রাজবাড়ীর ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা বানালো “দূর্যোগকালিন রোবট কার”-

জাহাঙ্গীর হোসেন, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

099d-1
ভূমিকম্পসহ নানা কারণে ধসে পড়া ভবনে আটকে থাকা জীবিত অথবা মৃত মানুষ খুঁজবে রোবট। শুধু তা-ই না, সেখানে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক কোনো গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে কি না তা মুহূর্তের মধ্যে জানাবে।

যন্ত্রটির নাম ‘দুর্যোগকালীন রোবট কার’। এটি উদ্ভাবন করেছে রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের তিন ছাত্র।
তারা হচ্ছে সুদীপ্ত মণ্ডল, মেহেরাব চৌধুরী ও গোলাম মোর্তুজা। তারা যন্ত্রটি সহজে চালানোর জন্য একটি অ্যাপ্লিকেশনস (অ্যাপস) বানিয়েছে। সাধারণ মানুষ মোবাইল ফোনে এই অ্যাপসের সাহায্যে রোবটটি ব্যবহার করতে পারবে।

সুদীপ্তর গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুরে। তার বাবা নির্মল কুমার মণ্ডল রাঙামাটি বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং মা শষ্ঠি রানী মণ্ডল গৃহিণী। তারা জেলা শহরের ৩ নম্বর বেড়াডাঙ্গায় ভাড়া বাসায় থাকে। অন্যদিকে মেহেরাব জেলা শহরের ২ নম্বর বেড়াডাঙ্গার বাসিন্দা ঠিকাদার আতিকুল ইসলাম ও গৃহিণী রেশমা চৌধুরীর ছেলে। এ ছাড়া মোর্তুজার বাবা আব্দুর রাজ্জাক মিয়া বরগুনা জেলা সমবায় কর্মকর্তা ও মা মনিরা নাহার গৃহিণী। তারা জেলা শহরের ৩ নম্বর বেড়াডাঙ্গার স্থায়ী বাসিন্দা।

সুদীপ্ত মণ্ডল ও মেহেরাব চৌধুরী রাজবাড়ী বার্তা ডট কমকে জানায়, সাভারের রানা প্লাজার ধসে হতাহত দেখে তারা কেঁদেছে। তখনই তাদের মাথায় আসে ভবনধস বা দুর্যোগে আটকে পড়া মানুষের উদ্ধারে কিছু করা যায় কি না। দিনের পর দিন বিষয়টি নিয়ে তারা আলোচনা করেছে। অনলাইনে পড়াশোনা করেছে। একপর্যায়ে তারা একটি রোবট তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। এটি যেমন চলতে পারবে, তেমনি তথ্যও দিতে পারবে। উঁচু-নিচু, ভাঙাচোরা, দুর্গম পথে এগিয়ে যাবে এবং খুঁজে বের করবে মৃত ও জীবিত ব্যক্তিকে। সেই সঙ্গে যদি সেখানে কোনো বিষাক্ত গ্যাস থাকে, তবে তার মাত্রাও বলে দেবে। একই সঙ্গে আহত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা যাবে। চলাচলের সুবিধার্থে তারা এটিকে গাড়িতে রূপ দিয়েছে।

গত রবিবার সকালে সুদীপ্ত মণ্ডলের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তার পড়ার কক্ষটি ছোটখাটো একটি ইলেকট্রনিকস সরঞ্জাম মেরামতের কারখানার মতো। মেঝে, পড়ার টেবিল, চেয়ার, খাট, বইয়ের তাক সব জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে নানা রকম সরঞ্জাম। কক্ষের এমন অবস্থা কেন? প্রশ্ন করলে সে বলে, ‘আমি ছোট থেকেই এমন। পড়াশোনার পাশাপাশি নানা রকম সামগ্রী বানাতে ভালোবাসি। প্রথম প্রথম মা-বাবা বকাঝকা করতেন। এখন তা করেন না। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও অনেক খুশি। তাঁরা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছেন। যার অংশ হিসেবে এর আগে আমরা ড্রোন বানিয়ে বিদ্যালয়ে আকাশে উড়িয়েছি। ’

কিভাবে তৈরি হলো দুর্যোগকালীন রোবট? সুদীপ্ত রাজবাড়ী বার্তা ডট কমকে জানায়, তারা প্রথমে চার চাকার একটি বড় খেলনা গাড়ি সংগ্রহ করে। গাড়িটিতে তিনটি মাইক্রোকন্ট্রোলার, পাঁচটি মোটর, একটি স্ক্রিন, দুটি টু সেল লিপো (ব্যাটারি), একটি ক্যামেরা, একটি স্পিকার, একটি মাউথ, শোনার সেন্সর, হিউম্যান ডিটেকশন (মানব শনাক্তকারী), পি সেন্সর (বস্তু শনাক্তকারী), স্মোক সেন্সর (ধোঁয়া শনাক্তকারী), মেটাল ডিটেক্টর (ধাতু শনাক্তকারী) লাগানো হয়। বর্তমানে গাড়িটি পাঁচ মিটার এলাকার মধ্যে চলাচল করতে পারে। যা ব্লুটুথের মাধ্যমে তার ছাড়া নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাদের তৈরি অ্যাপস যেকোনো অ্যানড্রয়েট মোবাইল ফোনে ডাউনলোড করে যন্ত্রটি ব্যবহার করা সম্ভব। এটা অনেকটা ভিডিও গেম খেলার মতো। মোবাইল ফোন ডানে-বাঁয়ে ঘোরালে গাড়িটিও দিক পরিবর্তন করে চলে। তবে দুটি অ্যানড্রয়েট মোবাইল ফোন হলে রোবটের নিয়ন্ত্রণ আরো ভালোভাবে করা যায়। কারণ একজন গাড়িটি পরিচালনা করবে, আরেকজন নির্দিষ্ট সংকেতগুলো প্রয়োগ করবে। এতে সুষ্ঠুভাবে কাজ সম্পাদন করা যাবে। এটি তৈরি করতে তাদের ব্যয় হয়েছে মাত্র ১০ হাজার টাকা।

সুদীপ্ত রাজবাড়ী বার্তা ডট কমকে  বলে, গাড়িটি যেকোনো ধ্বংসস্তূপে প্রবেশ করালে সে তাৎক্ষণিক ছবিসহ ভেতরের পরিস্থিতি জানাতে শুরু করবে। সেই সঙ্গে ওই স্থানে কোনো মৃত ও জীবিত ব্যক্তি এবং গ্যাসের ঘনত্ব ও মানবদেহের জন্য ক্ষতির দিক জানাবে। আহত ব্যক্তি যদি কথা বলে, তবে তা নিয়ন্ত্রকের কাছে পৌঁছে দেবে। নিয়ন্ত্রক কথা বললে তাও আহত ব্যক্তি শুনতে পারবে।

সহ-উদ্ভাবক মেহেরাব রাজবাড়ী বার্তা ডট কমকে বলে, ‘গাড়িটিকে আমরা চার চাকার পরিবর্তে আট চাকায় রূপান্তরের চেষ্টা করছি। এর সামনের অংশে লেজার সিস্টেমও লাগানো যাবে। যাতে এটি সামনে থাকা লোহার দ্রব্য কেটে পথ চলতে পারে। এ সিস্টেমটি সাবমেরিনেযুক্ত করা হলে লঞ্চডুবিতে নিহত ব্যক্তির লাশ দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশ ও দেশের বাইরের যেকোনো স্থান থেকে এই রোবট নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। ’

সুদীপ্তর মা শষ্ঠি রানী মণ্ডল রাজবাড়ী বার্তা ডট কমকে বলেন, ‘ছেলেবেলায় বকাঝকা করতাম। এখন বুঝতে পারছি আমার ছেলে অসম্ভব মেধাবী। নিত্যনতুন সামগ্রী তৈরি করাই তার নেশা। সারাদিন ওই সব সরঞ্জাম নিয়ে থাকে। অনেক সময় নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়। আমার আশা, সুদীপ্ত একদিন বড় বিজ্ঞানী হবে। দেশ ও বিদেশে তার নাম ছড়িয়ে পড়বে। ’

রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিম রাজবাড়ী বার্তা ডট কমকে বলেন, ‘ওরা আমার মেধাবী ছাত্র। ওদের প্রতিটি কাজের সঙ্গে থাকছি। ব্যক্তিগতভাগে এবং বিদ্যালয় থেকে আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দুর্যোগকালীন রোবট উন্নয়নে সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ওরা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। ’

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সভাপতি আক্কাস আলী রাজবাড়ী বার্তা ডট কমকে বলেন, ‘যেহেতু ওরা মোবাইল ফোনের অ্যাপস তৈরি করেছে, এটা খুশির খবর। আর এটা দিয়ে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছে, এটা আরো খুশির খবর। এই উদ্ভাবন দেশের কাজে লাগবে। দেশ উপকৃত হবে। তাদের উদ্ভাবনে আমি উচ্ছ্বসিত। তাদেরকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। ’

(Visited 132 times, 1 visits today)