাদিত কোহিনুর (তৃতীয় পর্যায়) ১৯১১ সাল থেকে শুরু করে চতুর্থ বর্ষ ১৯১৬ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। ‘অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হলেও সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে এটি ছিল খুবই খ্যাতিসম্পন্ন এবং মিহির ও সুধাকর, বসুমতি প্রভৃতি খ্যাতি সম্পন্ন পত্রিকায় কোহিনূরের প্রশংসা করা হয়েছিল। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ছিল এই পত্রিকার একটি বিশেষ কামনা। .. .. পত্রিকাটি সুধীমহলের এতটাই দৃষ্টিআকর্ষণ করতে পেরেছিল যে, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ছাড়াও মায়ানমার এমনকি আফ্রিকাতেও এটির পাঠক ছিল।’ [বাংলা সাহিত্যে মুসলিম অবদান, পৃঃ ২৯০]
ছয়.
ব্রিটিশের ভাগ করো এবং শাসণ করো নীতির ফলে বাঙালির ধর্মীয় বিভাজনের ক্ষেত্রে তখন ভাষাকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। ‘উর্দু’কে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা হিসেবে চালানোর প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল উনিশ শতকের শেষদিক থেকে। বিংশ শতাব্দির ব্রিটিশ শাসণামলেও সে চেষ্টা চালু ছিল। বাংলা ভাষার প্রশ্নে এয়াকুব আলী চৌধুরী সোচ্চার কলম চালান। ‘কোহিনুর’ (নব পর্যায়)এর ২য় বর্ষ ১০ম সংখ্যা, মাঘ-১৩২২ ‘বাঙ্গালী মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে ‘মাতৃভাষা’ প্রসঙ্গে তিনি সুস্পষ্টভাবে লিখলেন Ñ
“বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা বাঙ্গালা, ইহা দিনের আলোর মত সত্য। ভারতব্যাপী জাতীয়তা সৃষ্টির অনুরোধে বঙ্গদেশে উর্দু চালাইবার প্রয়োজন যতই অনভিপ্রেত হউক না কেন, সে চেষ্টা আকাশে ঘর বাধিবার ন্যায় নিস্ফল। বাঙ্গালা ভাষায় জ্ঞানহীন মৌলভী সাহেবগনের বিদ্যা ও বঙ্গদেশে উর্দু পত্রিকার বিফলতা তাহার জলন্ত প্রমান। বাঙ্গালী মুসলমানকে বাঙ্গালা ছাড়িয়া উর্দু পড়িতে বলাও যা, আর তাহাদিগকে প্রতি বেলা ভাতের পরিবর্তে রুটি খাইতে বলাও তাই। যিনি তাহা সম্পন্ন করিতে পারেন তিনি বোধহয় নদীর স্রোতও পাহাড়ের দিকে ফিরাইয়া দিতে পারেন। বাঙ্গালার অধিকাংশ মুসলমান কুটিরবাসী কৃষক। তাহারা উর্দুতে কথা কহিবে ও কাজ কর্ম চালাইবে? বাঙ্গালী শিশু মাতৃদুগ্ধের সহিত উর্দু ভাষা গলাধঃকরণ করিবে ? এইরূপ অস্বাভাবিক চেষ্টার সফলতায় জাতীয় শক্তি ব্যয় করা নিদারুন মুর্খতা মাত্র।…….
ভাল হউক বা মন্দ হউক, ইচ্ছায় হউক বা অনিচ্ছায় হউক, বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা বাঙ্গালা, ইহা মানিয়া লইয়াই জাতীয়তা পুষ্টির ব্যবস্থা করিতে হইবে। এই জাতীয়তার অনুরোধও উর্দু ভাষাকে বলবতী করিতে পারিতেছে না।…..
বাঙ্গালার কোটি কোটি কৃষক রাষ্ট্রীয় ব্যাপারের ধার ধারে না। যাঁহারা মুসলমানের জাতী স্বার্থ লইয়া চিন্তা ও আলোচনা করেন, তাহারা সকলেই ইংরাজীতে কাজ চালাইতে সক্ষম আছেন ও ভবিষ্যতেও হইবেন; তাহাদিগকে উর্দুর জন্য ভাবিতে হইবে না। সুতরাং জনসাধারনকে উর্দু শিক্ষা হইতে নিস্কৃতি দিলে নিশ্চয়ই জাতীয়তাÑবৃদ্ধির অনিষ্ট হইবে না।” [এয়াকুব আলী চৌধুরী অপ্রকাশিত রচনা ঃ আমীনুর রহমান .বাংলা একাডেমী ,পৃঃ১১]
‘বাঙ্গালী মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য’ প্রবন্ধের দ্বিতীয় অংশে ‘সাহিত্যের ভাষা’ প্রসঙ্গে এয়াকুব আলী চৌধুরী লিখেছেন Ñ
“বাঙ্গালায় ‘হস্তমুখ প্রক্ষালন’ বলিলে যাহা বুঝায় মুসলমানের ‘ওজু’ তাহা হইতে সম্পূর্ন স্বতন্ন্র ব্যাপার। হিন্দুর উপাসনার আসন ও মুসলমানের ‘মোছল¬া’ বা ‘জায়নমাজ’ বিভিন্ন পদার্থ। হিন্দুর ‘উপাসনা’ ও ‘উপবাস’ মুসলমানের ‘নমাজ’ ও ‘রোজার’ ভাব প্রকাশ করিতে অসমর্থ। মুসলমানের ‘কেবলা’ ‘নিয়ত’ ও ‘ইমানের’ প্রতিশব্দ বঙ্গভাষায় অজ্ঞাত। ‘বেহেস্ত ও দোজখের ’পরিবর্তে ‘স্বর্গ ও নরক’, ‘হারাম ও হালালের’ পরিবর্তে ‘বৈধ ও অবৈধ’ ‘গোছল ও খানার পরিবর্তে ‘স্নান ও আহার’ অবশ্যই চলিতে পারে।
কিন্তু ‘জবেহর’ পরিবর্তে ‘বলি’, ‘বন্দেগী’ বা ‘এবাদতের’ পরিবর্তে ‘পূজা’ ‘ছালামের ’পরিবর্তে ‘প্রণাম’ কিছূতেই চলিতে পারে না। স্বর্গের ‘অপ্সরা’ দেবতা ও মুনিগনের মনোরঞ্জন করিয়া থাকেন, কিন্তু বেহেস্তী ‘হুর’ কখনোও কোন পুরুষের কামদৃষ্টির বিষয়ীভূত হয় নাই। হিন্দুর ‘ঈশ্বর’ বহু দেবতা ভাবের উত্তেজক, কিন্তু মুসলমানের ‘আল¬া’ একমাত্র আল¬া। মুসলমান কখনও এই প্রকারের শব্দ পরিত্যাগ করিয়া প্রচলিত বাঙ্গালা প্রতিশব্দ ব্যবহার করিতে পারে না।”[ কোহিনুর ২য় বর্ষ ১০ম সংখ্যা, মাঘ ১৩২২ঃ এয়াকুব আলী চৌধুরী অপ্রকাশিত রচনা ঃ আমীনুর রহমান .বাংলা একাডেমী ,পৃঃ১৫ ]
সাত.
১৯১৭-১৮ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’ পূণর্গঠনকালেও এয়াকুব আলী চৌধুরী বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। শুরুতে ‘১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এয়াকুব আলী চৌধুরী। যে অগ্রসর মুসলমান লেখকদের উদ্যোগে ১৯১৭Ñ১৯১৮ খ্রীষ্টাব্দে মুসলমান সাহিত্য সমিতি পূণর্গঠিত হয়েছিল তাঁদেরও অন্যতম ছিলেন এয়াকুব আলী চৌধুরী’। [বাংলা সাহিত্যে মুসলিম অবদান, খন্দআর মাহমুদুল হাসান ঃ ঐতিহ্য-ঢাকা। পৃঃ ২৩৭]। চট্টগ্রামের জোরওয়ারগঞ্জ হাইস্কুলের চাকরী ছেড়ে এসে এয়াকুব আলী চৌধুরী ১৯১৭ সাল পর্যন্ত রাজবাড়ী আরএসকে হাইস্কুলেই শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। ইতোমধ্যে পাংশায় জর্জ হাই ইংলিশ নামে একটি নতুন হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯১৮ সালে তিনি সেখানে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯১৮ সালের জুন মাসে সমিতির মূখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ আত্মপ্রকাশ করলে প্রথম সংখ্যায় এয়াকুব আলী চৌধুরী’র বিখ্যাত রচনা ‘নামাজ’ আর কাজী আব্দুল ওদুদ এর গল্প ‘ভুল’ ছাপা হয়। ওই পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য একজন নবাগত সাহিত্যিক হচ্ছেন কাজী নজরুল ইসলাম। কবি ওই সময় করাচির বেঙ্গল রেজিমেন্টে হাবিলদাররূপে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সুদূর করাচি থেকে নজরুল ‘ক্ষমা’ নামে একটি কবিতা প্রকাশের জন্য এ পত্রিকা অফিসে পাঠিয়েছিলেন। নজরুলের কবিতাটি শ্রাবণ-১৩২৬ সংখ্যা ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ‘মুক্তি’ নামে প্রকাশিত হয়।’…. ‘মুক্তি’ কবিতার মত ‘হেনা’ গল্পের রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে বন্ধনীতে ছাপা হয় ‘হাবিলদার-বঙ্গবাহিনী-করাচি’। এয়াকুব আলী চৌধুরীর সঙ্গে কবি নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতা হয় কলকাতায় সাহিত্য সমিতির ওই প্রথম জীবনেই, ১৯১৯ সালের দিকে। এয়াকুব আলী চৌধুরী তখন সাহিত্য সমিতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এবং সাহিত্যিক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’র তৃতীয় সম্মেলন ১৯১৮ সালের ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে বাংলার অপরাপর গুরুত্বপূর্ণ মুসলমান লেখক-সাহিত্যিকদের সাথে পূর্ণ মহিমায় যোগ দিয়ে পরিচিতিও পেয়েছেন। প্রথম মহাযুদ্ধের অবসানের পর উনপঞ্চাশ নম্বর বেঙ্গলী রেজিমেন্ট পুরোপুরি ভেঙে গেলে নজরুল করাচি থেকে ফিরে এসে ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি’র অফিসে ওঠেন। সাহিত্য জীবনের সূচনায় কবি ‘মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ নির্ভর হয়েছিলেন একথা গবেষকদের জানা। পল্টন থেকে ফিরে নিজের বাড়ি চুরুলিয়া গ্রামে পৌঁছার আগেই কবি আসেন সমিতির কলেজ স্ট্রীটের অফিসে। কমরেড মোজাফ্ফর আহম্মদ লিখেছেনÑ“কাজী নজরুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অফিসে এসে গেড়ে বসল। কলকাতায় ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রীটে সাহিত্য সমিতির বাড়িতে দু’দিন থাকার পরে নজরুল ইসলাম তার জিনিষপত্র সেখানে রেখে দিয়ে চুরুলিয়া গ্রামে তার নিজের বাড়িতে চলে যায়।” এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাথে কবির ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিষয়ে জানা যায় বাংলার শ্রেষ্ঠ মুসলিম চিন্তাবিদ কাজী আব্দুল ওদুদের রচনায়। ‘নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেনÑ“মনে পড়ে ‘১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ স্বদেশী আন্দোলনের কিছু পরে কলকাতায় সদ্য আগত তরুণ নজরুল ইসলামকে মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরীর মতো একজন চরিত্রবান ও ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান সাহিত্যিক বলেছিলেন ‘আপনাকে মুসলমান বারীন ঘোষ হতে হবে।’ [কাজী আব্দুল ওদুদের শ্রেষ্ট প্রবন্ধ ঃ সম্পা-আবুল কাসেম ফজলুল হক, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্র“য়ারি’৮৯। পৃ-১২৬]
আট.
পাংশা জর্জ হাইস্কুলে তাঁর শিক্ষকতার সময়ে চলছিল ব্রিটিশ বিরোধী উন্মাদনা। কংগ্রেস সমর্থক এয়াকুব আলী চৌধুরী ঝাঁপিয়ে পড়েন সে আন্দোলনে। মহাত্মাগান্ধির আহ্বানে তিনি অসহযোগ আন্দোলন এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রথমে নিজগৃহে নজরবন্দি হন। ১৯২০ সালে কারারুদ্ধ হয়ে দমদম জেলে থাকেন বেশ কিছুদিন। তখন তার সাথে কারাবাসে ছিলেন পাবনার আব্দুল্লাহেল বাকী, কর্মবীর সেরাজুল হক, ডা. সুরেশ চন্দ্র দাসগুপ্ত, সৈয়দ আব্দুল করিম, সৈয়দ শামসুর রহমান, মওলানা কাফী ও কমিউনিস্ট নেতা বঙ্কিম মুখার্জি এবং বগুড়ার যতীন্দ্রনাথ রায়। ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি কারামুক্ত হন কিন্তু ব্রিটিশ রাজরোষের কারণে আর স্কুলের চাকরীতে ফিরতে পারেননি। এ সময় তিনি কলকাতায় অবস্থান নিয়ে অগ্রজ আওলাদ আলী চৌধুরীর সাথে পুরাপুরিভাবে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য জীবন শুরু করেন এবং ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র সম্পাদক নির্বাচিত হন। ত্রৈমাসিক মূখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র সম্পাদক তখন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোজাম্মেল হক। ১৯২১ সালে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর পত্রিকাটি এককভাবে সম্পাদনার ভার নেন মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোজাম্মেল হকের যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র প্রথম সংখ্যার (বৈশাখ ১৩২৫) সূচিপত্রে মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমূখ লেখকদের পাশাপাশি এয়াকুব আলী চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘নামাজ’ মূদ্রিত হতে দেখা যায়। ১৯২২ সালে (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘শান্তিধারা’র দ্বিতীয় সংস্করণ (প্রথম সংস্করণে প্রকাশকাল উল্লেখ হয়নি) প্রকাশিত হয়।
সাহিত্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বসমাজে যথেষ্ট অবদান রাখতে পারলেও ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ এক দশকের মাথায় অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে। এয়াকুব আলী চৌধুরী তখন সমিতিকে দাঁড় করিয়ে রাখতে প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রাখেন, কবি গোলাম মোস্তফা ছাড়া তখন তেমন কেউ ছিলেন না তাঁর সাথে। সে সময়ে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সমিতি’ নিবন্ধে আইনুল হক খান লিখেছেন ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায়Ñ‘১৯২২-২৩ দুই বছরের ঘরভাড়া বাঁকী পড়ায় কলেজ স্ট্রীটের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে সমিতির বই-পুস্তক, আসবাবপত্র রাস্তায় ফেলে দেয়। সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী রাস্তা থেকে সেগুলো কুড়িয়ে মীর্জাপুর স্ট্রীটের একটা ভাড়া বাড়িতে রাখেন। তারপর সমিতির কাজ আবার নতুন করে শুরু হয়।’ [দ্র. দৈনিক পাকিস্থান, ৭ আশ্বিন, ১৩৭৪] ১৯২৩ সালের নভেম্বরে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। ‘এই সময় সমিতির দুর্দিনে এয়াকুব আলী চৌধুরীর পাশে দাঁড়িয়ে কবি গোলাম মোস্তফাও যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, সে সম্পর্কে মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ বলেছেনÑ ‘১৯২৪ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রক্ষাকল্পে .. .. .. ঐসময় ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (তখন অবশ্য ডক্টর হননি) কলকাতা ছেড়ে সম্ভবত ঢাকায় আসেন। কাজী আব্দুল ওদুদও চাকরি নিয়ে ঢাকা কলেজে যোগদান করেন। অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ (তখন অধ্যক্ষ হননি।) ল’পাশ করে ময়মনসিংহ যান। কবি মোজাম্মেল হক (বরিশালী) নিজস্ব এক পাবলিকেশন কোম্পানী খুলে তাই নিয়ে বিব্রত হয়ে পড়েন। এইভাবে পুরাতন উদ্যোগী সদস্যগণ দূরে যাওয়ায় সমিতি অচল হইয়া পড়ে। বাড়ী ভাড়ার দায়ে তার লাইব্রেরীর মূল্যবান বইগুলি মীর্জাপুর স্ট্রীটের এক বাড়ীতে সড়িয়ে এনে কোনমতে রক্ষা করতে থাকেন।” [‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’র-শতবর্ষ ঃ ফিরে দেখি সেই ইতিহাস, মুহম্মদ মতিউর রহমান. দৈনিক আমার দেশ-৯ ই ডিসেম্বর.২০১১]
‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির পত্রিকা’ দ্বিতীয় মুখপত্র মাসিক ‘সাহিত্যিক’ ১৩৩৩ বাংলা সনের অগ্রহায়ন মাসে (জানুয়ারি ১৯২৭) মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী ও কবি গোলাম মোস্তফার সাথে যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে শুরু করে। সৈয়দ এমদাদ আলী ‘সাহিত্যিক’ এর প্রথম সংখ্যায় লেখেন সে সম্পর্কেÑ “বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি আবার নতুন করিয়া জীবন-পথের যাত্রী হইয়াছে। নবীন কর্মীদের চেষ্টায় ইহার মৃতকল্প জীবনে আবার স্পন্দন জাগিয়াছে। এই জীবন এই স্পদন অক্ষয় হউক। ত্রৈমাসিক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র কঙ্কালের উপরে তাহারা নতুন প্রেরণা লইয়া মাসিক ‘সাহিত্যিক’র প্রচার করিলেন। ইসলামের মহান আদর্শ সামনে রাখিয়া বঙ্গভাষার সেবার উদ্দেশ্যেই সমিতি-পত্রিকার এই নবজন্ম বা জাগরণ।” [সাহিত্যিকের কামনা : ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, অগ্রহায়ন, ১৩৩৩. পৃঃ২।] সমিতির মূখপত্র ‘সাহিত্যিক’ বৎসরাধিককাল চলার পর বন্ধ হয়ে যায়। এয়াকুব আলী চৌধুরীর শ্রেষ্ট সাহিত্যকীর্তি ‘মানব মুকুট’Ñ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ ১৯২৬ সালে (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতা থেকে প্রকাশ করে।
নয়.
স্বনামধন্য সাহিত্যিক কাজী আব্দুল ওদুদ এবং কাজী মোতাহার হোসেন (পরে ডক্টর) ছিলেন এয়াকুব আলী চৌধুরীর বয়োকনিষ্ঠ, স্নেহাস্পদ, অনুজপ্রতিম এবং তার নিজের এলাকা পাংশারই কৃতিসন্তান। ১৯২৬ সালে ঢাকায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ গঠনে কাজী আব্দুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেনÑ এই দু’জন সাহিত্য সংগঠক উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছিলেন। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ গঠনে তাঁরা এয়াকুব আলী চৌধুরীর অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। কাজী আব্দুল ওদুদ ঢাকা থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে কলকাতায় এয়াকুব আলী চৌধুরীর কাছে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র জন্য পাঠাতেন। কাজী আব্দুল ওদুদ তাঁর সাথে আমৃত্যু যোগাযোগ রেখেছিলেন।
এয়াকুব আলী চৌধুরী ব্যক্তিজীবনে ও চিন্তাচেতনায় স্বচ্ছ ও প্রগতিশীলতারই ধারক ছিলেন। তিনি স্বধর্মে যেমন নিষ্ঠাবান ছিলেন তেমনি পরধর্মের প্রতিও বিদ্বেসী ছিলেন না। আবার ধর্মীয় গোড়ামীর বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার হয়েছেনÑনিজের ধর্মের লোকেদের অজ্ঞানতা-মূর্খতার প্রতি ঔচিত্য প্রকাশে যেমন পিছপা হন নি তেমনি অন্য ধর্মের লোকেদের ধর্মীয় বিদ্বেসের প্রতিউত্তর দিতেও কুন্ঠাবোধ করেন নি। মূলত তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও সম্প্রীতির স্বপক্ষের সম্মিলক ছিলেন। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যা (৪র্থ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা) সওগাতে প্রকাশিত ‘ভারতীয় মুসলমান ও স্বাদেশীকতা’ এবং ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের আষাঢ় সংখ্যা (৫ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা) সওগাতের ‘মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুর জাতীয়তা’ প্রবন্ধ দু’টি এয়াকুব আলী চৌধুরীর সমাজ দর্শন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার যথেষ্ট পরিচায়ক বলে বিবেচনা করা হয়। ব্রিটিশ অবরুদ্ধ পাক-ভারতের মুসলমানদের আশা আকাংখার স্বরুপ বিশ্লে¬ষণ করে এয়াকুব আলী চৌধুরী লিখেছেনÑ‘হিন্দু-মুসলমান শুধু দু’টি কথা। এই দু’টি কথা আমাদিগকে এতই মোহাচ্ছন্ন করেছে যে, আমাদের মনুষ্যত্ব সত্যিই ক্ষুন্ন হয়েছে কিনা ভেবে দেখা দরকার। যাঁরা গর্বিত এবং গোঁড়া তাঁরা হয়তো জানেনই না যে, তাঁরা কি পরিমান মোহাচ্ছন্ন। .. …
‘মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুর জাতীয়তা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেনÑ‘‘রাষ্ট্রীয় জীবনে মুসলমানগণ স্বীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অধিকার বুঝিয়া পাইবার জন্যই দিনরাত সংগ্রাম করিতেছে। এই যে হিন্দুদের নিকট হইতে পৃথক করিয়া অধিকার বুঝিয়া লইবার চেষ্টা, ইহা মুসলমানদিগের আত্মপ্রকাশের স্বাভাবিক ক্রিয়া মাত্র। ইহার মধ্যে গভীর সত্য ও প্রেরণা আছে।….’ [মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুর জাতীয়তা ঃ সওগাত, আষাঢ়-১৩৩৪।]
দশ.
এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাহিত্য জীবন দীর্ঘ হয়নি। বিংশ শতাব্দির দ্বিতীয় দশকের শুরু থেকে চল্লিশের দশকের সূচনাকাল পর্যন্ত তিনি শিশুতোষ সাহিত্য ও বাংলা ভাষা সাহিত্য বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা করেন। ‘ধর্মের কাহিনী’,‘শান্তিধারা’, ‘মানব মুকুট’, ‘নুরনবী’ ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ তাঁর সাহিত্য সাধনার উৎকৃষ্ট ফসল। জীবনের শেষ এক দশক অত্যন্ত দুঃখ-কষ্ট ও রোগশোকের মধ্য দিয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরী অতিবাহিত হয়। তিনি ছিলেন অকৃতদার। চার বছরের মধ্যে পরিবারের নিকটজনদের তিন জনই প্রয়াত হন। প্রথমে তাঁর মা সুন্নাতুন্নেসা ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মারা যান, তখন থেকেই তিনি পাংশায় অবস্থান নেন। পরের বছর ১৯৩০ সালে অগ্রজ আওলাদ আলী চৌধুরী এবং সর্বাগ্রজ রওশন আলী চৌধুরী ১৯৩৩ সালের ৬ই আগস্ট মৃত্যুমুখে পতিত হন। সমগ্র পরিবারের দায়ভার তখন তাঁর ওপর সমর্পিত হয়। যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৩২ সাল থেকে তিনি তার পাংশা বাড়িতে ছিলেন। দারিদ্রের কশাঘাতে রোগগ্রস্থ যন্ত্রণা সেইসাথে প্রিয়জন হারানোর বেদনায় এয়াকুব আলী চৌধুরী একেবারে শয্যাশায়ী এবং সাহিত্য রচনায় স্তিমিত হয়ে পড়েন। ওই দুর্দশাগ্রস্থ সময়ে তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, ডাঃ মোঃ শহীদুল্লাহ, কাজী আব্দুল ওদুদ, আর.এস.কে হাইস্কুলের তৎকালিন প্রধান শিক্ষক ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য প্রমূখ। এদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অবিভক্ত বাংলার তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক তাঁকে ২৫ টাকা এবং নিজে ব্যক্তিগতভাবে ১০ টাকা মাসিক সাহিত্যভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেন।
তাঁর অসুস্থ্যতার ভেতরেই যখন ১৯৩৩ সালে কবি নজরুল ইসলাম পাংশায় আসেন এয়াকুব আলী চৌধুরী তখন ঠিকই শয্যা ছেড়ে উঠে আসেন কবিকে সম্মাননা জানাতে। কৃষি-শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করতে বিদ্রোহী কবি পাংশায় এলে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ১৪৪ ধারা জারী করেন। তথাপিও কবির আগমন উপলক্ষে এক সংবর্ধনা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। কবির সেই অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতির পদে আসীন হয়েছিলেন এয়াকুব আলী চৌধুরী। আয়োজক কমিটির অন্যতম, পাংশার তৎকালিন সাব-রেজিস্ট্রার সৈয়দ মাহমুদ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন Ñ‘১৯৩৩ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশেষ কারণে পাংশাতে আসেন। সে কারণে সরকার পাংশায় ১৪৪ ধারা জারী করে। বাধ্য হয়ে কবিকে স্থানীয় মুচিরাম সাহার গুদামঘরে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সভায় বহু লোক সমাগম হয়। সভার শেষে সকলের অনুরোধে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কবি নিজেই আবৃতি করেন। সভার গন্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, এয়াকুব আলী চৌধুরী, কাজী আব্দুল মাজেদ, খোন্দকার নজির উদ্দিন আহম্মদ, হাজী রহমত আলী বিশ্বাস প্রমূখ।’ [ স্মৃতিপথে পাংশা ঃ অপ্রকাশিত আত্মজীবনী, সৈয়দ মাহমুদ]
তাঁর সাহিত্য জীবনের সহচর ডাক্তার লুৎফর রহমানের প্রয়াণে এয়াকুব আলী চৌধুরী এতটাই বিমর্ষ হলেন যে, তিনি ২৭.৪.১৯৩৫ তারিখের চিঠিতে প্রিন্সিপাল ইবরাহিম খাঁকে লিখলেনÑ ‘তাঁর সম্পর্কে কত কথাই আমার বলিবার আছে। কিন্তু কিছুই আমার বলিবার শক্তি নাই।’ ১৫.৫.১৯৩৫ তারিখে ‘মোয়াজ্জিন’ সম্পাদক সৈয়দ আব্দুর রবকে লেখেনÑ‘গত ভাদ্র মাস হইতে আমি খুবই অশক্ত হইয়া পড়িয়াছি। শরীর ক্রমেই অচল হইয়া পড়িতেছে।ঐবধৎঃ দুর্বল হইয়া আসিয়াছে; একটুও বল নাই। উঠিবার ক্ষমতা নাই, অবিরত শুইয়া বসিয়া দিন কাটাইতেছি। শুস্ক কাশির বেগ অত্যন্ত প্রবল হইয়া পড়িয়াছে। কাসিতে কাসিতে শরীর সর্বদা অবসন্ন হইয়া থাকে। প্রাণে ঘোর অশান্তি, কিছুই ভাল লাগে না, কিছুই করিতে ইচ্ছা করে না।’ [ অপ্রকাশিত রচনাবলী, বা/এ ১৩৭০। পৃ: ৪৫]
এগার.
কিন্তু ওই রোগাক্রান্তশয্যাশায়ী অবস্থায়ও এয়াকুব আলী চৌধুরী পাংশায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মে যুক্ত ছিলেন। নারী শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। ১৯৩৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত পাংশায় মেয়েদের কোন স্বতন্ত্র স্কুল ছিল না। জমিদার মজুমদার বাবুদের (ভৈরব মজুমদারের উত্তর পুরুষ) আদিবাড়ির প্রাঙ্গনে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সাহায্যে ১৯২০ সালের দিকে একটা প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় কিছুদিনের জন্য চালু ছিল। ১৯৩৫ সালে ওই স্কুলটি সচল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এয়াকুব আলী চৌধুরী। ওই বিদ্যালয়ের অবস্থান পরিবর্তন করে মধুসুদন রায় কর্ম্মকারের দিঘীর উত্তর-পূর্ব কোনে তিন রাস্তার পার্শে পুনস্থাপন করা হল স্কুলটি। ২৫ মার্চ সকাল ৭ টায় এই প্রাইমারি গার্লস স্কুলের দ্বার উৎঘাটন করে সভাপতির ভাষণ দেন এয়াকুব আলী চৌধুরী। শারিরিক দুর্বলতা নিয়ে প্রচলিত রীতি অনুসারে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে অসমর্থ হওয়ায় চেয়ারে বসেই তিনি যে সুদীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন তা আজও এ সময়ে মেয়েদেরকে লেখাপড়ায় উৎসাহ যোগায়। পাংশার তৎকালিন সাব-রেজিস্ট্রার সৈয়দ মাহমুদ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন সেদিনের কথা Ñ
“বিদ্যালয়ের উদ্ধোধনী সভায় দেশ বিদেশের বিশেষ করিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ার গন অভ্যুত্থানকালে স্ত্রী শিক্ষার অভিনব প্রসারে রুশ জাতীয় ক্রমোন্নতির পরে স্ত্রীশিক্ষা যে অচিন্তনীয় প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল তাহার এক জীবন্ত ছবি শ্রোতাদের সামনে জনাব এয়াকুব আলী সাহেব পরিবেশন করিয়াছিলেন তাহা সত্যই অবিস্মরনীয় .. .. ঐতিহাসিক পটভূমিতে স্ত্রীশিক্ষার অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা বক্তার কন্ঠে এমনই এক চিরন্তন সত্যরূপে প্রকাশিত হইয়াছিল যাহাতে শ্রোতাগন মুগ্ধ-তন্ময় হইয়াছিলেন।”
গ্রামের অশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্যও তিনি পাংশায় একটি নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং ‘কোহিনুর লাইব্রেরী’ নামে নিজের বাড়িতেও এয়াকুব আলী চৌধুরী একটি পাঠাগার স্থাপন করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ থেকে শুরু করে ‘ভারতবর্ষ’, ‘প্রবাসী’, ‘বসুমতি’ ‘সওগাত, ‘মোহাম্মদী’, বঙ্গনূর’, ‘নবনূর’, মোসলেম ভারত’, এমনিতর অনেক মাসিক পত্রিকা এসে জমা হতো তার লাইব্রেরিও সম্পাদকীয় দপ্তরে। শেষজীবনে অসুস্থ্যাবস্থায় এই পাঠাগারেই কাটিয়েছেন সময়। চোখের সমস্যায় নিজে পড়তে পারতেন না, দৌহিত্র রোকনুজ্জামান খান ও অন্যদেরকে দিয়ে পড়িয়ে মনের ক্ষুধা নিবৃত করতেন।
শেষ বয়সে ক্ষীণদৃষ্টির অধিকারি এয়াকুব আলী চৌধুরীকে পত্রিকা পড়ে শোনানো, তাঁর কাছে আসা বিশিষ্ঠ লেখকদের চিঠিপত্র পড়ে শোনানো, আর সেই চিঠির জবাব লিখে দেওয়ার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই উত্তরকালে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের লেখনীশক্তির প্রকাশ ঘটে। তিনি সন্তষ্টচিত্তে স্বীকার করেছেনÑ
‘হঠাৎ ছোট নানা অর্থাৎ নানার ছোট ভাই এয়াকুব আলী চৌধুরী আদরের সুরে ডাকলেন। .. .. তিনি একেতো অসুস্থ, তার ওপর তাঁর চোখ ছিল খারাপ। .. ..‘আমাদের ওপর ভার পড়ল, রোজকার খবরের কাগজ আর তাঁর বন্ধুদের কাছ থেকে যে সব চিঠি আসে, তা তাঁকে পড়ে শোনাবার।.. .. ..। তাঁর কাছে আরো অনেক সাহিত্যিকের চিঠি আসত। কলকাতা থেকে আউনুল হক খাঁ, ঢাকার কাজী আব্দুল ওদুদ, করটিয়ার ইব্রাহীম খাঁÑএমনি কত সাহিত্যিক এবং সুধী ব্যক্তির চিঠি তাঁকে পড়ে শোনাতাম। আর তার জবাবও লিখতে হতো আমাদের। .. .. দু-চার কথা গুছিয়ে লিখবার যে সামান্য শক্তিটুকু অর্জন করেছি, তার মূলে রয়েছে ছোট নানার ওই চিঠি পড়া, কাগজ পড়া আর চিঠির জবাব লেখার বিরক্ত করার কাজ।’
ভারতবর্ষখ্যাত বাহারি নামের রকমারি স্বাদের সেইসব শিশুতোষ পত্রিকাগুলো আবিস্কার করে সব পাঠ আনন্দের অভ্যাসও গড়ে তোলেন এখান থেকেই। তিনি লিখেছেনÑ
‘থাকে থাকে সাজিয়ে রাখা ছোটদের পত্রিকা ‘স্বন্দেশ’। হাতে পেয়ে মনে হলো, বিরিঞ্চি বাবুর দোকানের সন্দেশও এর কাছে কিছুই না। আমার কৌতুহল বেড়ে গেল। সমবয়েসি এক খালাকে নিয়ে আরো তল্লাশী চালালাম। শেষে ‘আঙুর’, ‘বালক’, এমনকি সেকালের ‘সখা’র বান্ডিলও আবিষ্কার করে ফেললাম। সেদিন আমাদের আনন্দ দেখে কে! স্ফুর্তির চোটে খাওয়াদাওয়াই যেন ভুলতে বসেছিলাম।’
বার.
পাংশার নানাবাড়ির প্রখ্যাত চৌধুরী পরিবারের আঙিনায়ই বেড়ে ওঠেন বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই (৯.৪.১৯২৫Ñ৩.১২.১৯৯৯)। দাদাভাইয়ের বাল্য ও শৈশব অতিবাহিত হয় এখানেই। নানা রওশন আলী চৌধুরীর অনুজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরীর সাহচর্যে বড় হন। চৌধুরী পরিবারে সাহিত্য সাংস্কৃতিক আবহেই তার জীবন-মানস গঠিত হয়। তিনি লিখেছেনÑ ‘আমি পাংশার প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সম্মানীয় সম্ভ্রান্ত সৎ পরিবার এয়াকুব আলী চৌধুরীর নাতি। তাঁর সান্নিধ্যে, স্নেহ ছায়ায় আমার দিনগুলো কেটে যাচ্ছে। আমি মিথ্যা কথা বলতে পারতাম না। এটা এয়াকুব আলী চৌধুরীর শিক্ষা। তাই শিক্ষকগণ আমাকে বিশ্বাস করতেন।’ [রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই ঃ খালেক বিন জয়েনউদ্দীন, বাঙলা একাডেমি,জুন’২০০১। পৃ ঃ ১২]
এয়াকুব আলী চৌধুরীর পারিবারিক পরিমন্ডল সম্পর্কে দাদাভাই আরও লিখেছেনÑ‘‘নানাবাড়িতে থাকতে শৈশবে পাঠশালা থেকে টিফিনের সময় যাত্রা দেখতাম। .. .. আমি যখন নানাবাড়িতে থেকে পাঠশালায় পড়ি, পাশে হিন্দু ব্যবসায়ীদের বাড়িতে যাত্রা হতো। তখন থেকেই আমি মিছিল, হরতাল, শ্লোগান এসবের সঙ্গে পরিচিত।[ রোকনুজ্জামান দাদাভাই ঃ খালেক বিন জয়েনউদ্দিন,বাংলা একাডেমী। পৃঃ ১৪]
শেষ জীবন ঃ
১৯৪০ সালে মহাপ্রয়ান আগে ৭/৮ বৎসর যবৎ তিনি যক্ষা রোগে ভুগছিলেন, শেষদিকের ৪/৫ বৎসর এই অকৃতদার সাহিত্যিক জীবম্মৃতাবস্থায় কাটিয়েছেন। ১৯৪০ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিনি ইহলোক ত্যাগ করলে পাংশা নারয়নপুরের আঙিনাতেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। এয়াকুব আলী চৌধুরী ব্যক্তিজীবনে ছিলেন উদার, ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদি এবং প্রগতিশীল পরিচয়ে বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে তিনি বিপুলভাবে সমাদৃত ছিলেন। হিন্দু-মুসলমানের নানা ঐক্য ও সমাজ উন্নয়নে বিভিন্নমুখী অবদানের জন্য তিনি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারি হয়েছিলেন। তাঁর স্মরণে পাংশার মাগুড়াডাঙ্গী গ্রামে অধ্যাপক আব্দুল ওহাব প্রমূখদেও উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এয়াকুব আলী চৌধুরী স্মৃতি পাঠাগার এবং এয়াকুব আলী চৌধুরী বিদ্যাপিঠ নামের একটি উচ্চ বিদ্যালয়। কলকাতা নগরীতেও দাদাভাই ডেড়া বেঁধেছিলেন প্রয়াত নানা এয়াকুব আলী চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতির লাইব্রেরীতে। ১৯৪৪ সালে তিনি কলকাতায় যান।

-লেখাটি গত ২২ নভেম্বর দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য পাতার “লিড” হিসেবে ছাপা হয়েছে। যা লেখকের অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশ করা হলে।

(Visited 222 times, 1 visits today)